এপ্রিল ২০২১ মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন ১৯১৫ সালে আর্মেনিয়ানদের হত্যার ঘটনাকে গণহত্যা হিসেবে স্বীকৃতি দেন। তুর্কি রাজনীতিবিদরা এর তীব্র প্রতিবাদ জানান এবং এটিকে তাদের বিরুদ্ধে অপবাদ বলে অভিহিত করেন। বাংলাদেশের গণহত্যার জন্য অনুরূপ একটি স্বীকৃতি পেতে দীর্ঘ সময় পার হয়ে গেছে। পাকিস্তানি সেনাবাহিনী কর্তৃক বাংলাদেশিদের গণহত্যা একটি স্বদেশি ও আন্তর্জাতিক বিবাদের বিষয়ে পরিণত হয়েছিল। এখনো মৃত্যুর পরিসংখ্যান নিরর্থক বিতর্কের অংশ হিসেবে রয়ে গেছে। বাংলাদেশের ৬৪ জেলার মধ্যে ২৮টিরও বেশি জেলায় ১৩ হাজার ৮৫৪টি শুধু গণহত্যার ঘটনাই ঘটেছে বলে জানা গিয়েছিল। সমকালীন গবেষকেরা দাবি করছেন, ৩০ লাখেরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছিল। সেই থেকে বাংলাদেশের গণহত্যা বিভিন্ন দল কর্তৃক রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহূত হচ্ছে।
স্বাধীনতা যুদ্ধের পর, ১৯৭৫ সাল থেকে সামরিক জান্তা বাংলাদেশ শাসন করে। সে সময় পাকিস্তানপন্থি অংশটি রাজনীতিতে পুনর্বাসিত হয়েছিল, নির্বাসিত রাজাকার নেতৃবৃন্দ ফিরে এসেছিল এবং ইতিহাসের পুনর্গঠন শুরু হয়েছিল। সামরিক নেতৃবৃন্দ ও রাজনৈতিক দলগুলোর তেজস্বী জাতীয়তাবাদের আড়ালে ঢাকা পড়ে গিয়েছিল গণহত্যা। এটি আসলে ছিল জনগণকে দুই ভাগে বিভাজিত করার চাতুর্যপূর্ণ একটি অভিঘাত। পরবর্তী দুই দশকে বাংলাদেশি গণহত্যার বিষয়টি ক্রমান্বয়ে অস্পষ্ট হয়ে পড়ে। জনপ্রিয় সংস্কৃতি জাতীয়তাবাদী বিজয়কে মহিমান্বিত করেছিল, তবে গণহত্যার বিষয়টি ছিল অস্বচ্ছ। প্রাণ হারানোর তথ্য গোপন করা এবং সংখ্যা নিয়ে সন্দেহ পোষণ করা একটি রাজনৈতিক আদর্শে পরিণত হয়েছিল। গণহত্যার সংখ্যা হ্রাসকরণ প্রক্রিয়া কয়েক প্রজন্মের রক্তাক্ত ইতিহাসকে ধীরে ধীরে মুছে ফেলছিল। সহযোগী দলগুলোর রাজনৈতিক বৈধতা প্রতিষ্ঠা করা এবং সামরিক সরকারকে সমর্থন জানানোর জন্য এই প্রতারণার আশ্রয় নিয়েছিল। যত দিন পর্যন্ত না আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলো এবং বক্তব্য পালটে গেল।
আগ্রাসি রাষ্ট্রসমূহ যেমন—পাকিস্তান তাদের সুস্পষ্ট মানবাধিকার লঙ্ঘনকে মেনে নেওয়ার পরিবর্তে সরাসরি অস্বীকার করেছিল। গণহত্যা ছিল জনপ্রিয় মতবিরোধকে দমন করার এবং সমাজের সামাজিক কাঠামোকে ব্যাহত করার একটি উপকরণ। ক্ষতিগ্রস্তদের সংখ্যা কম দেখানোর প্রচেষ্টা গণহত্যার বাস্তবতাকে আড়াল করে। যুদ্ধকালীন হত্যাকাণ্ড ক্ষুধা, সহিংসতা ও রোগ-ব্যাধির জন্ম দেয় এবং পাকিস্তান অপরাধীদের তাদের মানবতাবিরোধী অপরাধ থেকে নিষ্কৃতি দেয়। একটি দুর্লভ সাক্ষাত্কারে অপারেশন সার্চলাইটের অন্যতম পরিকল্পনাকারী জেনারেল রাও ফরমান আলী মৃতের সংখ্যা ৪০ থেকে ৫০ হাজারের মধ্যে বলে দাবি করেন। ১৯৭২ সালে পাকিস্তানের হামুদুর রহমান কমিশন যুদ্ধে মাত্র ২৬ হাজার মানুষ নিহত হওয়ার কথা জানিয়েছিল।
পাকিস্তান এমনকি পূর্ব পাকিস্তানে মোতায়েনকৃত সেনাসংখ্যাও কম দেখিয়েছিল এটি প্রমাণ করতে যে, এত অল্পসংখ্যক সেনা এমন ব্যাপক গণহত্যা চালাতে সক্ষম ছিল না। অনেক বছর পর, অসংখ্য গণকবর খনন করা হচ্ছে আর গণহত্যার ঘটনাগুলো বের করে এনে নথিভুক্ত করা হচ্ছে। স্বাধীনতাবিরোধী গোষ্ঠীগুলোর বৈধতা অবশেষে চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে পড়ে, যখন ২০১৩ সালে বাংলাদেশ চিহ্নিত যুদ্ধাপরাধীদের বিচার শুরু করে। তখন থেকে বাংলাদেশ স্বাধীনতার জন্য ৩০ লাখ প্রাণ বিসর্জনের জোরালো অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি চেয়েছে। গণহত্যায় মৃত্যুর পরিসংখ্যান নিয়ে লড়াইয়ের ঘটনা অস্বাভাবিক কিছু নয়। গণহত্যা অস্বীকারকারীরা হয় সরাসরি নিরেট মিথ্যাচার করে, নয়তো তাদের মান-মর্যাদা রক্ষার খাতিরে নৃশংসতার মাত্রা কম দেখায়, যেমনটি পাকিস্তান করছে। ১৯১৫-১৯১৬ সালে অটোমান তুরস্ক কর্তৃক সংঘটিত আর্মেনিয়ান গণহত্যায় প্রায় ১৫ লাখ লোক নিহত হওয়ার দাবি করা হয়েছে। তুরস্কের রাজনীতিবিদদের মতে, এই সংখ্যা ৩ লাখেরও কম। ১৯৯৪ সালে রুয়ান্ডা গণহত্যায় তুতসি সরকার প্রায় ৫ থেকে ৬ লাখ মানুষকে হত্যা করেছিল। তবে তুতসি সরকারের প্রাক্কলন অনুযায়ী এই সংখ্যা ১ লাখের চেয়ে বেশি নয়। অন্যান্য গণহত্যার ঘটনার মতো বাংলাদেশি ইতিহাসবেত্তাগণ, সরকার এবং সমমনা মানবাধিকার গোষ্ঠীগুলো ভুলে যাওয়া গণহত্যার ব্যাপক স্বীকৃতি পেতে তাদের প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছে।
n লেখক :স্কুল শিক্ষক