আশা-নিরাশার জি-৭ সম্মেলন

ব্রিটেনে সাতটি ধনী দেশের সংগঠন জি-৭-এর সম্মেলন চলিতেছে। শুক্রবার শুরু হওয়া এই সম্মেলন চলিবে আজ রবিবার পর্যন্ত। গ্রুপ অব সেভেন, যাহা জি-৭ বলিয়া পরিচিত তাহার সদস্য রাষ্ট্রগুলি হইল—যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি ও জাপান। যদিও এইবারের সম্মেলনে আলাদা করিয়া অতিথি রাষ্ট্র হিসাবে দাওয়াত করা হইয়াছে অস্ট্রেলিয়া, ভারত ও দক্ষিণ কোরিয়াকে। ইউরোপীয় ইউনিয়নও সম্মেলনে উপস্থিত থাকিবার জন্য ইউরোপিয়ান কমিশনের প্রেসিডেন্ট এবং ইউরোপীয় কাউন্সিলের প্রেসিডেন্টকে পাঠাইয়াছে। উল্লেখ্য, ইহাই ১৯৯৭ সাল হইতে জি-৮ নামে সমধিক পরিচিত ছিল; কিন্তু ক্রিমিয়া অঞ্চলকে রাশিয়ার অন্তর্ভুক্ত করা হইলে ২০১৪ সালে রাশিয়াকে সাসপেন্ড করা হয়। জি-৭ গ্রুপের এই সাতটি উন্নত দেশ বিশ্বের তাবত্ সম্পদের ৫৮ শতাংশের প্রতিনিধিত্ব করিয়া থাকে। সুতরাং এই সম্মেলনের যথেষ্ট বৈশ্বিক গুরুত্ব রহিয়াছে।

বহু কারণেই এই সম্মেলন তাত্পর্যপূর্ণ। গত বত্সর সংগঠনের সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় নাই বিশ্বব্যাপী করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের কারণে। ইতিমধ্যে বিশ্বের অর্থনীতি ও রাজনৈতিক পরিবেশে আসিয়াছে আমূল পরিবর্তন, ঘটিয়াছে অনেক অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা। ক্ষমতার পালাবদল হইয়াছে সংগঠনের অন্যতম সদস্য দেশ যুক্তরাজ্য, জাপান, ইতালি ও যুক্তরাষ্ট্রে, যাহা অধিক অর্থবহ। করোনার প্রকোপে চোখে পড়িবার মতো দুর্বল হইয়াছে এমনকি ধনী দেশগুলির অর্থনীতিও; জি-৭ভুক্ত দেশগুলিতেও চাকুরি হারাইয়াছে লক্ষ লক্ষ মানুষ। এই রকম অবস্থায় নেতারা সম্মেলনে বসিয়া সিদ্ধান্ত লইয়াছেন—তাহাদের আলোচনার মূল বিষয় থাকিবে করোনা পরিস্থিতি মোকাবিলা, অর্থনৈতিক অবস্থার পুনরুদ্ধার, জলবায়ু পরিবর্তন ও ভূরাজনীতি। ইতিমধ্যেই যুক্তরাজ্যের তরফ হইতে বিশ্বের দরিদ্র দেশগুলির জন্য ১০০ কোটি টিকার প্রস্তাব করা হইয়াছে। অবশ্য সম্মেলনের পূর্বেই বৃহস্পতিবার প্রেসিডেন্ট বাইডেন ৫০০ মিলিয়ন ভ্যাকসিন দরিদ্র দেশগুলির জন্য অনুদান দেওয়ার কথা বলিয়াছেন। তবে ইহা বুঝিতে কোনোই বেগ পাইতে হয় না যে, সম্মেলনে আলোচনার একটি বড় অংশ দখল করিয়া থাকিবে রাশিয়া ও চীন; আগামী দিনগুলিতে চীন ও রাশিয়াকে অর্থনৈতিক এবং ক্ষেত্রবিশেষ সামরিকভাবে মোকাবিলা করার উপায় কী হইবে, সম্মেলনের দ্বিতীয় দিনেই প্রেসিডেন্ট বাইডেন তাহা প্রকাশ করিয়াছেন। তিনি চীনকে মোকাবিলার জন্য একটি নতুন জোট গঠনের আহ্বান জানাইয়াছেন। শনিবারের সেশনেই উল্লেখ করা হইয়াছে, রোড অ্যান্ড বেল্ট ইনিশিয়েটিভের মাধ্যমে চীন উন্নয়নশীল দেশগুলিতে যে শত শত কোটি টাকা বিনিয়োগ করিতেছে, পশ্চিমা গণতান্ত্রিক দেশগুলিকে তাহা মোকাবিলা করিতে হইবে। ইহার সহিত চীনের উইঘুর অঞ্চলে সংখ্যালঘু মুসলমান সম্প্রদায়ের উপর মানবাধিকার লঙ্ঘনের সমালোচনা করা হইয়াছে। উল্লেখ্য, সোমবার বেলজিয়ামের রাজধানী ব্রাসেলসে ন্যাটো জোটের মিটিং রহিয়াছে এবং আগামী বুধবার জেনেভায় রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সহিত আলোচনায় বসিবার কথা রহিয়াছে।

প্রশ্ন হইল, জোট করিয়া বা কয়েকটি নির্দিষ্ট দেশের প্রচেষ্টায়, বিশেষ করিয়া রাশিয়া ও চীনের মতো শক্তিশালী ও জনবহুল দেশ বাদ রাখিয়া বিদ্যমান বিশ্ব সমস্যার সমাধান হইবে কি? ইতিমধ্যেই প্রশ্ন উঠিয়াছে, রাশিয়া ও চীনকে বাহিরে রাখিয়া এই জোট বিশ্বশান্তি কতটা আনিতে পারিবে? নাকি শুধু আলোচনার জন্য আলোচনা হইয়া থাকিবে। হউক অর্থনীতি, হউক জাতিগত সংকট—যে কোনো বিষয়েই সকল পক্ষের সমঝোতাই কেবল সমাধান আনিতে পারে বলিয়া আমাদেরও ধারণা। দেশে দেশে অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতা থাকিবে, নিজস্ব কৌশল থাকিবে তাহা অস্বাভাবিক নহে; কিন্তু কাহাকেও বাদ রাখিয়া জোট করিয়া পরিকল্পনা করা কেবল সংঘাতের ক্ষেত্রই বাড়াইতে পারে। তাহা অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতাকে পেশি ব্যবহারের পথে টানিয়া লইতে পারে। জি-৭ যে বিষয়গুলি লইয়া আলোচনায় বসিয়াছে, তাহা বৃহত্তর বৈশ্বিক ফোরাম জাতিসংঘে গুরুত্বের সহিত আলোচনা হইলে অধিক ফলপ্রসূ হইতে পারে বলিয়া আমরা মনে করি।