জাতীয় গ্যাস গ্রিডের ‘বড় দুঃখ’ হয়ে উঠেছে বাখরাবাদ-সিদ্ধিরগঞ্জ পাইপলাইন। প্রায় ৬০ কিলোমিটার দীর্ঘ ৩০ ইঞ্চি ব্যাসের এই পাইপলাইনে সঞ্চালিত গ্যাসে নিয়মিত পাওয়া যাচ্ছে ধুলা-ময়লা ও লোহার কণা। এত ধুলা-ময়লার কারণে শিল্পকারখানা ও বাসাবাড়িতে গ্যাস সরবরাহ বিঘ্নিত হচ্ছে। জানা গেছে, লাইনটিতে গ্যাস সরবরাহ শুরুর এক বছরের মধ্যেই গ্যাসে ময়লা পায় কয়েকটি বিদ্যুেকন্দ্র ও শিল্পপ্রতিষ্ঠান। এরপর নিয়মিত বিরতিতে ময়লাযুক্ত গ্যাস সরবরাহের অভিযোগ পায় পেট্রোবাংলা। সম্প্রতি ময়লার সঙ্গে লৌহকণারও অস্তিত্ব পাওয়া গেছে। ৮৫০ কোটি টাকায় স্থাপিত পাইপলাইনটির ভেতরের অংশ ক্ষয়ে যাচ্ছে বলে মত দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
পেট্রোবাংলা সূত্র জানায়, কুমিল্লা-চট্টগ্রাম অঞ্চলের গ্যাসক্ষেত্র ও আমদানিকৃত গ্যাস গ্রাহক পর্যায়ে সরবরাহের লক্ষ্যে নির্মাণ করা হয় বাখরাবাদ-সিদ্ধিরগঞ্জ পাইপলাইন। লাইন পাইপের ৪১ কিলোমিটার এবং ১৯ কিলোমিটার যথাক্রমে সরবরাহ করে ভারতীয় কোম্পানি ওয়েলস্পান করপোরেশন ও জিন্দাল স পাইপ। ২০১৪ সালের নভেম্বরে মেঘনাঘাট, হরিপুর ও সিদ্ধিরগঞ্জ বিদ্যুেকন্দ্রগুলোতে এবং কয়েকটি শিল্পপ্রতিষ্ঠানে গ্যাস সরবরাহ শুরু হয়। এর এক বছর না পেরোতেই ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে তিতাস গ্যাস ও বিদ্যুেকন্দ্রগুলো গ্যাসের সঙ্গে ময়লা আসার বিষয়টি গ্যাস সঞ্চালনে নিয়োজিত একমাত্র কোম্পানি জিটিসিএলকে জানায়। এরপর ২০১৬, ২০১৮ ও ২০২০ সালেও একই অভিযোগ পাওয়া যায়।
জিটিসিএল সূত্র জানায়, বিভিন্ন সময়ে ভেন্টিং, পিগিংসহ নানা পরিষ্কার পদ্ধতিতে লাইনটি পরিচ্ছন্ন রাখার চেষ্টা করা হয়েছে। পাইপলাইনটির একটি বড় অংশ ২০১৬ সালে দুই বার পিগিং করার পর যথাক্রমে সাড়ে ৪৭ কেজি এবং ৩১ কেজি ৮০০ গ্রাম ময়লা পাওয়া যায়। ২০২০ সালের পিগিংয়ের সময় ১০ কেজির বেশি ময়লা পাওয়া যায়। চলতি ২০২১ সালের এপ্রিলে পাইপলাইনটির দুটি পয়েন্টে পরিষ্কার (পিগিং) করে যথাক্রমে প্রায় ৮ কেজি ও প্রায় ৬০ কেজি ময়লা পাওয়া যায়। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) বিভিন্ন সময়ে সংগ্রহকৃত এই ময়লা পরীক্ষা করে এগুলোতে সর্বনিম্ন ২০ দশমিক ৬১ শতাংশ লৌহকণা এবং সর্বোচ্চ ৬২ দশমিক ৬০ শতাংশ লৌহকণা পায়।
জিটিসিএলের এক শীর্ষ কর্মকর্তা জানান, পাইপলাইনটির অভ্যন্তরে বড় ধরনের ক্ষতি হয়েছে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। গত ফেব্রুয়ারিতে অন স্ট্রিম পিগিং (একধরনের পরিষ্কার কাজ) করার পর গ্যাস সরবরাহ পরিস্থিতি বেশ উন্নত হয়েছে। তবে অধিকতর পরিষ্কারকাজ ও পাইপের ভেতরের অবস্থা বুঝতে ইন্টেলিজেন্ট পিগিংয়ের (অত্যাধুনিক পদ্ধতিতে গ্যাসলাইন পরিষ্কার) সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে। এ কাজ সম্পন্ন করতে আগামী সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সময় লাগবে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, এই পাইপলাইন জাতীয় গ্যাস গ্রিডের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এর সমস্যার কারণে নারায়ণগঞ্জ, ঢাকা ও গাজীপুর এলাকায় স্থাপিত বিদ্যুেকন্দ্রগুলোতে এবং অনেকগুলো শিল্পপ্রতিষ্ঠানে গ্যাস সরবরাহে প্রায়ই বিঘ্ন ঘটে। গ্যাস সরবরাহ বন্ধ হয় বা কমে যায় বাসাবাড়িতে ও সিএনজি স্টেশনে। ভোগান্তিতে পড়েন গ্রাহকেরা।
এমন প্রেক্ষাপটে বাখরাবাদ-সিদ্ধিরগঞ্জ ৩০ ব্যাসের পাইপলাইনের মাধ্যমে সঞ্চালনকৃত গ্যাসের সঙ্গে অতিমাত্রায় ময়লা আসার কারণ চিহ্নিত করতে গত মার্চে একটি কমিটি গঠন করা হয়। সম্প্রতি ঐ কমিটির এক প্রতিবেদনে বলা হয়, পাইপলাইনটির গ্যাসের উত্স তিতাস, বাখরাবাদ, শ্রীকাইল ও বাগুড়া গ্যাসক্ষেত্র। এছাড়া এ-বি ১ ও এ-বি ২ পাইপলাইন এবং আমদানিকৃত এলএনজিও এই পাইপলাইনে সঞ্চালিত হয়। গ্যাসক্ষেত্রগুলোর মজুত শেষ পর্যায়ে থাকায় সেগুলোতে উত্পাদিত গ্যাসের সঙ্গে বালু ও লৌহকণা বেশি পরিমাণে থাকে। এগুলো গ্যাসের সঙ্গে মিশ্রিত অবস্থাতেই পাইপলাইনে প্রবাহিত হচ্ছে বলে ধারণা করা যায়। পাইপলাইনে গ্যাস দেওয়ার আগে ঠিকভাবে ফিল্টারিং হচ্ছে না। দ্রুত চাপগতির গ্যাসের সঙ্গে মিশে থাকা বালু ও লৌহকণা পাইপলাইনের ভেতরের অংশে আঘাত করে। এতে করে পাইপেরও ক্ষতি হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট গ্যাস কম্প্রেসর স্টেশন এবং মিটারি স্টেশন ও আরএমএসগুলোতে ফিল্টার কার্টিজ ব্যবহারসহ কয়েকটি স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি সুপারিশ করা হয়েছে।