ঝর্না রহমান
১৯৬৪ সনে ৬ বছর বয়সে লালবাগ ফ্রি প্রাইমারি স্কুলে আমার শিক্ষাজীবন শুরু হয়। আব্বাই আমাকে প্রথম স্কুলে ভর্তি করানোর জন্য নিয়ে গিয়েছিলেন। ভয়ে আমার বুক দুরু করছিল। তাই পাংশু মুখে আব্বার হাত ধরে স্কুলের ভেতরে পা দিই। তখন বিদ্যালয় প্রধান ছিলেন একজন মহিলা। নাম মনে নেই। আব্বা বললেন, তিনি বড় আপা! সালাম দাও। কিন্তু আমি বড় আপার সামনে দাঁড়িয়ে ঘাড় গুঁজে মাটির দিকে তাকিয়ে ছিলাম। তবে বড় আপা আমার সাথে সহজভাবে কথা বলতে শুরু করলেন। কয়েকটা প্রশ্ন করলেন। কবিতা শুনতে চাইলেন। আমাকে আম্মা আগেই অনেক বড় বড় কবিতা শিখিয়েছিলেন। কাজী নজরুল, সুকুমার রায়, সুনির্মল বসু, অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত এঁদের লেখা মজার মজার সব কবিতা! স্কুলে ভর্তি হওয়ার আগেই আমি গড়গড় করে বইও পড়তে পারতাম! কাজেই আমার বিদ্যে দেখে বড় আপা অবাক হয়ে বললেন একে তো ক্লাস টুতেই ভর্তি করিয়ে দেয়া যায়! ব্যস, আমার স্কুল শুরু হলো দ্বিতীয় শ্রেণি থেকে।
ক্লাস টু থেকে এসএসসি পর্যন্ত আমি ছয়টা স্কুলে পড়েছি। আমার আব্বার বদলির চাকরি ছিল বলে কোনো স্কুলে একটানা বেশিদিন পড়তে পারিনি। মাঝে মাঝে আমার পড়াই বাদ গেছে, কিংবা ফাইনাল পরীক্ষা দিতে পারিনি। অন্য স্কুলে গিয়ে ভাঙা ক্লাস টপকে ওপরের ক্লাসে ভর্তি হয়েছি। শেষ স্কুলটা ছিল মহাখালিতে, আদর্শ গার্লস হাইস্কুল। এখানে আমি নাইনে ভর্তি হয়ে একবারে এসএসসি দিয়ে বেরিয়েছি। এটাই ছিল আমার সবচেয়ে প্রিয় স্কুল। মহাখালি ওয়ারলেস গেইটে তিতুমীর কলেজের পেছনে ছিল এ স্কুল। চারপাশে ঘোরানো একতলা বিল্ডিং। মাঝখানে খোলা প্রাঙ্গণ। ওখানেই আমাদের অ্যাসেম্বলি, খেলাধুলা, টিফিনে ঘুরে বেড়ানো, সব হতো। স্কুল চলাকালীন কেউ গেটের বাইরে যেতে পারতো না। যদিও বাইরে ছিল অনেক খোলা জায়গা। দূরে দেখা যেত বনানীর কিছু দালান কোঠা। বাকি সবই লজ্জাবতী লতা আর কাঁটাঝোপ ছাওয়া খোলা জমি। তবে আমরা দু তিনবার ক্লাস পালিয়ে ঐ খোলা মাঠ পেরিয়ে বান্ধবীদের বাসায় গিয়ে মজা করেছি। একবার পাঁচ বান্ধবী মিলে গ্যারিসন হলে একটা ঊর্দু সিনেমাও দেখেছি। ছবির নাম কাতিল! তবে চুরি করে সিনেমা দেখতে গিয়ে ভয়ের চোটে আমার মাথায় কিছুই ঢোকেনি। পর্দার দিকে তাকিয়ে সারাক্ষণ মনে হয়েছে আম্মা জানলে কী করবেন! হয়তো গালের চামড়া টেনে লাল করে দেবেন! আবার লুসি আপার চিন্তা করেও খুব ভয় পাচ্ছিলাম। লুসি আপা ছিলেন আমাদের পিটি ম্যাডাম। প্রচণ্ড কড়া। কোনো দয়ামায়া ছিল না আপার। তবুও আমরা গিয়েছিলাম। রীতিমত দুঃসাহস আর কী!
ঐ স্কুলে আমার গানজীবনের খুব আনন্দময় স্মৃতি রয়েছে। অনেক গান জানতাম আমি। বান্ধবীদের অনুরোধে অনেক গান গাইতাম। টিফিন টাইমটা গান গেয়েই কাটিয়ে দিতাম। গান গাইতে গাইতে বান্ধবীদের পছন্দের গান কাগজে লিখে দিতাম। ছুটি হয়ে গেলেও কম্পাউন্ডের বাইরে বেরিয়ে বিশাল কৃষ্ণচূড়া গাছের ছায়ায় বসে লতা আশা সন্ধ্যা আরতী প্রতিমা এঁদের গান একের পর এক গেয়ে যেতাম। বান্ধবীরা আমাকে ডাকতো লতা। লতা মুঙ্গেশ্করের অজস্র গান আমি ওদের শোনাতাম তাই।
ঐ স্কুলে আমার প্রিয় শিক্ষক ছিলেন দুজন। লতিফ স্যার। তিনি পড়াতেন ইতিহাস। ব্ল্যাকবোর্ডে ইতিহাসের নানা বিশেষ ঘটনার সূত্র এবং পাশে সন-তারিখ লিখে লিখে দারুণ পদ্ধতিতে পড়াতেন। সব মনে থেকে যেতো। আর একজন ছিলেন জুলফিকার স্যার। তিনি ইংরেজি পড়াতেন। তাঁর পড়ানোও খুব ভালো লাগতো। কারণ জুলফিকার স্যার মিষ্টভাষী ছিলেন। আমরা পড়া না পারলেও তিনি বকা দিতেন না। সুন্দর করে বুঝিয়ে দিতেন।
লেখক:কথাসাহিত্যিক, অনন্যা সাহিত্য পুরস্কার প্রাপ্ত
পরের অংশ আগামীকাল