সোনালি আঁশের সুদিন

করোনার ক্রান্তিলগ্নেও দেশের জাতীয় অর্থনীতিতে রপ্তানিমুখী শিল্প হিসেবে সোনালি আঁশখ্যাত পাটশিল্পের অবদান ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। বর্তমান বিশ্বে কাঁচা পাট রপ্তানিকারক দেশ হিসেবে বৈদেশিক আয়ের বৃহদাংশই এখন বাংলাদেশের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে যা বিশ্ববাজারের প্রায় ৬৫ শতাংশের কাছাকাছি।

পাট ও পাটজাত পণ্য দেশের তৃতীয় বৃহত্তম রপ্তানিমুখী খাত। বর্তমানে দেশে প্রতি বছর প্রায় ৭৫ লাখ বেল পাট উত্পাদন হয়। উত্পাদিত এসব পাটের বৃহদাংশ ক্রেতাই দেশের সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন পাটকল। পাটকলগুলো প্রতি বছর তাদের উত্পাদিত প্রায় ৬ লাখ ৭০ হাজার টন পাটজাত পণ্য রপ্তানি করে থাকে। রপ্তানিকৃত এসব পণ্যসামগ্রী থেকে প্রতি বছর প্রায় ৫ হাজার ২০০ কোটি টাকার সমপরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জিত হচ্ছে। একসময় পাট দিয়ে শুধু চট তৈরি হতো; কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় বর্তমানে এসব পাট দিয়ে তৈরি হচ্ছে পাটের ব্যাগ, শাড়ি, জুতা, স্যান্ডেল, বিছানার চাদর, পর্দা, সোফার কভার, কার্পেটসহ আরো নানা রকমের নান্দনিক সব পণ্য। এছাড়া প্রতি বছর গড়ে প্রায় ১০-১২ লাখ বেল পাট বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রপ্তানি করা হচ্ছে। রপ্তানিকৃত এসব পণ্যের অর্থ দেশের জাতীয় অর্থনীতিতে বিশেষ অবদান রাখছে।

চলমান করোনা পরিস্থিতির মধ্যেও গত ছয় মাসে এই খাতে রপ্তানি আয়ে রেকর্ড পরিমাণ প্রবৃদ্ধি হয়েছে। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য মতে, চলমান অর্থবছরের প্রথমার্ধে পাট ও পাটজাত পণ্য রপ্তানি হয়েছে প্রায় ৬৬ কোটি ৮১ লাখ ডলার যা বাংলাদেশি টাকায় ৫ হাজার ৬৭৮ কোটি ৮৫ লাখ টাকা। যা গত বছরের একই সময়ের চেয়ে ৩০ দশমিক ৫৬ শতাংশ বেশি। পাটশিল্পের এ রপ্তানি আয়ে বর্তমান লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে প্রায় ২০ দশমিক ২৯ শতাংশ বেশি হয়েছে।

তাছাড়াও চলতি অর্থবছরের প্রথম দিকে কাঁচা পাট রপ্তানি হয়েছে প্রায় ৮ কোটি ৪৯ লাখ ডলার সমমূল্যের, পাটজাত সুতা রপ্তানি হয়েছে ৪৪ কোটি ৯২ লাখ ডলার এবং চট ও থলে রপ্তানি হয়েছে ৯ কোটি ১৮ লাখ ডলার। এছাড়া পাটজাত অন্যান্য পণ্য রপ্তানি করে আরো প্রায় ২ কোটি ১৫ লাখ ডলার আয় করেছে দেশ। পাটজাত সুতা এবং চট ও থলে রপ্তানি করে প্রবৃদ্ধি হয়েছে যথাক্রমে ৪২ দশমিক ৭৭ শতাংশ এবং ৫৬ শতাংশ। তবে বিগত অর্থবছরের চেয়ে কাঁচা পাট রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধি কমেছে প্রায় ৪ শতাংশের কাছাকাছি।

পাট ও পাটজাত দ্রব্য বরাবরের মতোই দেশের একটি সম্ভাবনাময় শিল্প খাত। যদিও কালের পরিক্রমায় এবং আধুনিকতার ছোঁয়ায় এর পুরোনো ঐতিহ্য এখন অনেকটাই মলিন হয়ে গেছে। পলিথিন ও প্লাস্টিকের মতো মারাত্মক ক্ষতিকর পণ্যসমূহের সহজলভ্যতা বৃদ্ধি পাওয়ায় এবং এসব পণ্যের অবাধ ব্যবহারের ফলে প্রকৃতি ও পরিবেশে এর বিরূপ প্রভাব দিনদিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। আর সে কারণেই ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে বর্তমানে পরিবেশবিজ্ঞানীরা পাট ও পাটজাত দ্রব্য উত্পাদন ও ব্যবহারের প্রতি গুরুত্ব আরোপ করেছেন। এছাড়াও করোনা মহামারির প্রাদুর্ভাবের ফলে স্বাস্থ্যকর পরিবেশের বিষয়টি জনমনে নতুন করে সচেতনতার সৃষ্টি করেছে। যার ফলে বিশ্ববাজারে পাট ও পাটজাত পণ্যের চাহিদা বিশেষ মাত্রায় বাড়তে শুরু করেছে। দেশের পাটশিল্পের এ অগ্রগতি ও সুনাম বিশ্ববাজারে ধরে রাখতে আমাদের পাটশিল্পের প্রতি আরো বেশি মনোযোগী হতে হবে।

n লেখক :শিক্ষার্থী, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।