মৃণাল কান্তি চক্রবর্তী
বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার অর্ধেক নারী। আর এই অর্ধেক জনগোষ্ঠীর জীবনমানের উন্নয়ন ঘটানোর মাধ্যমে ক্ষমতায়িত করার জন্য স্বাধীনতার পর থেকেই বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা ক্ষুদ্র ঋণসহ সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে। সেইসঙ্গে সরকারি বিভিন্ন পদক্ষেপও নারীর ক্ষমতায়নের জন্য নেওয়া হচ্ছে। যদিও আজ শিক্ষায় নারীর অগ্রযাত্রা অপ্রতিরোধ্য; পাশাপাশি বিভিন্ন সেক্টরে নারীর পদচারণা বাড়ছে। বৈমানিক থেকে শুরু করে পুলিশ, সেনাবাহিনী, সরকারি কর্মকর্তা, শিক্ষক, ড্রাইভার সব ক্ষেত্রেই আজ নারী সমানতালে পাল্লা দিয়ে ছুটছে। তবে তাদের ছুটে চলার পথ মসৃণ নয়। পারিবারিক, সামাজিক এমনকি কর্মস্থলের বিভিন্ন বাধা অতিক্রম করেই নারীকে তার নিজের অবস্থান ঠিক রাখতে হচ্ছে। বৈদেশিক মুদ্রা আনয়নে বা রপ্তানি খাতের বৃহত্ সেক্টর গার্মেন্টেসে নারীদের দীপ্ত পদচারণা বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ভিত্তিকে মজবুত করছে। তারপরেও বৃহত্ নারীসমাজকে এখনো পরিবারে বা নিজ গৃহে গার্হস্থ্য কর্মভারের চাপ নিতে হয়। যদিও নারীর এই গার্হস্থ্য কর্মভারকে আমরা স্বীকৃতি দিতে নারাজ। নারীর গার্হস্থ্য কাজকে মূল্যায়িত করা হলে তা জিডিপিতে বড় ধরনের অবদান রাখত।
নারীর ক্ষমতায়নের জন্য সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন উদ্যোগ আজ দৃশ্যমান। নারীর ক্ষমতায়নের প্রাথমিক ধাপ হলো তাকে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করে তোলা। আমরা যারা তৃণমূলে কাজ করি তারা প্রতিদিনই দেখতে পাই নারীর বদলে যাওয়ার চিত্র। কেউবা হাঁস-মুরগি পালন করছেন, কেউবা গাভি পালন করছেন, কেউবা বাড়িতে বসে সেলাইয়ের কাজ করছেন, কেউবা বাড়ির আঙিনায় সবজি চাষ করছেন, কেউবা বাড়ির সামনে খুপড়ি ঘরে মুদি দোকান সাজিয়ে বসছেন আবার কেউবা দোকানের পসরা সাজিয়ে মাথায় নিয়ে বাড়ি বাড়ি ফেরি করে পণ্য বিক্রি করছেন। নিজেদের উপার্জিত অর্থ সব নারী স্বাধীনভাবে খরচ করতে না পারলেও নারীর পারিবারিক অবস্থান ও নিজেদের আত্মমর্যাদার জায়গাটা কিছুটা হলেও বৃদ্ধি পাচ্ছে।
২০২০ সালের প্রথম দিকে শুরু হওয়া বৈশ্বিক মহামারি করোনাভাইরাস এমন প্রান্তিক ক্ষুদ্র নারী উদ্যোক্তাদেরও পথে বসিয়ে দিয়েছে। স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণে দীর্ঘ সময়ের লকডাউনে তাদের কাজকর্ম প্রায় বন্ধ হওয়ার পথে। কঠোর পরিশ্রমে তিলে তিলে জমানো নিজেদের ব্যবসার পুঁজি ভেঙে অনেক ক্ষুদ্র নারী উদ্যোক্তা আজ সহায়-সম্বলহীন। সরকার আজ বিভিন্ন সেক্টরে প্রণোদনা দিচ্ছে। বড় বড় ব্যবসায়ীরা প্রণোদনা পাচ্ছেন, এমনকি উইমেন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (বিডব্লিউসিসিআই)-এর অন্তর্ভুক্ত নারী উদ্যোক্তারাও পাচ্ছেন প্রণোদনা। ২০২১-২০২২ বাজেট পরবর্তী সময়ে উইমেন চেম্বারের পক্ষ থেকে ক্ষতিগ্রস্ত নারী উদ্যোক্তাদের জন্য ২০০ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব রাখা হয়েছে। প্রস্তাবিত বাজেটে ৪১৯১ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের জন্য। এ টাকা নারীদের উন্নয়নে অবদান রাখবে। তবে উল্লিখিত অর্থনৈতিক খাতসমূহে জড়িত বৃহত্ নারীসমাজ যারা বাড়িতে বসে সেলাইয়ের কাজ, মুদি দোকানি, চা বিক্রেতা, গাভি পালনকারী কিংবা বাড়িতে বাড়িতে ঘুরে ফেরি ব্যবসা করে জীবিকা নির্বাহ করেন বা করতেন, করোনার থাবায় যাঁরা এখন পুঁজি হারিয়ে নিঃস্ব—তাঁরা কিন্তু উইমেন চেম্বারের আওতাভুক্ত সদস্য নন। তাঁদের জন্য কোনো প্রণোদনা এখন পর্যন্ত বরাদ্দ হতে দেখিনি। যদিও কিছু সংখ্যক বেসরকারি সংস্থা হয়তো সামান্য কিছু পুঁজি দিয়ে তাঁদের সহযোগিতা করছে, তবে সেটা যথেষ্ট নয়।
তিলে তিলে গড়ে ওঠা নারীর অর্থনৈতিক আত্মনির্ভরশীলতার গতিপথকে সচল রাখতে প্রয়োজন সমন্বিত পরিকল্পনা। স্বাধীনতা পরবর্তী নারীর যে অর্জন তা শুধু তার নিজের জন্যই নয়। নারীর কষ্টার্জিত আয় থেকেই তার পরিবারের কন্যাশিশুটি আজ উচ্চশিক্ষার দ্বারপ্রান্তে পৌঁছাতে পারছে। শুধু প্রাতিষ্ঠানিক বড় বড় শিল্পপতি বা উদ্যোক্তাকেই নয়, করোনা সংকট কাটিয়ে ওঠার জন্য তৃণমূলে প্রতিনিয়ত সংগ্রামরত ক্ষুদ্র নারী উদ্যোক্তাদেরও বিবেচনায় রাখতে হবে, না হলে তার নেতিবাচক প্রভাব অবশ্যই সুদূরপ্রসারী।
নেত্রকোনা