বানেশ্বর হাটে ‘ঢলন চক্রে’ জিম্মি আমচাষিরা

স্টাফ রিপোর্টার, রাজশাহী

রাজশাহীর বৃহত্তম আমের হাট বানেশ্বরে ‘ঢলন চক্রে’ জিম্মি হয়ে পড়েছে আমচাষি ও বিক্রেতারা। আমচাষিরা বলছেন, গত চার বছরে আম বিক্রিতে ‘ঢলন’ বেড়েছে দ্বিগুণ। চলতি মৌসুমে আমচাষিদের প্রতি মণ (৪০ কেজি) আম বিক্রির সময় প্রায় ১০ কেজি ‘ঢলন’ দিতে হচ্ছে।

আমচাষিরা বলছেন, করোনার প্রভাবে এবার বাইরের বেশির ভাগ ব্যবসায়ী আমের হাট বানেশ্বরে আসেননি। এ সুযোগে স্থানীয় ফড়িয়া ও আড়তদাররা আমের বাজার নিয়ন্ত্রণ করছেন। কয়েক দিন আগে বানেশ্বর হাটে গিয়ে দেখা যায়, স্থানীয় ফড়িয়া ও আড়তদাররা প্রতি মণ (৪৮ কেজি) হিসাবে আম কিনছেন। এতে বিক্রেতার ‘ঢলন’ আট কেজি। অনেক চাষিকে আম বিক্রি করতে হচ্ছে প্লাস্টিকের ক্যারেট (ঝুড়ি) চুক্তিতে। প্রতি ক্যারেটে গড় ২৫ কেজি আম বিক্রি করতে হচ্ছে।

আম বিক্রি করতে আসা চাষি জাকির জানান, বানেশ্বরে আম বিক্রি করলে কয়েকটি ধাপে ‘ঢলন’ দিতে হয়। এর মধ্যে আড়তদার প্রতি মণে নিচ্ছেন আট কেজি। ওজনকারী প্রতি মণ মাপার আগে শোলার নামে সবচেয়ে বড় আম তুলে আলাদা করে নিজের জন্য রাখেন। এরপরও ওজনকারীরা খাওয়ার নামে আরো দুই-তিনটা করে নেন। সব শেষে আমের দাম দেওয়ার সময় ক্যাশিয়ার ‘বাটা’ নামে (কমিশন) ২০-৫০ টাকা পর্যন্ত কেটে রাখে।

আমচাষি জহুরুল জানান, নিজের বাগানের আম বানেশ্বরে বিক্রি করতে গিয়েও সিন্ডিকেটের কাছে জিম্মি থাকতে হয়। সংশ্লিষ্টরা যেভাবে পারছেন, চাষিদের আম লুট করছেন। গত কয়েক বছর আগে প্রতি মণে পাঁচ কেজি ‘ঢলন’ ছিল। এখন ‘ঢলন’ বেড়ে দাঁড়িয়েছে আট কেজিতে। অতিরিক্ত আম নেওয়ার বিষয়টি একরকম ওপেন সিক্রেট। হাট কমিটি বা স্থানীয় প্রশাসন অবহিত। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, সংশ্লিষ্টরা ‘ঢলন’ অতিরিক্ত ওজন নেওয়ার প্রমাণ রাখে না। কিন্তু প্রশাসন প্রমাণ হিসেবে ‘ডকুমেন্টস’ চায়। এ কারণে তিনি বাগানেই আম বিক্রি করেন।

বানেশ্বরের আমের আড়তদার তসলিম উদ্দীন বলেন, আম কাঁচামাল। এর ‘ভর্তুকি’ আছে। এ কারণে ৪৭-৪৮ কেজিতে মণ হিসাব করতে হয়। প্রশাসনের কেজি দরে আম কেনার নির্দেশনার বিষয়ে তিনি বলেন, তারা কোনো বিক্রেতার কাছ থেকে জোর করে আম নেন না। কেনার সময়ই তাদের বলা হয় প্রতি মণে কত কেজি ‘ঢলন’ দিতে হবে। বিক্রেতাদের ইচ্ছে হলে দেবেন, আর না হলে দেবেন না।

বাইরের আম ব্যবসায়ী সোহানুর বলেন, তারা কয়েক বছর থেকে বানেশ্বর হাট থেকে আম কিনে সিরাজগঞ্জে নিয়ে বিক্রি করেন। শুরু থেকেই তারা প্রত্যক্ষ করছেন, কৃষকদের থেকে আড়তদাররা ৪৮ কেজিতে মণ হিসাব করলেও তাদের কাছে বিক্রি করেন প্রতি মণ ৪০ কেজিতে। এর মধ্যে দুই এক কেজি ‘ঢলন’ চাইলে অতিরিক্ত দাম নেয় আড়তদাররা। এক্ষেত্রে পুরো বানেশ্বর জুড়ে আমের আড়তদাররা একাট্টা বলেও জানান তিনি।

বানেশ্বর হাট ইজারাদার ওসমান আলী বলেন, কোনো ‘ঢলন’ নয়, ৪০ কেজিতে মণ হিসাবে আম বিক্রি করতে হবে। বাড়তি ওজন কেউ নিলে তার দাম দিতে নির্দেশ দিয়েছেন উপজেলা প্রশাসন। তবে এই সিদ্ধান্ত এখনো আমের আড়তে কার্যকর হয়নি। প্রতি মণ আমে অতিরিক্ত ওজন দিয়েছেন এমন কোনো অভিযোগও কেউ করেননি। ফলে এখনো ‘ঢলন’ বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়া যায়নি।

পুঠিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নুরুল হাই মোহাম্মদ আনাছ বলেন, আমের বাজার ব্যবস্থাপনায় ‘ঢলন’ বা ‘শোলা’ বাতিলের বিষয়ে স্থানীয় ব্যবসায়ী ও আমচাষিদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। নির্দেশনা বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্টদের অংশগ্রহণে একাধিক বৈঠকে আম ওজনের ক্ষেত্রে ‘মেট্রিক’ পদ্ধতি অনুসরণের সিদ্ধান্ত হয়েছে। মণ হিসাব হবে ৪০ কেজিতে, বেশি নিলে বাড়তি দাম দেবেন ক্রেতারা। তবে প্রতি মণে ‘ঢলন’ বা ‘শোলা’ দিতে হচ্ছে, এমন অভিযোগ কেউ করেননি। অভিযোগ পেলে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।