জর্জ ভাই নামে পরিচিত ছিলেন তিনি। দিনাজপুরে জর্জ দাসের নেতৃত্বাধীন মুক্তিবাহিনী পরিচিতি পেয়েছিল ‘জর্জ বাহিনী’ নামে। তাদের দুঃসাহসিকতার কারণে পাকিস্তানি বাহিনী সর্বদা তটস্থ থাকত। রামসাগর, ঘুঘুডাঙ্গা, মোহনপুর, বিরলসহ বিভিন্ন এলাকার অপারেশনে পাকিস্তানি সেনাদের অনেকে মারা যাওয়ায় জর্জ বাহিনীর নাম বেশি করে ছড়িয়েছিল।
মুক্তিযুদ্ধের পর যে বিছানায় ঘুমাতেন সেখানে মুক্তিযুদ্ধকালের ব্যবহূত একটি কম্বল বিছিয়ে রাখতেন। একবার কম্বলটির অংশবিশেষ পুড়েও গিয়েছিল। এরপরেও এটাকেই তিনি তার বিছানায় বিছিয়ে রাখতেন মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিস্মারক হিসেবে। মৃত্যুর পর রাষ্ট্রীয় মর্যাদা পেয়েছিলেন তিনি। জাতীয় পতাকায় কিছুক্ষণ ঢেকে রাখা হয়েছিল তাঁর লাশ।
দিনাজপুর জেলা শহরের মিশন রোড নিবাসী জর্জ দাস মুক্তিযুদ্ধের আগে একজন অবসরপ্রাপ্ত ইপিআর সৈনিক ছিলেন। এই বাহিনীতে যোগ দিয়েছিলেন ১৯৫৯ সালে। ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের পরিপ্রেক্ষিতে পাকিস্তানি শাসক গোষ্ঠী বাঙালি সৈনিকদের বিরুদ্ধে অঘোষিত পদক্ষেপ নেওয়া শুরু করলে সাহসী সৈনিক জর্জ দাসের ভাগ্যেও বিপর্যয় নেমে আসে। ১৯৬৯ সালের ১৯ ডিসেম্বর তাঁকে দেওয়া হয় বাধ্যতামূলক অবসর।
বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণের পর দিনাজপুরের বিভিন্ন স্থানে যুবকেরা অস্ত্র প্রশিক্ষণ নেওয়া শুরু করে। অন্যতম একজন প্রশিক্ষক ছিলেন জর্জ দাস। তিনি কেবিএম কলেজে ডামি রাইফেলের সহায়তায় যুবকদের সামরিক ট্রেনিং দিতেন। মুক্তিযুদ্ধের শুরুতে ১৯৭১ সালের ২৮ মার্চ দিনাজপুরের বীর জনতা পাকিস্তানি সেনাদের অন্যতম ঘাঁটি ইপিআর সেক্টর হেড কোয়ার্টার কুঠিবাড়ি দখল করে নেয়। এ ঘটনায় জর্জ দাস তাঁর স্বেচ্ছাসেবকদের নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
কুঠিবাড়ি দখলের পর দিনাজপুর শহর থেকে পাকিস্তানি সেনারা পালিয়ে যায়। এর ক’দিন পর পাকিস্তানি বাহিনী আবারো সৈয়দপুর থেকে দিনাজপুর শহরের দিকে আসতে শুরু করলে জর্জ দাস কয়েকজন সঙ্গী নিয়ে প্রথমে ভূষিরবন্দর, পরে দশমাইলে প্রতিরোধের চেষ্টা করেন। একই সময়ে আরো কয়েক হাজার মানুষ পাকিস্তানিদের অগ্রাভিযানে বাধা দেওয়ার চেষ্টা চালায়। কিন্তু শত্রুবাহিনীর অত্যাধুনিক অস্ত্রের সামনে সেই চেষ্টা ব্যর্থ হয়। ১৯৭১ সালের ১৪ এপ্রিল দিনাজপুর শহর আবারো হানাদারদের দখলে চলে যায়। এ অবস্থায় অন্য অনেকের মতো ভারতে গিয়ে আশ্রয় নেন জর্জ দাস। সীমান্ত সংলগ্ন হামজাপুর-শিবপুর এলাকায় মুক্তিকামী যুবকদের সংগঠিত করেন তিনি। সেখানে ৪০০ যুবকের সমন্বয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের একটি দল গড়ে তোলেন। এই দল পরে মুজিবনগর সরকারের ৭ নম্বর সেক্টরের আওতায় কার্যক্রম শুরু করে এবং ক্যাম্পের মুক্তিযোদ্ধারা ‘জর্জ বাহিনী’ নামে পরিচিতি পায়। জর্জ দাসের নেতৃত্বাধীন মুক্তিবাহিনীর দুঃসাহসিক অভিযানে পাকিস্তানি হানাদারদের ব্যাপক ক্ষতি সাধিত হয়, যা যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে বাঙালিদের মনোবল ও আত্মবিশ্বাস বাড়াতে অবদান রাখে।
আজহারুল আজাদ জুয়েল