চারদিকে পিঁয়াজ, আদাসহ নানারকম মসলার বস্তা, কুলির হাঁকডাক, ক্রেতার দরদাম, বিক্রেতার ব্যবসা সামলানো- সব মিলিয়ে তুমুল ব্যস্ত পরিবেশ। বাইরে আরও সরগরম! একে তো পুরনো ঢাকার ব্যস্ত পথ, তার ওপর সারিবদ্ধ ট্রাক লোড-আনলোড হচ্ছে প্রতি মুহূর্তে। এই সব কিছুর মধ্যেই যেন চাপা পড়ে গেছে এক সময়ের বিখ্যাত ‘রূপলাল হাউজ’।
দেখে চেনার উপায় নেই- এই ভবনটি ছিল এক সময়ের জৌলুসপূর্ণ বাড়ি। এই বাড়িতেই বসতো নিয়মিত গানের আসর। সেই আসর মাতিয়ে দিতেন ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ, ওস্তাদ ওয়ালীউল্লাহ খাঁ কিংবা লক্ষ্মী দেবীরা। এই বাড়ি কবি কাজী নজরুল ইসলামেরও স্মৃতিধন্য। কবি এখানে পা রেখেছেন বেশ কয়েকবার। সেই বাড়ি এখন পরিণত হয়েছে মসলার আড়তে। বাড়ির ভেতরে গড়ে উঠেছে একাধিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। অর্থাৎ বাড়ির ঘরগুলোকে দোকানে পরিণত করা হয়েছে। কোনো কোনো ঘর ব্যবহার হচ্ছে মালামাল রাখার গোডাউন হিসেবে।
বুড়িগঙ্গা নদীতে শুধু বিলাস জাহাজ নয়, বাণিজ্যিক জাহাজ ও ঢুকত সে সময়ে। জাহাজিরা মুগ্ধ হয়ে যেত চারটি আলাদা ঘাটসহ বাড়িটার চেহারা দেখে। আর্মেনিয়ান, ব্রিটিশ আর ঢাকার ক্লাসিক চেহারা মিলিয়ে সে বাড়ি আসলেই ছিল দেখার মত।
পুরান ঢাকা বলে আজ যে জায়গাটা নিয়ে আমাদের নতুন ঢাকাবাসীর এত আগ্রহ, একসময় সেটাই ছিল পুরো ঢাকা। বুড়িগঙ্গার পাড়ের তিলোত্তমা নগরী, মধুপুর ট্র্যাক এর মাটি যেখানে এসে মিশেছে বুড়িগঙ্গার পানি থেকে পাওয়া জীবন শক্তির সাথে।
ব্রিটিশ ভারতে বাংলা এবং এখনকার বাংলাদেশ সব সময়েই তাই ছিল গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কলকাতা ব্রিটিশ ভারতের প্রাথমিক রাজধানী ছিল অনেকদিন। এই সময়টাতে ঢাকা কিছুটা অবহেলিতই ছিল। তবে ধীরে ধীরে ব্রিটিশ শাসনের দ্বিতীয় শতকে মুসলমান সমাজে ‘এলিট’ শ্রেণির প্রভাব বাড়তে থাকায় ঢাকার গুরুত্ব বাড়ে। ঢাকার হিন্দুসমাজও কলকাতার ধনিক শ্রেণির সঙ্গে পাল্লা দেওয়ার মত প্রভাব প্রতিপত্তি অর্জন করেছিলেন এ সময়টাতেই। তাদের নিজেদের মধ্যে আবার তৈরি হয় একটা প্রতিযোগিতার মনোভাব। ব্রিটিশদের সর্বগ্রাসী বাণিজ্যনীতি আর কলোনিয়াল শাসন প্রকৃতির কারণে অন্যান্য বিদেশি বণিকেরা ঢাকা ছেড়ে যেতে থাকে। বিক্রি হতে থাকে তাদের স্থাবর সম্পত্তি, রয়ে যায় সেসবের স্থাপত্যরীতি আর এর সাথে যোগ হয় ব্রিটিশ ও দেশি স্থাপনার সে সময়ের ট্রেন্ড। ঢাকার প্রায় এক শতকের বিখ্যাত ভবনগুলোতে এখনো রয়েছে সেই
এই সময়কালে ঢাকার দুই বিখ্যাত ব্যবসায়ী ছিলেন রূপলাল দাস ও রঘুনাথ দাস। ঢাকার বণিক সমাজে বেশ নামডাক হয়েছিল দুজনের। ১৮৩৫ সালের দিকে তারা সিদ্ধান্ত নেন নিজেদের সামাজিক মর্যাদার সঙ্গে মানানসই একটা বাড়ি কেনা দরকার তাদের। তারা বেছে নিলেন সে সময়ে ঢাকার সবচেয়ে বড় বাড়িগুলোর একটিকে। আর্মেনিয়ান জমিদার আরাতুন ১৮২৫ সালের কাছাকাছি সময়ে বাড়িটি তৈরি করেছিলেন। ১০ বছর বয়সী বাড়িটি রূপলাল কিনে নেন নগদ টাকায়।
রূপলাল ব্যবসায়ী হিসাবে ধনাঢ্য ছিলেন। তবে প্রায় সব ইতিহাস ঘেঁটেই পাওয়া গেছে তার ব্যবসার উন্নতির পেছনে মেধা, পরিশ্রম ও রুচির প্রশংসা। বাড়ির ব্যাপারেও শুধু বাড়ি কিনেই খুশি হননি তিনি। নিজের পছন্দ, চাহিদা ও রুচির সমন্বয়ে পুনর্নির্মাণ করেন বাড়িটি। এভাবেই রুপলাল হাউজ হয়ে ওঠে ঢাকার বিলাসী ধনাঢ্য ব্যবসায়ীর জৌলুসে ভরা বাসভবন।
রূপলাল হাউজ আসলেই অবাক করে। অবাক না হওয়া প্রজন্মকে আরও বেশি করে অবাক করে। গুগল ঘেঁটে যা পাই সেই তথ্য যথেষ্ট মনে হয় না বলে আরও অবাক করে। রূপলাল নিজেও অবাক করেন অনেকবার। ছাত্র হিসাবে মেধাবী ছিলেন। প্রবেশিকা পরীক্ষায় পেয়েছিলেন মেধাক্রমের জন্য ১০ টাকার বৃত্তি। ব্যবসা জীবন শুরু করেছিলেন লগ্নি ব্যবসা করে। তাও একদম পথে পাটের তৈরি বস্তা বিছিয়ে হকার এর মত। সেখান থেকে মেধার জোরেই উঠে যান ঢাকা শহরের সবচেয়ে ধনাঢ্য ব্যবসায়ীর কাতারে।
রুপলাল দাস
আর মানুষ হিসাবে ছিলেন ভয়াবহ বিলাসী। এই বাড়ি পুনর্নির্মাণ এর কাজ তিনি দেন কলকাতার বিখ্যাত ব্রিটিশ ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি মার্টিন অ্যান্ড কোং এর হাতে। বিশাল নির্মাণযজ্ঞে ব্যবহার করা হয় স্থানীয়ভাবে পোড়ানো ইট আর প্রচুর লোহা। নির্মাণ কাজ চলেছিল দীর্ঘসময়। বিলাসী রূপলাল দশক পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে শুধু উপমহাদেশের ব্রিটিশ ভাবধারাই নয় বরং ইউরোপিয়ান স্থাপত্য হালচাল এর সর্বশেষ সব স্টাইল একটু একটু করে জুড়ে দিয়েছেন তার শখের বাড়িতে।
তাই বাড়ির প্রবেশপথে আর্মেনিয়ান ধাঁচের প্রবেশপথের বিশাল কলামগুলোতে দেখা যায় ক্লাসিক কোরিন্থিয়ান স্টাইল এর কলাম। সেগুলো আবার প্রতিটিই বিশাল। আর ভবনের এক অংশ থেকে আরেক অংশে যেতে টানা দেওয়া ঝুলবারান্দার ছাদে তাকালে দেখা যায় লোহা দিয়ে বানানো বিম এর সাপোর্ট। কিন্তু স্থাপত্যের এসব তত্ত্বকথার ঝোঁক একটু হলেও কেটে যায় যখন চোখে পড়ে ছাদ আর মেঝেতে করা অসাধারণ কারুকাজ। স্থাপত্যের কোন ভাবধারায় এটা পড়ে তার চেয়ে বেশি মনে আসে একজন বিলাসী ব্যবসায়ীর মনের রোমান্টিকতা। কত সাধে কত যত্নে গড়ে তুলেছিলেন নিজের স্বপ্নের বাড়ি।
কিন্তু ব্রিটিশ শাসন এর শেষভাগে ধর্ম হয়ে উঠছিল নতুন ঢাকাই সমাজ এর নিয়ামক। ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ আমরা এখন মনে করি বাংলার স্বাধীনতার একটি ধাপ হিসাবে। রূপলাল এর মত সম্ভ্রান্ত হিন্দু পরিবারের অধিপতির জন্য ধর্মভিত্তিক দেশভাগের ধারণাটিই ছিল আতংকের। অনেকের মতে এই ঘটনায় সাধারণ মানুষ এমনকি মুসলমান এলিটিস্টদের মনোভাবও রূপলালকে পরিবার পরিজনসহ ঢাকা থেকে চলে যাবার ব্যাপারে চিন্তা করাতে শুরু করে। ১৯৪৭ সালের দেশভাগের সময় দাস পরিবার আর যেন সাহসই পেল না ঢাকা শহরে থাকার। বাড়ি বিক্রি করে চলে গেলেন সীমানা পেরিয়ে। দেশভাগের আর দশটি বিয়োগান্তক সম্পর্কের মত শেষ হয়ে গেল দাস পরিবারের সঙ্গে অভিজাত ঢাকার স্মৃতি। বাড়ির মালিকানা নিয়ে দলাদলির শুরু তখন থেকেই। তবে ১৯৫৮ সালে মোহাম্মদ সিদ্দিক জামাল রূপলাল হাউজ কিনে নেন। নাম দেন ‘জামাল হাউজ’ । পুরান ঢাকার ঐতিহ্যবাহী বাড়িটির শরীরে এখনো এই নামটিই রয়েছে।
ইত্তেফাক/ইউবি