বিড়াল

সিয়ামের মন খারাপ। রাত তখন দুইটা। রমজান মাস বলে খুবই স্বাভাবিকভাবে চলছে সবকিছু। সব বাসায় লাইট জ্বলছে। খুব কম মানুষই আছে—যারা ঘুমিয়ে আছে।

মোহাম্মদপুরের এক ছোট্ট বাসায় সিয়াম থাকে তার বাবা-মাকে নিয়ে। অন্যান্য বাবা-মায়ের মতো না তারা। সিয়াম অন্তত তা-ই ভাবে। সে দেখে তার বন্ধুরা ঘোরাঘুরি করে। সবাই একসঙ্গে আড্ডা দেয়। কিন্তু তার বাবা-মা তাকে বাসার বাইরে যেতে দেয় না। সিয়ামকে একা ছাড়তে তারা রাজি নয়। মনে করে ছেলে তাদের এখনো কতই না ছোট। ছেলের নিরাপত্তার কথা ভেবেই তারা তাকে যেতে দিতে চায় না।

আজকের দিনে একটু বেশিই খারাপ মনটা। বাসা থেকে খুব একটা বের হতে না পারলেও ফোন তো আছেই। সবার সাথেই টুকটাক কথা হয়, এজন্যই হয়তো তার মাথা খারাপ হয়ে যায়নি। কিন্তু গত দু’দিন ধরে তার কী জানি হয়েছে। কাউকে নিজ থেকে মেসেজ দিতে মন চায় না। সে লক্ষ করল তার বন্ধুরাও কোনো খোঁজ নিতে আসেনি। অর্থাত্ সে স্মরণ না করলে কারোরই মনে পড়ে না তার কথা।

দিনের বড়ো একটা অংশ সিয়ামের যায় বিভিন্ন সিনেমা দেখে। কিন্তু এতেও একঘেয়েমি লাগছে। সে অসহায় হয়ে পড়েছে। বিছানায় শুয়ে এপাশ-ওপাশ করছে। কিন্তু তার মন শুধু ভারীই হচ্ছে।

কতক্ষণ গেল সে জানে না। কাছেই মসজিদ। মসজিদ থেকে মাইকে বলছে উঠে পড়তে। নৈঃশব্দ্যপূর্ণ নগরীর ভেতর সেই ধ্বনি প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। সেহরির প্রস্তুতি নিতে থাকে সে।

খাওয়ার সময় আজকে সিয়াম চুপচাপ ছিল। নিজ মনে উদাস ভঙ্গিতে। খাওয়া শেষ করে সে চুপচাপ গিয়ে দাঁড়ায় বারান্দায়। অপেক্ষা করতে থাকে কখন ফজরের নামাজ পড়ে ঘুমাতে যেতে পারবে। রাতের এই সময় কী সুন্দর বাতাসই না বয়ে যাচ্ছে। কিন্তু এই দারুণ সৌন্দর্য উপভোগ করার ক্ষমতাও যেন সে হারিয়ে ফেলছে।

তখন হঠাত্ একটা ঘটনা ঘটল। একটা ফুটফুটে বিড়ালছানা অদূরেই ম্যাঁও ম্যাঁও করছে। প্রথমে খুব স্বাভাবিক লাগলেও কেমন জানি ঠেকল ব্যাপারটা তার কাছে। সেই ম্যাঁও শব্দে যেন কত কষ্ট লুকিয়ে আছে। যদিও তার মনের ভুলও হতে পারে। নিজের ছায়াকেই সব স্থানে বসানোর এক ক্ষুদ্র চেষ্টা কি না কে জানে?

সিয়াম আবার বিড়ালের প্রতি দুর্বল। কিন্তু তার বাবা-মায়ের নিষেধ থাকায় বাসায় কোনো বিড়াল পালতে পারেনি। এজন্য এই বিড়ালটিকে কাছে থেকে দেখার ইচ্ছে করছে। ইচ্ছে করছে একটু আদর করে দিতে। সে ভাবছে কী করবে। তখনই ওর মা ওকে বলল ময়লটা যেন ফেলে আসে। সিয়াম তা-ই করে। এই তো সুযোগ।

সে তাড়াতাড়ি নিচে যায়। বিড়ালটাকে খুঁজতে থাকে। সে শুধু শব্দ শুনতে পাচ্ছে। কিন্তু দেখছে না কোথাও। আর সেই ডাকেও একধরনের অস্বস্তি। এক নাগাড়ে ম্যাঁও, ম্যাঁও, ম্যাঁও...। সিয়াম ভাবছে আরো খুঁজবে কি না। তখনই দেখল তাদের বাসার একটু সামনেই পার্ক করা একটি গাড়ির নিচ থেকে ধবধবে একটি বিড়ালছানা উঁকি দিচ্ছে। সে একটু কাছে যেতেই সেটা আবার গাড়ির নিচে চলে যায়।

যখন ফিরছিল, তার বাসার দারোয়ান বলল, সাবজি, এক গাড়িনে উসকি টাং তোড়দি। ইসলিয়ে হি এইসে পুকার রাহি হ্যা।

কথাটি শুনে সিয়ামের মন ভারী হয়ে আসে। এক অদ্ভুত মিল তার আর ওই বিড়ালটির মধ্যে। দুজনেই তীব্র কষ্টের ভেতর হাহাকার করে যাচ্ছে। কিন্তু সেই আর্তনাদ বোঝার ক্ষমতা প্রকৃতি কেন যেন কাউকে দেয়নি।

 

দশম শ্রেণি

ঢাকা রেসিডেনসিয়াল মডেল কলেজ, ঢাকা

 

অলংকরণ :ফাহমিদা ইসলাম, দশম শ্রেণি, মনসিজ আর্ট একাডেমি