তিস্তা নদীর উত্পত্তি ভুটানে হলেও আন্তর্জাতিক এ নদীর অববাহিকা উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় ভারত অর্থাত্ ভারতের উত্তর-দক্ষিণ দিনাজপুর, মালদা, কুচবিহার, আলিপুর দুয়ার হয়ে বাংলাদেশের বৃহত্তর রংপুরের মধ্যদিয়ে প্রবাহিত। তিস্তাপাড়ের বিস্তীর্ণ অঞ্চল জুড়ে রয়েছে বৃহত্তর জনগোষ্ঠী রাজবংশীদের বাস। এখানে রয়েছে তাদের সংস্কৃতির নানা অঙ্গ। আর এ সংস্কৃতির একটা অঙ্গ হলো ছিস্কা-ছিস্কানি বা প্রবাদ-প্রবচন। এসবের কোনো পুঁথিগত পরিচয় না থাকলেও রাজবংশীদের মুখে মুখে বেশ প্রচলিত। তাই এগুলোকে ‘শ্রুতিকথা’ বলা হয়ে থাকে। তবে অঞ্চলভিত্তিক ভাষার প্রভাবে প্রবাদ-প্রবচনের শব্দ ও উচ্চারণভঙ্গিরও ভিন্নতা রয়েছে। তবুও জেলাগুলোর ভাষা-সংস্কৃতির উচ্চারণ ও শব্দার্থ বেশির ভাগ বাংলাদেশ গোত্রীয়।
বেশকিছু প্রবাদ-প্রবচন আছে রাজবংশীদের; তবে আজ সীমিত পরিসরে কেবল পাঁচটি শ্লোকের মাধ্যমে তাদের মনের ভাব আদান-প্রদানের বিষয়টি প্রকাশ করা হলো।
১. উজোত নাই পাড়ে, কুঁজোত তিসায় / (উজোত না পায়, কুঁজোত কিলায়)
তিস্তাপাড়ের রাজবংশী সমাজে উত্থান-পতনের সময়কালে এ সমাজের মানুষের মধ্যে প্রতিযোগিতা শুরু হয়। সেটা ছিল সম্রাট অশোকের রাজত্বকাল। প্রায় হাজার বছরেরও বেশি সময় পর যখন এ অঞ্চলে বৌদ্ধ সংস্কৃতির জাতপাতের ঊর্ধ্বে ওঠা বৈষম্যহীন উদার মূল্যবোধের আগমন ঘটে, তখন রাজবংশী সমাজে ধর্মীয় গোঁড়ামির সৃষ্টি করে আর্যরাই। সমাজে উঁচু-নিচুর ভেদাভেদ করে জাত্যাভিমানের অহমিকায় বিভাজন সৃষ্টি করে; তারই উদাহরণ—‘উজোত’ মানে যার উঁচু সম্মানের পর্যায়ে যাওয়া কষ্টকর; সে সুযোগের অপেক্ষায় থাকে উজোত না পাক, কুঁজোত মানে ষাঁড়ের কুঁজোটাকে কিলিয়ে শোধ তুলতে চায়। অর্থাত্ সুযোগ বোঝে দুর্বল স্থানে আঘাত করা। এখানে বৌদ্ধ সংস্কৃতির উদারতা (জনপ্রিয়তা)-র সাথে পেরে উঠতে না পেরে এককথায় আর্যকর্তৃক নিম্নবর্ণকে দলন। বর্ণবাদ ছাড়াও সবলের সাথে না পেরে দুর্বলের ওপর খবরদারি।
২. বাঁশ বামন কলা, ইনিরা হৈল সীম পেলা
বেশ চমকপ্রদ প্রবাদ এটি। বাঁশঝাড় ও কলাগাছ এক জায়গায় রোপন করলে শেকড়ের মাধ্যমে এসব গাছ ক্রমশ আশপাশের জায়গা দখল করে নেয়। বামন বা ব্রাহ্মণদের বংশকেও পূজা-পার্বণ, বিয়ে, শ্রাদ্ধে প্রয়োজন। এখানেও রাজবংশী সমাজে আর্য সংস্কৃতির উপস্থিতি লক্ষণীয়। আর তাই বাঁশ ও কলাগাছের জায়গা বৃদ্ধির ন্যায় ব্রাহ্মণেরাও তাদের যজমানি পরিসর বৃদ্ধি করে থাকেন। প্রবাদে ‘সীম’ মানে সীমানা বা পরিসরের ব্যাপ্তি।
৩. জাত গুণে পাত, ফরুয়া আড়াই হাত
অনার্য সংস্কৃতির বিলুপ্তির পর আর্য সংস্কৃতি আসার পর রাজবংশীরাও তাদের পরিবেশ-পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটিয়েছে। পরিবর্তন এসেছে তাদের ভাষা-সংস্কৃতিতেও। তদানীন্তন অবিভক্ত উত্তরবঙ্গে বিশেষ করে কোচবিহার ও রংপুর অঞ্চলে ভালো তামাক চাষ হতো। এখানে তামাক পাতার জাত বা গুণ আর তখনকার ব্যবসায়ীদের তহবিলকে ফরুয়া বোঝানো হতো। এই তহবিলে ফিতা বা ডোর লম্বায় আড়াই হাত করেই তৈরি করা হতো। এটা একধরনের বিলাসিতা ও বৈভবের পরিচায়ক হিসেবে তাদের মানতে হতো। এই শ্লোকে মান্যতা লঙ্ঘনকারীর চরিত্র ফুটে উঠেছে। সমাজ পরিবর্তনের সাথে পর্যায়ক্রমে রাজবংশীরাও মান্যতা সংরক্ষণে সচেষ্ট হতে শেখে।
৪. আগাত আছিনু মল্লের মাও, এ্যালা গবর ফ্যালাওঁ আর খাওঁ
প্রবচনটিতে অবনতির কথা বোঝানো হয়েছে। আগে মোড়লের মা’র মতো ক্ষমতাধর ছিল, কিন্তু এখন (এ্যালা) কর্মদোষে গোবর ফেলা আর গোবর খাওয়ার মতো হীন অবস্থায় পতিত হয়েছে—এরূপ বোঝায়।
৫. পড়ার হাড়িত্ খাইলে কয় পেট (প্যাট) নান্দুরা।
পরের ছেঁজাত্ থাকিলে কয়, ছেঁজাত্ মুতুরা।
এই প্রবাদটি সৃষ্টি হয় ইংরেজ শাসনামলে। ইংরেজ বেনিয়াদের শোষণ-পীড়নের কারণে তিস্তা অববাহিকায় ভীষণ দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়। কর্মহীন হয়ে এবং অর্থনৈতিক সংকটে পড়ে ওই অঞ্চলের মানুষ অভাবের দায়ে অন্যের বাড়িতে থাকত। গ্রামীণ মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোকে ‘পড়’ শব্দে বোঝাতো। ‘হাড়ি’ মানে ভাত রান্না করার পাত্র এবং ‘নান্দুরা’ মানে নিন্দুক বা নিন্দা করা। অর্থাত্ শ্রমজীবী মানুষের খাদ্য-খোরাক দেখে নিন্দা করে একধরনের আত্মম্ভরি ব্যক্তি। ‘মুতুরা’ মানে প্রস্রাব করা; আর ‘ছেঁজা’ হলো বিছানা। মানে—বিছানায় প্রস্রাব করা। মোটকথা—পরের রান্না করা ভাত খেলে বলা হয় পেটুক, এদের খাদ্য-খোরাক নিন্দুকেরা দেখতে পারে না। আর পরের বিছানায় শুতে চাইলে এ ধরনের খেটে খাওয়া শ্রমজীবী মানুষদেরকে বলা হয়—এরা বিছানায় প্রস্রাব করে। তবে কালক্রমে দিন পালটাচ্ছে। আশ্বস্ত হওয়ার মতো ব্যাপার হলো —তিস্তাপাড়ের রাজবংশীদের কল্পনাশক্তি ও কবিত্বের স্বাক্ষর স্মরণীয় হয়ে আছে আজও। সংখ্যাগরিষ্ঠ জাতি হিসেবে এদের ছিস্কা-ছিস্কানী বা প্রবাদ-প্রবচন সহ নানামুখী সংস্কৃতির বিকাশ ও সংরক্ষণ ঐতিহ্যসচেতন বাঙালির আজ একান্ত কাম্য।