দেশের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের অন্যতম প্রধান মাধ্যম রেমিট্যান্স। তবে এখনো পর্যন্ত অল্প কয়েকটি দেশ থেকেই রেমিট্যান্সের সিংহভাগ আসছে। আমাদের দেশের রেমিট্যান্স এখনো মধ্যপ্রাচ্য নির্ভর। এদিকে মধ্যপ্রাচ্যের বাইরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে প্রচুর রেমিট্যান্স আসছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসে এদেশ থেকে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ রেমিট্যান্স এসেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ তথ্যে এমন চিত্র পাওয়া গেছে।
করোনা মহামারির মধ্যেও রেমিট্যান্স পাঠানো অব্যাহত রেখেছেন প্রবাসী বাংলাদেশিরা। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের ১১ মাসে (জুলাই-মে) দেশে ২ হাজার ২৮৩ কোটি ৭০ লাখ ডলারের রেমিট্যান্স এসেছে। বাংলাদেশে মুদ্রায় যার পরিমাণ ১ লাখ ৯৪ হাজার ১১৪ কোটি টাকা। এর আগে কোনো অর্থবছরে এত পরিমাণ রেমিট্যান্স আসেনি দেশে। এর মধ্যে সিংহভাগ রেমিট্যান্স এসেছে পাঁচটি দেশ থেকে। গত ১১ মাসে মোট আহরিত রেমিট্যান্সের প্রায় ৬৩ শতাংশই পাঠিয়েছেন ঐ পাঁচ দেশের প্রবাসীরা। সৌদি আরব, যুক্তরাষ্ট্র, আরব আমিরাত, মালয়েশিয়া ও যুক্তরাজ্য—এ পাঁচ দেশ থেকে রেমিট্যান্স এসেছে ১ হাজার ৪৪৭ কোটি ৫৮ লাখ ডলার বা ৬৩ দশমিক ৩৮ শতাংশ।
আর প্রবাসীদের পাঠানোর শীর্ষে থাকা ১০ দেশ থেকে এসেছে ২ হাজার ১৯ কোটি ৮ লাখ ডলার, যা মোট রেমিট্যান্সের ৮৮ দশমিক ৪১ শতাংশ। রেমিট্যান্স পাঠানো শীর্ষ ১০টি দেশ হলো : সৌদি আরব, যুক্তরাষ্ট্র, আরব আমিরাত, মালয়েশিয়া, যুক্তরাজ্য, কুয়েত, ওমান, কাতার, ইতালি ও সিঙ্গাপুর।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যমতে, শুধু মধ্যপ্রাচ্যের পাঁচ দেশ (সৌদি আরব, আরব আমিরাত, কুয়েত, ওমান ও কাতার) থেকে এসেছে ১ হাজার ১৯৮ কোটি বা প্রায় ৫২ দশমিক ৪৬ শতাংশ। বিশ্বের ১৬৮ দেশে প্রায় ১ কোটি ৫০ লাখ বাংলাদেশি বসবাস করেন। বাংলাদেশের প্রবাসীদের সব চেয়ে বড় শ্রমবাজার সৌদি আরব। বিভিন্ন সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে ২২ লাখের মতো বাংলাদেশি অভিবাসী সৌদি আরবে কর্মরত আছেন। তথ্য বলছে, বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি রেমিট্যান্স আসে সৌদি আরব থেকে। চলতি অর্থবছরের ১১ মাসে দেশটি থেকে প্রবাসীরা রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন ৫২৭ কোটি ১৫ লাখ ডলার, যা মোট আহরিত রেমিট্যান্সের ২৩ শতাংশ। অর্থবছরের ১১ মাসে রেমিট্যান্স আহরণের দ্বিতীয় শীর্ষ স্থানে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। দেশটি থেকে রেমিট্যান্স এসেছে ৩১৬ কোটি ৭৭ লাখ ডলার।
তৃতীয় স্থানে রয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের আরেক দেশ সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই)। দেশটি থেকে রেমিট্যান্স এসেছে ২২৬ কোটি ডলার। চতুর্থ স্থানে থাকা মালয়েশিয়া থেকে রেমিট্যান্স এসেছে ১৯০ কোটি ডলার, ৫ম দেশ যুক্তরাজ্য থেকে রেমিট্যান্স এসেছে ১৮৭ কোটি ৯৮ লাখ ডলার। এছাড়া কুয়েত থেকে ১৭৩ কোটি ২২ লাখ ডলার, ওমান থেকে ১৪১ কোটি ৭১ লাখ ডলার, কাতার থেকে ১৩০ কোটি ডলার, ইতালি থেকে ৭৩ কোটি ৪১ লাখ ডলার এবং সিঙ্গাপুর থেকে রেমিট্যান্স এসেছে ৫৮ কোটি ১৩ লাখ ডলার।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যে দেখা গেছে, শীর্ষ রেমিট্যান্স প্রেরণকারী দেশগুলোর মধ্যে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। দীর্ঘদিন ধরে শীর্ষ দশে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান থাকলেও আগের অবস্থান আরো নিচে ছিল। রেমিট্যান্সের ওপর ২ শতাংশ ভর্তুকি দেওয়ার পর থেকে এদেশ থেকে রেমিট্যান্সের প্রবাহ বেড়ে গেছে। সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ২ শতাংশ ভর্তুকি দেওয়ার কারণে এদেশ থেকে রেমিট্যান্স বাড়তে পারে। আর অগ্রণী ব্যাংক রেমিট্যান্সের ওপর আরো ১ শতাংশ বেশি ভর্তুকি দিচ্ছে। অর্থাত্ কেউ যদি যুক্তরাষ্ট্র থেকে অগ্রণী ব্যাংকের মাধ্যমে বাংলাদেশে রেমিট্যান্স পাঠায় তাহলে সে ১০৩ ডলার পাচ্ছে। আবার এ অর্থ ব্যাংকিং চ্যানেলের বাইরে যুক্তরাষ্ট্র পাঠিয়ে একইভাবে আবার পাঠালে বাড়তি অর্থ পাওয়া যাচ্ছে। এভাবে একশ্রেণির অসাধু ব্যক্তি ভর্তুকি থেকে অর্থ উঠিয়ে নিচ্ছে বলে ধারণা করছেন তারা। অবশ্য এক্ষেত্রে অন্যান্য খরচ কতটুকু, সে বিষয়ে বিস্তারিত ধারণা তারা দিতে পারেননি।
অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যের চেয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে আমাদের দেশে ব্যবসা বেশি। এক্সপোর্টের ক্ষেত্রেও অনিয়ম হতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করেছেন। তারা বলছেন, কেউ যদি ১০০ ডলারের এক্সপোর্ট করে ৩০ ডলার রেমিট করতে বলেন তাহলে ঐ রপ্তানিকারক ৩০ ডলারের ওপর ভর্তুকি পাচ্ছেন। এভাবে রপ্তানি থেকেও রেমিট্যান্স বাড়তে পারে বলে তাদের আশঙ্কা।
এ বিষয়ে বিশ্বব্যাংকের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন, বলেন, সাম্প্রতিক হুন্ডি অনেক কমে গেছে। ভিসা-বাণিজ্য নেই বললেই চলে। মধ্যপ্রাচ্যে অর্থনৈতিক লকডাউনে ব্যাপক প্রভাব ফেলেছে। এসব কারণে আগের প্রান্তিকের চেয়ে বছরের শেষ প্রান্তিকে রেমিট্যান্স কমতে পারে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে রেমিট্যান্স বাড়ার বিষয়ে তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রে যারা থাকেন তাদের বেশির ভাগই স্থায়ী ভিত্তিতে থাকেন। তাদের আত্মীয়স্বজন এদেশে থাকে। ঐ স্বজনদের প্রয়োজন মাফিক তারা অর্থ পাঠান। করোনার সময়ে শহরের মানুষ বেশি আক্রান্ত হয়েছে। যাদের অনেকেই যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসীর আত্মীয়। আবার তাদের অনেক আত্মীয় স্বজনের চাকরি এ সময় চলে গেছে। ফলে তারা বেশি রেমিট্যান্স পাঠিয়ে থাকতে পারেন। অন্যদিকে বিশ্বব্যাপী ট্রাভেল কমে যাওয়ায় ব্যাগেজ রুলের আওতায় আমদানিও এসময় কমেছে। যারা এ ধরনের ব্যবসা করে তারা সাধারণত প্রবাসীদের কাছ থেকে অর্থ নিয়ে পণ্য কিনে আনেন এবং দেশে এসে প্রবাসীদের আত্মীয়দের টাকা ফেরত দেন। ট্রাভেল বন্ধ হওয়ায় এ ধরনের ব্যবসা কমে গেছে।