পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে নতুন মোড়। কেন্দ্রের ক্ষমতাসীন দল বিজেপি ছেড়ে আবারও তৃণমূল কংগ্রেসে ফিরেছেন দলটির সর্ব ভারতীয় সহসভাপতি মুকুল রায়। পশ্চিমবঙ্গের প্রভাবশালী এই নেতা চার বছর বিজেপিতে ছিলেন। সর্বশেষ বিধানসভা নির্বাচনে তিনি বিজেপির বিধায়ক নির্বাচিত হন এবং এখন পর্যন্ত ঐ পদে আসীন। কিন্তু গতকাল শুক্রবার হঠাত্ করেই তৃণমূল কংগ্রেসে ফিরলেন। তার সঙ্গে যোগ দিয়েছেন ছেলে শুভ্রাংশু রায়ও। বিজেপিতে থাকতে না পেরেই তৃণমূলে ফিরেছেন বলে জানিয়েছেন মুকুল রায়। তাকে স্বাগত জানিয়ে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী তথা তৃণমূল কংগ্রেস সভানেত্রী মমতা ব্যানাজি বলেছেন, ঘরের ছেলে ঘরে ফিরেছে। ভবিষ্যতে আরো অনেকেই আসবেন। তবে বিধানসভা নির্বাচনের সময় যারা গাদ্দারি করে দল ছেড়েছে, তাদের জায়গা হবে না।
মমতা বানার্জি ও মুকুল রায় সম্পর্কের বরফ যে গলছিল তার ইঙ্গিত কয়েক দিন আগে থেকেই পাওয়া যাচ্ছিল। বিধানসভা নির্বাচনের ফল প্রকাশের পর শুভেন্দু অধিকারীকে পশ্চিমবঙ্গের বিরোধীদলীয় নেতা করার পর থেকেই বিজেপির সঙ্গে দূরত্ব বাড়তে থাকে মুকুল রায়ের। তার ঘনিষ্ঠ সূত্র জানায়, শুধু এমএলএ রেখে মুকুল রায়ের গুরুত্ব পশ্চিমবঙ্গ বিজেপিতে সীমিত করে দেওয়া হয়েছিল। অথচ মুকুল বিজেপির সর্ব ভারতীয় সহসভাপতি ছিলেন। তার স্ত্রী বর্তমানে গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি থাকলেও বিজেপি নেতৃত্বের কেউ খোঁজখবর নেননি। কিন্তু কয়েক দিন আগে তাকে দেখতে যান মমতা ব্যানার্জির ভাতিজা, তৃণমূল কংগ্রেসের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক ব্যানার্জি। তখন থেকেই মমতা-মুকুল সম্পর্ক স্বাভাবিক হওয়ার গুঞ্জন শুরু হয়। শুক্রবার এমন সময়ে মুকুল রায় তৃণমূলে ফিরলেন, যেদিন তার স্ত্রীর অবস্থা সংকটাপন্ন। ফুসফুস ট্রান্সপ্ল্যান্ট করা জরুরি হয়ে পড়েছে।
গতকাল কলকাতার তৃণমূল ভবনে মমতা ব্যানার্জি এবং অভিষেক ব্যানার্জির উপস্থিতিতে মুকুল রায় তৃণমূলে ফেরেন। এসময় মমতা বলেন, ভয় দেখিয়ে মুকুলকে বিজেপিতে যোগ দেওয়ানো হয়েছিল। ওখানে তার দম বন্ধ হয়ে আসছিল। ‘ওল্ড ইজ গোল্ড’। ঘরের ছেলে ঘরে ফিরে এসেছে। নির্বাচনের সময় মুকুল আমাদের বিরুদ্ধে একটা কথাও বলেনি। ভবিষ্যতে আরো অনেকেই দলে ফিরে আসবেন। তবে যারা নোংরামির সীমা ছাড়িয়েছে, টাকার জন্য তৃণমূল ছেড়েছে, দলে তাদের জায়গা হবে না।
২০১৭ সালের নভেম্বরে তৃণমূলের তত্কালীন সর্ব ভারতীয় সম্পাদক ছিলেন মুকুল রায়। সেই পদে এখন মমতার ভাতিজা অভিষেক ব্যানার্জি। এখন মুকুল রায়কে কোন দায়িত্ব দেওয়া হবে সে প্রসঙ্গে তৃণমূল সূত্র বলছে, পশ্চিমবঙ্গ থেকে রাজ্যসভায় দুটি আসন খালি রয়েছে। তার কোনো একটিতে মুকুল রায়কে এমপি করা হতে পারে। পাশাপাশি তাকে অন্য রাজ্যে তৃণমূল কংগ্রেসের ক্ষমতা বিস্তারের কাজে লাগানো হবে।
তত্কালীন তৃণমূল কংগ্রেসের চাণক্য হিসেবে পরিচিত ছিলেন মুকুল রায়। মমতার পর দলে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ক্ষমতার অধিকারী ছিলেন। ২০১১ সালে তৃণমূলের পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায় আসার অন্যতম কারিগরও ছিলেন তিনি। পরবর্তীকালে মনিপুর, মেঘালয় এবং ত্রিপুরা—এই তিন রাজ্যে জাতীয় কংগ্রেস থেকে অনেক এমএলএকে দলে ভিড়িয়েছিলেন তিনি। ঐ রাজ্যগুলোর ক্ষমতার বলেই তৃণমূল ভারতে জাতীয় রাজনৈতিক দলের মর্যাদা পায়। এবারও তাকে হয়তো, উত্তর-পূর্ব ভারতের রাজ্যগুলোতে তৃণমূলের শক্তি বাড়াতে দায়িত্ব দেওয়া হবে; যাতে ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে মমতা ব্যানার্জি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠতে পারেন।
এদিকে বিজেপির পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সভাপতি দিলীপ ঘোষ এক প্রতিক্রিয়ায় বলেছেন, মুকুল রায় থাকায় বিজেপির কোনো লাভ হয়নি। গতকাল বনগাঁওয়ে এক বৈঠক শেষে তিনি বলেন, আমাদের অনেক কর্মী ঘরছাড়া, সবাইকে শান্তিতে বাড়িতে ফিরিয়ে আনাই আমাদের লক্ষ্য। এখন কে গেল, কে এলো, তা নিয়ে ভাবতে চাই না।