প্রবীণদের অধিকার প্রতিষ্ঠিত হোক

দি ইন্টারন্যাশনাল নেটওয়ার্ক ফর দ্য প্রিভেনশন অব এল্ডার এবিউজ (INFEA) ২০০৬ সালের ১৫ জুন প্রথম ‘আন্তর্জাতিক প্রবীণ নির্যাতন প্রতিরোধ সচেতনতা দিবস—World Elder Abuse Awareness Day (WEAAD) প্রতিষ্ঠা করে এবং ২০১১ সালে জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে আন্তর্জাতিকভাবে প্রবীণ নির্যাতন প্রতিরোধ সচেতনতা দিবস হিসেবে ঘোষণা করে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, প্রতি ছয় জনের মধ্যে এক জন ষাটোর্ধ্ব অর্থাত্  প্রায়  ১৪১ মিলিয়ন (১ কোটি ৪১ লক্ষ) প্রবীণ বিশ্বব্যাপী  নির্যাতন ভোগ করে থাকে। ২০০২ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) প্রবীণ নির্যাতনের একটি সংজ্ঞা দিয়েছে যা হচ্ছে, ‘একটি বা কোনো পুনরাবৃত্ত অথবা কোনো সঠিক পদক্ষেপের অভাবে যে কোনো সম্পর্কের মধ্যে যেখানে প্রত্যাশা ও আস্থা রয়েছে, সেই সম্পর্ক থেকে প্রবীণদের কোনো ক্ষতি বা দুঃখকষ্ট হলে তা প্রবীণ নির্যাতন হিসেবে গণ্য হবে।’

সাধারণভাবে প্রবীণ নির্যাতনের ধারণাটিকে এভাবে উল্লেখ করা যায়, জেনে বা উদ্দেশ্যমূলক ও পরিকল্পিতভাবে কোনো প্রবীণকে মৌখিক, শারীরিক, মানসিক, আর্থিক, সাংস্কৃতিক এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে যৌন নির্যাতনের মতো ঘটনাগুলো পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের দ্বারা নির্যাতিত ও হয়রানি হওয়া। সত্যিকার অর্থে প্রবীণের প্রাত্যহিক জীবনে তাদের প্রতি অবজ্ঞা, অবহেলা ও হয়রানি তাদের জীবনে বয়ে আনে মারাত্মক ক্ষতি ও মর্মবেদনা। বিভিন্ন দৃষ্টান্ত থেকে প্রতীয়মান হয় যে, পরিবার ও সমাজে প্রবীণরা নানাভাবে নির্যাতিত হন, মাত্রাভেদে তাদের প্রতি এই নির্যাতনের গল্প ও ঘটনাগুলো খুবই মর্মস্পর্শী ও হূদয়বিদারক।

২০২০ সালে করোনা পরিস্থিতিতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের পরিসংখ্যান থেকে জানা যায়, প্রবীণ ব্যক্তিরা বয়সের কারণে সর্বাধিক মৃত্যুঝুঁকিতে রয়েছেন। করোনা আক্রান্ত প্রবীণদের স্বাস্থ্যসেবা প্রদানে অপারগতা, বিরূপ আচরণ ও অনীহার ফলে প্রবীণদের অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যু, মাস্ক না পরাতে শারীরিক নির্যাতন, করোনা আক্রান্ত বাবা-মাকে একাকী, এমনকি জঙ্গলে ফেলে রাখার মতো ঘটনাগুলো গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে জনগণের সামনে উঠে এসেছে। এ থেকে সহজেই কোভিডের কারণে এই নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া কীভাবে বাংলাদেশে প্রবীণদের প্রতি অবহেলা ও বৈষম্য বাড়িয়েছে, তার একটি সুস্পষ্ট ধারণা পাওয়া যায়।

প্রকৃতপক্ষে প্রবীণ নির্যাতন সমস্যাটি উন্নত, উন্নয়নশীল দেশ এমনকি বিশ্বব্যপী এখনো প্রতিপাদ্য হয়ে ওঠেনি। বৈশ্বিক মহামারির কারণে ২০২০ সালে আন্তর্জাতিক প্রবীণ নির্যাতন প্রতিরোধ সচেতনতা দিবসের প্রতিপাদ্যকে নিয়ে তেমন সাড়া মেলেনি, শুধু কোভিডের প্রভাবে প্রবীণরা কীভাবে উপেক্ষিত এবং কোন ধরনের হয়রানির শিকার হয়েছেন এবং এখনোও হচ্ছেন—তার একটি বিশ্লেষণ ও উপস্থাপনা তৈরি হয়েছে। সহিংসতা ও নির্যাতন থেকে ক্ষতিগ্রস্ত প্রবীণদের ন্যায়বিচার পাওয়া বা অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে শাস্তিযোগ্য বিধান কী হতে পারে, তার কোনো কাঠমো তৈরি হয়নি। ২০২১ সালে UN ঘোষিত দিবসের প্রতিপাদ্য হচ্ছে ‘ন্যায়বিচারে প্রবীণদের অধিকার প্রতিষ্ঠা—অ্যাকসেস টু জাসটিস (Access to Justice)’। এটি হচ্ছে মৌলিক অধিকার, আইনের বিধি, সুরক্ষা ও অন্যান্য মানবাধিকার প্রচলনের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। সহিংসতার বিচার ও প্রতিকার চাওয়া-পাওয়ার ক্ষেত্রে সম-অধিকার ও ন্যায্যতা অর্জনে এটি বেষ্টনী হিসেবে কাজ করে। আইনের জন্য প্রবীণরা সাহায্য প্রার্থনা করলেও জাতীয় আইনসমূহ অথবা আইন প্রক্রিয়াগুলো প্রয়োজনানুসারে কোনো দায়িত্ব পালন করে না।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে পরিবারগুলো যৌথ হলেও অভাব ও পর্যাপ্ত অর্থসম্পদ না থাকার কারণে প্রবীণ বাবা-মায়ের ন্যূনতম ভরণপোষণ করতে না-পারায় প্রবীণ মানুষটি একটি বোঝা হিসেবে প্রতিনিয়ত অবহেলা ও অমানবিক নির্যাতনের শিকার হন। এমতাবস্থায় অনায়াসে বলা যায়, প্রবীণদের ন্যায্য অধিকার ও বিচার পাওয়ার ক্ষেত্রে বড় চ্যালেঞ্জ হলো দারিদ্র্য। পক্ষান্তরে সচ্ছল ও ধনী পরিবারের প্রবীণরা তাদের সন্তানদের সামাজিক উচ্চ পদমর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করতে বিদেশে পাঠিয়ে একাকী হয়ে পড়েন। জীবনের শেষ সময়ে সন্তানদের কাছে রাখা তো দূরে থাক, পেশাগত জীবনের দোহাই দিয়ে তারা মৃত্যুকালেও প্রবীণ মানুষটির সান্নিধ্য পেতে আগ্রহী হয় না। শুধু তা-ই নয়, ধনী শ্রেণির অনেক প্রবীণ আছেন, যারা তাদের প্রতি নির্যাতনের ঘটনাগুলোকে পরিবারের মান-সম্মান বজায় রাখতে বাইরে প্রকাশ করতে চান না এবং করেনও না। সামাজিক দৃষ্টিকোণ থেকে এই নীরব নির্যাতন থেকে তারা রেহাই পান না। এর ফলে পরবর্তী প্রজন্মও একই ধরনের নেতিবাচক আচরণে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে এবং সৃষ্টি হয় অপসংস্কৃতি আর  মূল্যবোধের অবক্ষয়। এই অশনিসংকেত থেকে উত্তরণ করতে নীরব নির্যাতনকে সহ্য না করে প্রবীণদের বেরিয়ে সবাক হতে হবে। তাই এবারের প্রতিপাদ্যের তাত্পর্য প্রবীণদের মানবাধিকার সুরক্ষার ক্ষেত্রে একটি যথোপযুক্ত স্লোগান, যা  প্রবীণদের ন্যায়বিচার পাওয়ার দাবিতে কথা বলার একটি দিন।

পরিশেষে বলা যায়, প্রবীণ নির্যাতন প্রতিরোধ সচেতনতার জন্য রাষ্ট্র, পরিবার ও সমাজ—সবার দায়িত্ব রয়েছে, তবে প্রবীণদের দেখভাল করার প্রধান দায়িত্ব হচ্ছে পরিবারের। তাই প্রবীণদের সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিতের বিষয়টি পরিবার থেকেই শুরু করতে হবে। এজন্য সন্তানদের সেই মূল্যবোধ দিয়ে গড়ে তুলতে হবে এবং প্রতিকারের লক্ষ্যে গবেষণা, শিক্ষা কার্যক্রমে বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত এবং আইন প্রণয়ন করে তা গণমাধ্যমে তুলে নীতিনির্ধারকদের প্রভাবিত করতে হবে। বর্তমানে এটিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ জনস্বাস্থ্য এবং সামাজিক সমস্যা হিসেবে বিবেচনা করার সময় এসেছে।

n লেখক : অ্যাসিসট্যান্ট জেনারেল ম্যানেজার, রিসোর্স ইন্টিগ্রেশন সেন্টার (রিক)