সুশাসনের ঘাটতি করোনা নিয়ন্ত্রণকে দীর্ঘায়িত করছে :টিআইবি

সংক্রমণের গতি-প্রকৃতি, নতুন নতুন ধরনের অনুপ্রবেশ, সংক্রমণ রোধের সক্ষমতা ও টিকা কার্যক্রম বন্ধ হওয়া ইত্যাদি বিবেচনায় বাংলাদেশে কোভিড-১৯ অতিমারি উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। এমতাবস্থায় অবিলম্বে উন্মুক্ত প্রতিযোগিতার মাধ্যমে সক্ষমতাসম্পন্ন কোম্পানিগুলোকে নিজ উদ্যোগে স্থানীয়ভাবে টিকা উত্পাদনের সুযোগ প্রদান করার পাশাপাশি ক্রয়বিধি অনুসরণ করে সরকারি-বেসরকারি খাতের সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সরাসরি আমদানির অনুমতি দেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। গতকাল মঙ্গলবার ‘করোনা ভাইরাস সংকট মোকাবিলা : কোভিড-১৯ টিকা ব্যবস্থাপনায় সুশাসনের চ্যালেঞ্জ’ শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ অনুষ্ঠানে এ আহ্বান জানানো হয়। টিআইবির আউটরিচ অ্যান্ড কমিউনিকেশন বিভাগের পরিচালক মনজুর-ই-আলমের সঞ্চালনায় সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান, উপদেষ্টা-নির্বাহী ব্যবস্থাপনা অধ্যাপক ড. সুমাইয়া খায়ের, গবেষণা ও পলিসি বিভাগের পরিচালক মোহাম্মদ রফিকুল হাসান ও সিনিয়র রিসার্চ ফেলো শাহজাদা এম আকরাম। গবেষণা প্রতিবেদনটি উপস্থাপন করেন গবেষণা ও পলিসি বিভাগের রিসার্চ ফেলো মো. জুলকারনাইন।

গবেষণায় দেখা যায়, কোভিড-১৯ সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে যথাযথ পরিকল্পিত উদ্যোগের ঘাটতির কারণে সংক্রমণ পুনরায় বৃদ্ধি পেয়েছে। এন্ট্রি পয়েন্টগুলোতে (বিমান ও স্থলবন্দর) সংক্রমিত ব্যক্তি চিহ্নিতকরণ এবং কোয়ারেন্টাইন করার উদ্যোগের ঘাটতির কারণে কোভিড-১৯-এর নতুন ধরনের অনুপ্রবেশ ঘটেছে। স্বাস্থ্যবিধি বাস্তবায়নে সমন্বিত ‘আচরণ পরিবর্তনের’ উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার নির্দেশনার কঠোর বাস্তবায়নেও ঘাটতি লক্ষ করা যায়। ফলে সংক্রমণের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত মোট আক্রান্ত ও মৃত্যুর মধ্যে ২৬ দশমিক ৬ শতাংশ আক্রান্ত ও ২৪ দশমিক ২ শতাংশ মৃত্যু মার্চ ও এপ্রিল এই দুই মাসে লক্ষ করা গেছে।

গবেষণায় আরো দেখা যায়, বিভিন্ন হাসপাতালের কোভিড মোকাবিলায় বরাদ্দ ব্যয়ে দুর্নীতি অব্যাহত ছিল। যেমন পাঁচটি হাসপাতালে ক্রয়, শ্রমিক নিয়োগ ও কোয়ারেন্টাইন বাবদ ৬২ দশমিক ৩ কোটি টাকা ব্যয়ে ৫ কোটি টাকার দুর্নীতি; ক্রয়বিধি লঙ্ঘন করে ১ লাখ কিট ক্রয়; বিধি লঙ্ঘন করে অনভিজ্ঞ প্রতিষ্ঠানকে ক্রয়াদেশ প্রদানের ঘটনা দেখা গেছে। করোনাকালে কারিগরি জনবলের ঘাটতি মেটাতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নিয়োগে জনপ্রতি ১৫-২০ লাখ টাকা ঘুষ বাণিজ্যের অভিযোগ উঠেছে। উপযোগিতা যাচাই না করে হাসপাতাল নির্মাণ এবং তার যথাযথ ব্যবহার না করে হঠাত্ বন্ধ করে দেওয়ায় ৩১ কোটি টাকার অপচয় হয়েছে। স্বাস্থ্য খাতের ক্রয়ে সংঘটিত দুর্নীতির কারণে বারবার পরিচালক পরিবর্তন, ধীরগতির তদন্ত কার্যক্রমের প্রভাবে ‘কোভিড-১৯ ইমার্জেন্সি রেসপন্স অ্যান্ড প্যানডেমিক প্রিপেয়ার্ডনেস’ প্রকল্প বাস্তবায়নে ধীরগতি লক্ষ করা গেছে। কোভিড-১৯ মোকাবিলা কার্যক্রমে এক বছরে সংঘটিত অনিয়ম-দুর্নীতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণে যেমন শৈথিল্য রয়েছে, তেমনি সংঘটিত অনিয়ম-দুর্নীতির বিরুদ্ধে তদন্ত ও বিচারেও ধীরগতি লক্ষ করা গেছে। দুর্নীতিতে জড়িত কিছু ব্যক্তিমালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিলেও স্বাস্থ্য বিভাগের কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারীকে আইনের আওতায় আনা হয়নি।

টিআইবি মনে করে, কোভিড-১৯ টিকা ব্যবস্থাপনা কার্যক্রমে সুশাসনের প্রতিটি নির্দেশকে কৌশলগত ঘাটতি থাকায় এবং ব্যাবসায়িক গোষ্ঠীর প্রভাব ও রাজনৈতিক বিবেচনায় টিকা ক্রয়ের ক্ষেত্রে একক উেসর ওপর নির্ভর করায়, চলমান টিকা কার্যক্রমে আকস্মিক স্থবিরতা নেমে এসেছে। এই সংকট মোকাবিলা ও সুশাসনের চ্যালেঞ্জ থেকে উত্তরণের লক্ষ্যে ১৯ দফা সুপারিশ প্রদান করেছে টিআইবি। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো : দেশের ৮০ শতাংশ জনসংখ্যাকে কীভাবে, কত সময়ের মধ্যে টিকার আওতায় আনা হবে তার সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা; উন্মুক্ত প্রতিযোগিতার মাধ্যমে সক্ষমতাসম্পন্ন কোম্পানিগুলোকে নিজ উদ্যোগে স্থানীয়ভাবে টিকা উত্পাদনের সুযোগ প্রদান; সরকারি ক্রয়বিধি অনুসরণ করে সরকারি-বেসরকারি খাতের সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সরাসরি আমদানির অনুমতি প্রদান; রাষ্ট্রীয় গোপন তথ্য ব্যতীত টিকা ক্রয় চুক্তি সম্পর্কিত সব তথ্য সবার জন্য উন্মুক্ত; টিকাকেন্দ্রে অভিযোগ নিরসন ব্যবস্থা প্রবর্তন এবং অভিযোগের ভিত্তিতে অনিয়ম-দুর্নীতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ।

সংবাদ সম্মেলনে ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, করোনা সংক্রমণের শুরু থেকে বিগত দেড় বছর যাবত্ স্বাস্থ্য খাতে যে ধরনের অনিয়ম-দুর্নীতি ছিল, তা এখনো অব্যাহত আছে। অন্যদিকে তথ্য প্রকাশের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা, নিয়ন্ত্রণের প্রবণতা আরো ঘনীভূত হয়েছে। সরকার দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণে যতখানি তত্পর তার চেয়ে দুর্নীতির তথ্য প্রকাশ নিয়ন্ত্রণে শতগুণে বেশি তত্পর ছিল। যা আত্মঘাতী, এ থেকে সরকারকে সরে আসতে হবে।