ধরিত্রীর সন্তান হিসেবে ধর্ম-বর্ণ-গোত্র ছাপিয়ে পৃথিবীর আলো-বাতাস-পানি তথা সব কিছুতেই সবার সমান সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার কথা থাকলেও বসুধার সন্তানরা সেখানে জটিল সব বিভাজন সৃষ্টি করেছে; কিছুটা অবচেতন মনে আর অধিকাংশ সুকৌশলে। আত্মকেন্দ্রিক চিন্তার বশবর্তীতে সংঘাত, হানাহানি, মারামারি যুদ্ধ সবই করছে এরা সগৌরবে। পেশিশক্তি, অর্থ, বৈভব আর অস্ত্রের ঝনঝনানিতে প্রতিষ্ঠিত করেছে এক ‘সভ্য’ ত্রাসের সভ্যতা। এসবে আলোচিত সমালোচিত হয়ে এখন নতুন অস্ত্র হিসেবে যুক্ত করেছে ধর্ম-বর্ণ-গোত্রকে। ধনে-মানে-আভিজাত্যে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব জাহির করার নিমিত্তে তথাকথিত সভ্য সমাজে বিভিন্ন বর্ণ-গোত্রের উদ্ভব হয়। সমাজের রন্ধ্রে ঢুকে পড়া এই বিভাজন ক্রমান্বয়ে বৈষম্য তৈরি করে।
নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চের নির্মমতার দগদগে ঘা এখনো মানুষের হূদয় থেকে শুকায়নি। সেই বীভত্সতা ভোলার আগেই গত ৬ জুন কানাডায় ট্রাক উঠিয়ে দিয়ে একটি মুসলিম পরিবারের চার সদস্যকে হত্যা করা হয়। কট্টর ডানপন্থি বর্ণবাদী ২০ বছর বয়সি কানাডিয়ান তরুণ নাথালিয়ান ভেল্টম্যান মুসলিমবিদ্বেষ তথা হেট ক্রাইম থেকে এই জঘন্য কাজটি করেন। একই অনুভূতি থেকে এর আগে ২০১৭ সালে কুইবেক শহরের মসজিদে ছয় জনকে হত্যা করা হয়েছিল। শুধু এই দুটো ঘটনাই নয়, ন্যাশনাল কাউন্সিল অব কানাডিয়ান মুসলিম বলছে, কানাডায় ২০১৩ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত অন্তত ৩০০টি মুসলিমবিদ্বেষী হেটক্রাইমের ঘটনা ঘটেছে। এই মুসলিমবিদ্বেষ তথা হেটক্রাইম একটি চরম বর্ণবাদী আচরণ। রেসিজম বা বর্ণবাদ সেই দৃষ্টিভঙ্গি, চর্চা ও ক্রিয়াকলাপ, যেখানে বিশ্বাস করা হয় যে মানুষ বৈজ্ঞানিকভাবেই অনেকগুলো গোষ্ঠীতে বিভক্ত এবং একই সঙ্গে বিশ্বাস করা হয় কোনো কোনো গোষ্ঠী অন্য গোষ্ঠীর চেয়ে নির্দিষ্ট কিছু বৈশিষ্ট্যের জন্য উঁচু অথবা নিচু; কিংবা তার ওপর কর্তৃত্ব করার অধিকারী; অথবা বেশি যোগ্য কিংবা অযোগ্য।
বর্ণবাদের এই বিষফোড়া সব দেশ-জাতির মধ্যেই বিদ্যমান। তবে সবাইকে ছাড়িয়ে আমেরিকা বেশি আলোচনায় থাকে। আপাতদৃষ্টিতে এখানে এই বিদ্বেষ প্রকট। আমেরিকায় শ্বেতাঙ্গদের কাছে কৃষ্ণাঙ্গরা বরাবরই অবহেলিত আর উপেক্ষিত। দিনের পর দিন, বছরের পর বছর, শতাব্দীর পর শতাব্দী শুধু চামড়ার রঙের জন্য সাদাদের নোংরা কটূক্তি শুনে এসেছে তারা যুক্তরাষ্ট্রে। ব্ল্যাক, নিগ্রো, স্লেভ শব্দগুলো যেন কালো মানুষদের ডাকনাম। শ্বেতাঙ্গদের কাছে কালো মানুষ মানেই নোংরা, গরিব, শয়তান এবং হিংস্র। জর্জ ফ্লয়েডের মৃত্যুর পর বর্ণবৈষম্য অবসানের যতটা প্রত্যাশা ছিল তা পূরণ হচ্ছে না। বরং আমেরিকার সামরিক বাহিনীতে এই বিদ্বেষ যেন আরো বৃদ্ধি পাচ্ছে। সম্প্রতি বার্তা সংস্থা এপির এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, সামরিক বাহিনীতে ৭০ শতাংশ শ্বেতাঙ্গ। এরা অশ্বেতাঙ্গ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের স্যালুট দিতেও অস্বীকৃতি জানান। দিনের পর দিন আটকে রাখা হয় অশ্বেতাঙ্গদের পদোন্নতি। অশ্বেতাঙ্গ নারীদের উদ্দেশ্য করে চলে অশালীন কৌতুক, শিকার হতে হয় যৌন হয়রানির।
ব্ল্যাক লাইভ ম্যাটারস আমেরিকায় শুরু হলেও বর্ণবাদের ছোবল থেকে মুক্ত নয় অস্ট্রেলিয়া, চীন, ব্রিটেন, কানাডা, নিউজিল্যান্ড এমনকি ব্রিটেনেও। অনেকে দাবি করে, ব্রিটেনে বর্ণবাদ অনেকটা পরিকল্পিত ও প্রাতিষ্ঠানিক। দেশটির শিক্ষা, স্বাস্থ্য, চাকরিসহ নানা ক্ষেত্রে বর্ণবাদ বেশ প্রকট। এতই প্রকট যে ব্রিটিশ রাজপরিবারের সদস্যও বর্ণবাদের শিকার হয়েছেন। সিবিএস টেলিভিশনকে দেওয়া এক সাক্ষাত্কারে স্বয়ং ব্রিটিশ রাজবধূ মেগান মার্কেল রাজপরিবারের বর্ণবাদী আচরণ সম্পর্কে মুখ খুলেছেন। তার অনাগত সন্তানের ত্বকের রং কেমন হবে কিংবা ত্বকের রঙের কারণে তার সন্তান আর্চিকে রাজকীয় খেতাব দেওয়া হবে না, এমন কথাও রাজপরিবারের সদস্যদের মুখ থেকে উঠে এসেছে। ইসমাইল রোকেয়া নামের একজন হিজাবধারী মুসলিম নারী প্রথম বারের মতো মেয়র নির্বাচিত হওয়া সত্ত্বেও ইসলামবিদ্বেষী ও বর্ণবাদী নীতির কারণে লেবার পার্টি থেকে পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছে। কৃষ্ণাঙ্গ নাগরিকরা প্রায়ই পুলিশের হাতে নির্যাতিত ও অপদস্থ হয়ে থাকেন। করোনা মহামারির সংকটের মধ্যেই চীনে বর্ণবাদী আচরণের শিকার হয়েছেন দেশটিতে অবস্থান করা আফ্রিকানরা। আরব বিশ্বেও অনেক ক্ষেত্রে এখনো চামড়ার রঙের ওপর মানুষের মর্যাদা নির্ভর করে। যেমন মিশরে কালো চামড়ার নুবিয়ানদের দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক বলে মনে করা হয়। পাকিস্তান, ভারত, মিয়ানমার, বাংলাদেশও বর্ণবাদের উর্বর ভূমি।
বর্ণবাদের ছোবল থেকে রক্ষা পাননি ফুটবল ও ক্রিকেট খেলোয়াড়রাও। রিয়াল মাদ্রিদের স্প্যানিশ ফরোয়ার্ড ইসকোকে নিয়ে এক সাংবাদিক মন্তব্য করেছেন, ‘এই ছোট এবং বিশ্রী জিহাদি দাড়ির ছেলেটা রিয়ালে খেলার যোগ্যতা রাখে না।’ বর্ণবাদী বিষবাক্যে বিদ্ধ হয়েছেন ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের ইংলিশ ফরোয়ার্ড মার্কাস রাশফোর্ডও। বর্ণবাদের অভিযোগ তুলেছেন ক্রিকেট তারকা ক্রিস গেইলও। অস্ট্রেলিয়া-ভারত সিরিজেও ভারতীয় ক্রিকেটাররা বর্ণবাদী আক্রমণের শিকার হয়েছেন।
বর্ণবাদ, বৈষম্যের এই আগ্রাসন এতটাই প্রতিষ্ঠিত যে মার্টিন লুথার কিং, নেলসন ম্যান্ডেলাকে আমৃত্যু লড়তে হয়েছে এর বিরুদ্ধে। এমনকি জ্ঞান-বিজ্ঞান ও সভ্যতার অভূতপূর্ব অগ্রগতিও রেসিজম বা বর্ণবাদ কমাতে পারেনি। বর্ণবাদের বিরুদ্ধে এখনই সোচ্চার না হলে অদূর ভবিষ্যতে এটি টেরোরিজম বা জঙ্গি হামলার মতো ভয়ংকর বিষয় হয়ে দাঁড়াবে।
n লেখক :শিক্ষার্থী, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া