অপরিণত ও কম ওজন নিয়ে জন্মানো ১৭ হাজার নবজাতক প্রতি বছর মারা যায়

গর্ভধারণের প্রথম থেকেই বমি এবং খেতে না পাওয়ার সমস্যা ছিল গর্ভবতী হোমায়রা আফরোজের। তিনি রাজধানীতে বসবাস করলেও এ সমস্যার কারণে গ্রামে নোয়াখালীর মাইজদিতে মায়ের কাছে যান। সেখানে করোনা মহামারি আর অসচেতনতার কারণে চিকিসকের পরামর্শ ছাড়াই সাত মাস পার করেন। এ সময় তিনি কেবল তিন বেলা সামান্য ভাত-মাছ খেয়ে কাটান। আট মাসের শুরুতে তার সন্তান প্রসব হয়। তবে কম ওজন নিয়ে অপরিণত বয়সে বাচ্চা জন্মানোর কারণে ইনকিউবিটরে রাখার প্রয়োজন পড়ে বলে জানান চিকিত্সকেরা। শহরের বড় হাসপাতালে শিশুটিকে ইনকিউবিটরে রাখা ব্যয়বহুল বলে পরিবারের পক্ষ থেকে সেই ব্যবস্থা নিতে নিতেই শিশুটির মৃত্যু হয়। 

সময়ের আগে অপরিণত বয়স এবং কম ওজন নিয়ে জন্মানো নবজাতক মৃত্যুর উল্লেখযোগ্য কারণ বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। তাঁরা বলেছেন, প্রতি বছর বাংলাদেশে ৫ লাখ ৭৩ হাজার নবজাতক সময়ের আগে, অর্থাত্ অপরিণত বয়সে জন্ম নেয়। ৮ লাখ ৩৪ হাজার নবজাতক জন্মায় কম ওজন নিয়ে। এদের মধ্যে ১ লাখ ৯২ হাজার নবজাতকের জন্মকালীন ওজন হয় দুই কেজির নিচে। ফলে দেশে প্রতি বছর ১৭ হাজার ১০০ নবজাতক এই দুইয়ের সম্মিলিত কারণে মৃত্যুবরণ করে। এর মধ্যে ৭২ শতাংশ নবজাতক মারা যায় জন্মের প্রথম দিনে। সচেতনতায় যা কমিয়ে আনা সম্ভব।

বাংলাদেশ ডেমোগ্রাফি হেলথ সার্ভে-বিডিএইচএস ২০১৭-১৮ সমীক্ষায় দেখা যাচ্ছে, শিশুমৃত্যুর হার আগের ঊর্ধ্বমুখী ধারায় ফিরে আসছে। বাংলাদেশে জন্ম নেওয়া প্রতি হাজার নবজাতকের মধ্যে ৩০ শিশুর মৃত্যু হয়, যাদের মধ্যে ১৯ শতাংশ নবজাতকের মৃত্যু হয় অপরিণত বয়সে জন্মানোর কারণে (প্রিম্যাচিওর বার্থ) এবং জন্মকালীন কম ওজন (লো বার্থ ওয়েট) নিয়ে জন্মানোর কারণে। 

আইসিডিডিআর,বির অ্যাসোসিয়েট সায়েন্টিস্ট ডা. আহমেদ এহসানুর রহমান বলেন, প্রতি বছর ১৭ হাজার ১০০ নবজাতক মৃত্যুর ক্ষেত্রে ৪০ শতাংশ পরিবার কোনো ধরনের স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণ করে না। অন্যদিকে ৪৩ শতাংশ নবজাতকের মৃত্যু ঘটে স্বাস্থ্যকেন্দ্রে। নবজাতকের জন্মকালীন ওজন নির্ণয়ের মাধ্যমে তাকে কম ওজনের হিসাবে চিহ্নিত করার যে পদ্ধতি, তার প্রস্তুতি স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোতে পর্যাপ্ত নেই।

বাংলাদেশ হেলথ ফ্যাসিলিটি সার্ভে-২০১৭ অনুযায়ী, দেশের মাত্র ৬৯ শতাংশ জেলা হাসপাতাল এবং ৬৫ শতাংশ উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে এই ওজন পরিমাপক স্কেল আছে। দেশের মাত্র ২০০ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে কেএমসি সেবা প্রদানের ব্যবস্থা আছে, যেখানে সীমিতসংখ্যক কম ওজনসম্পন্ন নবজাতক সেবা পাচ্ছে। কেএমসি প্রদানের গুণমান, ফলোআপ সুবিধার অপর্যাপ্ততা এবং কম সময় স্বাস্থ্যকেন্দ্রে অবস্থানের প্রবণতাও সমীক্ষায় উঠে আসে। ২০২০ সালে মাত্র ৫ হাজার ৭৩১ নবজাতক কেএমসি সেবা লাভ করে, যা সেবা প্রয়োজন এমন নবজাতকের সংখ্যার মাত্র ১ শতাংশ।

ডা. এহসান বলেন, যদিও নবজাতকের মৃত্যু রোধে ক্যাঙ্গারু মাদার কেয়ার (কেএমসি) অত্যন্ত উপযোগী, এটি  একটি কম ব্যয়সাপেক্ষ ও সহজ সমাধান। কিন্তু এই পদ্ধতির সঠিক প্রয়োগের জন্য চাই দীর্ঘ সময় শিশুকে মায়ের ত্বকের সংস্পর্শে রেখে সেবা প্রদান এবং স্বাস্থ্যকেন্দ্রের নিয়মিত পর্যবেক্ষণ।