g সাদিকুল নিয়োগী পন্নী
তুমি যদি এক হালি সিদ্ধ ডিম খোসাসহ খেতে পার তাহলে পাঁচ শ টাকা পাবে। না পারলে সমান টাকা ফেরত দিতে হবে। আকরামের এমন বাজিতে সহজেই রাজি হয়ে গেল টিটু।
আকরাম বলল, ‘শর্ত হলো ডিমের খোসা খাওয়ার পর ৫ মিনিট কোনো প্রকার পানি খেতে পারবে না।’
‘ঠিক আছে। তবে প্রথমে ডিমের খোসা ছাড়িয়ে ডিমগুলো খাব। তারপর খোসাগুলো আলাদাভাবে খাব।’
আকরাম বলল, ‘এতে কোনো সমস্যা নেই। তবে কোনো প্রকার বমি করলে হবে না। খাওয়ার পর স্বাভাবিক থাকতে হবে।’
খান মঞ্জিলের একটি মেসে দুপুরের রান্নার জন্য রহিমা খালা চারটি মুরগির ডিম সিদ্ধ করেছিলেন। মেস মেম্বার এই দুইজন ছাড়াও মিশুক ও আসাদ ভাই রয়েছেন। কারও আপত্তি না থাকায় বাজি চূড়ান্ত হলো।
মিশুক বলল, ‘আমরা বাজির টাকা দিয়ে দুপুরে বাইরে খাব। ডিমের ওপর আমার কোনো দাবি নাই।’
‘অনেকদিন বিরিয়ানি খাই না। বাজির টাকায় খাওয়াটা জমজমাট হবে। ডিম কেন মুরগির ওপরও আমার কোনো দাবি নাই,’ বললেন আসাদ ভাই।
‘তাহলে শুরু করলাম,’ বলেই টিটু চোখের পলকে ডিমের খোসাগুলা আলাদা করে একটা প্লেটে রাখল। তারপর একে একে চারটি ডিম খেল। এই দৃশ্য দেখে আকরাম বলল, ‘ডিম তো সবাই খেতে পারে। এতে বাহাদুরির কিছু নাই। খোসা খাওয়া শুরু কর।’
‘তুমি টাকা রেডি কর আকরাম। বাজিতে হারার লোক আমি না,’ বলেই টিটু ডিমের খোসাগুলো হাত দিয়ে গুঁড়া করল। প্রথম দফায় সে অর্ধেক খোসা মুখে দিল।
আসাদ ভাই বললেন, ‘ভয় পাবেন না। আমরা আছি।’
টিটু চোখ বন্ধ করে খোসগুলো চিবিয়ে গিলতে গিয়ে একটু কাশি দিল।
তারপর একটা বড় ঢেকুর দিয়ে দ্বিতীয় দফায় বাকিগুলো মুখে দিল। এবার গিলতে তার বেশ কষ্ট হলো। চোখ দিয়ে পানি বের হয়ে গেল। আর কাশি ও শ্বাস-প্রশ্বাসের শব্দে মনে হচ্ছে এই বুঝি প্রাণ গেল।
আকরাম একগ্লাস পানি এগিয়ে দিয়ে বলল, ‘তুমি হেরে গেছ। নাও পানি খাও। আর টাকাটা দ্রুত দাও।’
টিটুর চোখ-মুখ লাল হয়ে গেল। চোখ দিয়ে পানি ঝরলেও সে মুখে কোনো পানি নিল না। তারপর কয়েকটা ঢেঁকুর দিয়ে চোখ বন্ধ করে মাথা নিচু করে বসে রইল। এভাবে কোনোক্রমে পাঁচ মিনিট পার হতেই টিটু ঢকঢক করে একগ্লাস পানি খেল।
তারপর একটু দম নিয়ে টিটু বলল, ‘আকরাম টাকা দাও। বাজি জেতা হয়ে গেছে।’
আসাদ ভাই বলল, ‘তাহলে আর দেরি কেন। দুপুর তো পার হয়ে যাচ্ছে।’
মিশুক বলল, ‘বিরিয়ানির জন্য পেট কামড়াচ্ছে। চলেন এখনি।’
আকরাম গোমড়া মুখে টিটুর হাতে পাঁচ শ টাকার একটা নোট এগিয়ে দিল।
দুই.
আসাদ ভাইয়ের নেতৃত্বে টিটু, মিশুক ও আকরাম রায়সাহেবের বাজারের একটা বিরিয়ানির দোকানে ঢুকল। চার প্লেট কোয়ার্টার বিরিয়ানিতে বিল হলো চার শ আশি টাকা। বাকি বিশ টাকা দিয়ে চারটা মিষ্টি পান চিবাতে চিবাতে চারজন খান মঞ্জিলের দিকে হাঁটা শুরু করল।
টিপু সুলতান রোডে এসে টিটু বলল, ‘আমার পেটের ভেতর কেমন করছে। কিছুটা ব্যথাও অনুভব করছি।’
আকরাম খুশিতে বলল, ‘বেশ হয়েছে। আমার পাঁশচ টাকা হাতিয়ে নিয়েছ। এবার ঠেলা সামলাও।’
মিশুক বলল, ‘ডিমের খোসায় শুনেছি পাকস্থলি ফুটা হয়ে যায়। টিটুকে ডাক্তারের কাছে নেওয়া প্রয়োজন।’
মিশুকের কথায় টিটুর মনে ভয় ঢুকে গেল। বাকিদের মনেও আতঙ্ক কাজ করছে। সিনিয়র হিসেবে আসাদ ভাই সবাইকে নিয়ে আবার রওনা দিলেন রায়সাহেবের বাজারের দিকে।
তিন.
‘আপনাদের মধ্যে রোগী কে?’ জানতে চাইলেন ডাক্তারের অ্যাসিস্টেন্ট।
টিটু বলল, ‘জি আমি।’
‘স্যারের সঙ্গে প্রথম সাক্ষাতে এক হাজার টাকা, পরবর্তী সাক্ষাতে পাঁচ শ জানেন তো?’
টিটু মাথা ঝাঁকাল।
‘তাহলে এক হাজার টাকা দিয়ে অপেক্ষা করেন। স্যার বেল বাজালেই রুমে ঢুকিয়ে দিব। বাকিদের বাইরে দাঁড়াতে হবে।’
টিটু মানিব্যাগের চিপায় লুকিয়ে রাখা হাজার টাকার নোট ডাক্তারের অ্যাসিস্টেন্টের হাতে দিল। মিনিট দশেক পর বেল বাজল। ততক্ষণে টিটুর পেটের ব্যথা চলে গেছে। কিন্তু মনের ভয়টা দূর করতে চেম্বারে ঢুকল।
ডাক্তার তাকে ইশারায় বসতে বললেন।
‘কী সমস্যা আপনার?’ ডাক্তার জানতে চাইলেন।
‘স্যার, ডিম খেয়েছি।’
‘ভালো করেছেন।’
‘স্যার, চারটা একসাথে খেয়েছি।’
‘এই বয়সে চার-পাঁচটা ব্যাপার না।’
‘স্যার, খোসাসহ খেয়েছি।’
ডাক্তার এবার চোখ বড় করে তাকিয়ে বললেন, ‘মাথায় কোনো গণ্ডগোল নেই তো আপনার?’
‘জি না।’
‘তাহলে পাগলের মতো আজগুবি কথা বলছেন কেন?’
‘আপনার মনে হয় বিশ্বাস হচ্ছে না ব্যাপারটা। আমার দুই বন্ধু ও এক বড় ভাই সাক্ষী আছেন।’
‘তারা কোথায়?’
‘চেম্বারের সামনেই আছেন। অ্যাসিস্টেন্ট ঢুকতে দেয়নি।’
ডাক্তার বেল বাজালেন। অ্যাসিস্টেন্ট দরজা খুলতেই তিনি বললেন, ‘এই রোগীর সাথের সবাইকে পাঠিয়ে দাও।’
টিটু ডাক্তারের মুখোমুখি চেয়ারে বসা। আসাদ ভাই, মিশুক ও আকরাম ডাক্তারের সামনাসামনি দাঁড়াল।
ডাক্তার বললেন, ‘আপনারাও কি বলতে চান—উনি খোসাসহ ডিম খেয়েছেন?’
আসাদ ভাই বললেন, ‘জি স্যার। বাজিতে জেতার জন্য টিটু সব পারে।’
আকরাম, মিশুকও সুর মেলাল।
ডাক্তার বললেন, ‘প্রথম ভেবেছিলাম রোগীর মাথায় সমস্যা। এখন তো দেখছি আপনাদেরও একই অবস্থা।’
টিটুসহ সবাই একসঙ্গে বলল, ‘স্যার, আমরা কেউ পাগল না।’
‘কোনো পাগলই নিজেকে পাগল হিসেবে মানতে রাজি নয়,’ বলেই ডাক্তার আবার বেল বাজালেন।
অ্যাসিস্টেন্ট দ্রুত রুমে ঢুকল।
ডাক্তার বললেন, ‘এই চারজনকে পাবনা পাঠানোর ব্যবস্থা করো। কেউ যেন পালাতে না পারে।’
অ্যাসিস্টেন্ট দরজা লাগিয়ে সবাইকে আটকাতে চাইলেন।
আসাদ ভাই শরীরের সমস্ত শক্তি দিয়ে অ্যাসিস্টেন্টকে সজোরে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিলেন।
তারপর চারজন একসঙ্গে ভো-দৌড়। হাঁপাতে হাঁপাতে থামল খান মঞ্জিলের নিচে এসে। তারপর সবাই প্রতিজ্ঞা করল জীবনে আর কেউ বাজি ধরবে না। g