আমরা সাম্প্রতিক কালে বহুবার বলিবার চেষ্টা করিতেছি যে, স্থানীয় প্রশাসনে যেই সকল সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী কাজ করিতেছেন, তাহাদের অনেকেই তটস্থ আছেন। ক্ষমতাসীন দলের একশ্রেণির নেতাকর্মীর হুমকি-ধমকির কারণে তাহারা মনোযোগ দিয়া কাজকর্ম করিতে পারিতেছেন না। তাহাদের দৌরাত্ম্য বন্ধ করা দরকার। দরকার তাহাদের লাগাম টানিয়া ধরা। কিন্তু এই ক্ষেত্রে তেমন কোনো অগ্রগতি হইতেছে না। গতকাল সকল পত্রপত্রিকায় যেই খবরটি বড় করিয়া ছাপা হইয়াছে, তাহাতেও কি আমাদের টনক নড়িবে না? সিসিটিভিতে ধারণকৃত একটি ছবিতে দেখা যাইতেছে, পাবনার গণপূর্ত ভবনে সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের কতিপয় নেতা একদল ঠিকাদার লইয়া প্রকাশ্যে অস্ত্র বহন করিয়া মহড়া দিতেছেন। গণপূর্ত বিভাগের কর্মকর্তারা কোনো অভিযোগ না করিলেও একটি সরকারি অফিসে এইভাবে অস্ত্র প্রদর্শন করা মোটেও সমীচীন নহে। ইহাতে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মনে যে আরো ভয়-ভীতির জন্ম নিবে, তাহাতে কোনো সন্দেহ নাই। যদিও সংশ্লিষ্ট নেতারা তাহাদের ভুল স্বীকার করিয়াছেন। কিন্তু ইহা কীসের ইঙ্গিত?
অস্ত্র বৈধ কি অবৈধ, হুমকি দেওয়া হইয়াছে কি দেওয়া হয় নাই—এখানে তাহা বড় কথা নহে। প্রশ্ন হইল প্রকাশ্যে অস্ত্র হাতে একটি সরকারি অফিসে কেহ প্রবেশ করেন কীভাবে? সেইখানে নিরাপত্তার দায়িত্বে যাহারা নিয়োজিত রহিয়াছেন, তাহাদের গাফিলতিও তদন্ত করিয়া দেখা দরকার। এইভাবে ক্ষমতার প্রভাব-বলয় তৈরি করিয়া বিভিন্ন কাজের দরপত্র নিজেদের আয়ত্তে নেওয়ার চেষ্টা নিন্দনীয়। এই ব্যাপারে প্রশাসন কি একেবারে হাল ছাড়িয়া দিয়া বসিয়া আছে? যখনই এই ব্যাপারে কিছু বলা হয়, তখন সরকারি কর্মকর্তাগণ বলেন, যাহারা হুমকি দিতেছেন তাহারা সরকারি দলের লোক। যেন এই ক্ষেত্রে তাহাদের করণীয় কিছুই নাই। এই মনোভাব যতদিন থাকিবে, ততদিন তাহারা এমনভাবে হেনস্তার শিকার হইতেই থাকিবেন। এখন প্রকাশ্যে সরকারি কর্মকর্তাদের গায়ে হাত তুলিবারও দৃষ্টান্ত স্থাপিত হইতেছে। কথায় কথায় বদলি করিবার হুমকি তো সকল সময় দেওয়া হয়। ইহার বিরুদ্ধে রুখিয়া দাঁড়াইতে হইবে। নেতা-পাতিনেতাদের অন্যায়-অনিয়ম ও বাড়াবাড়ি বন্ধ করিতে হইবে। বাঁশের চাইতে কঞ্চি বড় হইয়া দেখা দিয়াছে। এই সকল কঞ্চি ছাঁটিয়া ফেলিতে হইবে।
যাহারা এই সকল অপকর্মের সহিত জড়িত, তাহাদের একটি বড় অংশ ক্ষমতাসীন দলে অতিথি পাখির মতো। তাহারা দুধের মাছি বা সুসময়ের বন্ধুর মতো দলে আসেন। আবার স্বার্থ ফুরাইয়া গেলে চলিয়াও যান। তাহাদের একক কোনো দল নাই। তাহারা সকল সময় সরকারি দল করেন। তাহাদের অনুপ্রবেশকারী হিসাবেও দেখা হয়। দলের নিবেদিত বা অনিবেদিত যাহাই হউক না কেন, তাহাতে কিছু যায়-আসে না। সরকারি অফিস চলিবে নিজস্ব নিয়ম ও আইনকানুনের মধ্যে। মনে রাখিতে হইবে, সরকারের অর্ধেক কাজ করে ক্ষমতাসীন দল, বাকি অর্ধেক কাজ করেন প্রশাসনিক কর্মকর্তা-কর্মচারীগণ। কিন্তু দিন শেষে সকল সফলতা ও ব্যর্থতার দায়ভাগ গিয়ে পড়ে সরকারপ্রধানের উপর। সুতরাং তাহাদের এখনই প্রতিরোধ করিতে না পারিলে আমাদের কাহারোই ভবিষ্যত্ নিশ্চিত নহে।