মসজিদ হইল আল্লাহর ঘর ও ইসলামের প্রাণকেন্দ্র। কোরআনুল করিমের ২৮ জায়গায় মসজিদের প্রসঙ্গ আসিয়াছে এবং মসজিদ আবাদকারীদের ইমানদার ব্যক্তি হিসাবে অভিহিত করা হইয়াছে। মসজিদ নির্মাণ এবং ইহার সংরক্ষণের প্রতি অধিক গুরুত্বারোপ করা হইয়াছে। রসুলুল্লাহ (স.) এমন কথাও বলিয়াছেন, যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য মসজিদ নির্মাণ করিবে, আল্লাহ তাহার জন্য জান্নাতে অনুরূপ ঘর নির্মাণ করিবেন। কওমি মাদ্রাসার সনদের স্বীকৃতি, দারুল আরকাম মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা, আলিয়া মাদ্রাসার জন্য স্বতন্ত্র আরবি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা প্রভৃতি যুগান্তকারী ও ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করিবার পর বর্তমান সরকার সারা দেশে ৫৬০টি মডেল মসজিদ নির্মাণের যে উদ্যোগ নিয়াছে তাহা অত্যন্ত প্রশংসনীয়। ধর্মীয় দিক হইতে যাহার গুরুত্ব ও তাত্পর্য অপরিসীম। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নানা সুবিধাসংবলিত সুবিশাল এই সকল মডেল মসজিদের মধ্যে প্রথম পর্যায়ে কাজ সম্পন্ন ৫০টি মসজিদের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করিলেন বৃহস্পতিবার। মুজিববর্ষ উপলক্ষ্যে দেশের প্রতিটি জেলা ও উপজেলায় দৃষ্টিনন্দন এই সকল মডেল মসজিদ ও ইসলামি সাংস্কৃতিক কেন্দ্র নির্মিত হইতেছে। ইহাই বিশ্বে প্রথম কোনো সরকারের একই সময়ে এত বিপুলসংখ্যক মসজিদ নির্মাণের ঘটনা।
আরব বিশ্বের মসজিদ কাম ইসলামিক কালচারাল সেন্টারের আদলে নির্মিত হইতেছে এই সকল মসজিদ। ইহার জন্য ব্যয় ধরা হইয়াছে ৮ হাজার ৭২২ কোটি টাকা। নির্মাণকাজ বাস্তবায়ন করিতেছে গণপূর্ত অধিদপ্তর। মসজিদগুলিতে নারী ও পুরুষের পৃথকভাবে নামাজ আদায় করিবার ব্যবস্থা থাকিতেছে। রসুলের (স.) যুগে নারীরা মসজিদে গিয়া জামাতের সহিত নামাজ আদায় করিতেন। এই মডেল মসজিদগুলি সেই ঐতিহ্য ফিরাইয়া আনিতেছে। ধর্মীয় ইবাদতের জায়গায় নারীর সমান অধিকার প্রতিষ্ঠায় ইহা মাইলফলক। তবে মসজিদের আশপাশে যেন বখাটে, মাস্তান ও উত্ত্যক্তকারীরা ঘোরাফেরা করিতে না পারে, এই জন্য মসজিদ কমিটিকে সচেষ্ট থাকিতে হইবে। এই মসজিদগুলির আরেকটি বৈশিষ্ট্য হইল, ইহা ইবাদতের পাশাপাশি সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডেরও প্রাণকেন্দ্রে পরিণত হইতেছে। এইখানে থাকিবে লাইব্রেরি, অটিজম কর্নার, ইমাম ট্রেনিং সেন্টার, ইসলামি গবেষণা ও দাওয়া কার্যক্রম, হেফজখানা, শিশু ও গণশিক্ষা কার্যক্রম, হজযাত্রীদের প্রশিক্ষণ ও নিবন্ধন, দেশি-বিদেশি পর্যটকদের আবাসন ও অতিথিশালা, লাশ গোসল ও কাফন বহনের ব্যবস্থা, ইমাম-মুয়াজ্জিনদের আবাসনসহ সাংস্কৃতিক কেন্দ্রে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অফিস ও গাড়ি পার্কিংয়ের ব্যবস্থা ইত্যাদি। ৪০ শতাংশ জায়গার উপর তিন ক্যাটাগরিতে এই মসজিদগুলি নির্মাণ করা হইতেছে। জেলা পর্যায়ে চারতলা, উপজেলার জন্য তিনতলা ও উপকূলীয় এলাকায় চারতলা মডেল মসজিদ ও ইসলামিক সাংস্কৃতিক কেন্দ্র নির্মাণ করা হইতেছে। জেলা সদর ও সিটি করপোরেশন এলাকায় নির্মাণাধীন প্রতিটি মসজিদে একসঙ্গে ১ হাজার ২০০ এবং উপজেলা ও উপকূলীয় এলাকার মডেল মসজিদে একসঙ্গে ৯০০ মানুষ নামাজ পড়িতে পারিবেন।
বাংলাদেশের আলেম-ওলামারা এই মডেল মসজিদ ও ইসলামিক সাংস্কৃতিক কেন্দ্র নির্মাণের মহাকর্মকাণ্ডকে অত্যন্ত ইতিবাচক হিসাবে দেখিতেছেন। এইখানে উল্লেখ্য, এই প্রকল্পের অর্থায়নে প্রথমে সৌদি আরব সরকার আগ্রহ প্রকাশ করিয়াছিল। কিন্তু পরবর্তীকালে তাহারা কেন পশ্চাদ্ধাবন করিলেন তাহা বোধগম্য নহে। তবে পদ্মা সেতুর মতো এই প্রকল্পও এখন সরকার নিজ অর্থায়নে বাস্তবায়ন করিতেছে। এই সাহসিকতাও ধন্যবাদ পাইবার যোগ্য। মূলত ইহা আওয়ামী লীগের নির্বাচনি ইশতেহারেরই বাস্তবায়ন। মহান আল্লাহর করুণা ও সন্তুষ্টি লাভ এবং ইসলামের ভ্রাতৃত্ব ও মূল্যবোধ প্রচার ও উগ্রবাদের বিরুদ্ধে ইসলামের প্রকৃত মর্মবাণী বিশ্ববাসীর নিকট পৌঁছাইয়া দিতে এই মডেল মসজিদগুলি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করিবে বলিয়া আমরা আশা করি। মসজিদগুলি পরিচালিত হইবে ইসলামি ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে এবং ইহাতে হাজার হাজার আলেমের কর্মসংস্থান নিশ্চিত হইবে। বিশুদ্ধ ইসলামের প্রচার-প্রসারের পাশাপাশি ইসলামের প্রকৃত সেবার দ্বারও অবারিত হইবে।