ভবন-অবকাঠামো নির্মাণে একটি স্থাপত্য প্রকৌশল পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের বিতর্কিত কর্ণধারের বিরুদ্ধে বেশুমার অভিযোগ ও দুর্নীতি প্রমাণিত হওয়ার পরও একের পর এক সরকারি-বেসরকারি গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প বাগিয়ে নিচ্ছেন তিনি।
কয়েক ডজন ভবন-অবকাঠামোর স্থাপত্য নকশাসহ নির্মাণ প্রক্রিয়ার কাজ অসমাপ্ত রেখে সংশ্লিষ্টদের বিপুল ক্ষতি ও অনিশ্চয়তার মুখে ফেলে সরকারের বড় বড় প্রকল্পের দিকে থাবা বিস্তার করে চলেছেন এই স্থপতি।
জানা গেছে, এই স্থপতির সমুদয় অপকর্ম ও নতুন কার্যাদেশ প্রাপ্তির ক্ষেত্রে মুখ্য ভূমিকা পালন করছেন সরকারের প্রবল শক্তিধর এক আমলা নেতা। সর্বশেষ ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালকে ৫ হাজার শয্যায় উন্নীতকরণের প্রায় ২৪ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে যে সর্ববৃহৎ প্রকল্প গ্রহণ করেছেন প্রধানমন্ত্রী, সেই প্রকল্পের দিকে শ্যেনদৃষ্টি পড়েছে বিতর্কিত এই স্থপতির। তিনি ছলেবলে কৌশলে আমলা নেতার সহায়তায় সাধারণ মানুষের সর্বাধুনিক চিকিৎসাসেবার সুযোগ-সুবিধা সংবলিত হাসপাতালটির কাজ হাতিয়ে নিতে তৎপর।
ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল। ছবি: সংগৃহীত
দেশের প্রথিতযশা ও বিপুল অভিজ্ঞতাসম্পন্ন স্থাপত্য প্রকৌশল পরামর্শক প্রতিষ্ঠানগুলোকে অপাঙক্তেয় করে দিয়ে বিতর্কিত, প্রকল্প লন্ডভন্ডকারী ও প্রশ্নবিদ্ধ এই স্থপতিকে কার্যাদেশ পাইয়ে দেওয়ার জন্য সেই আমলা নেতা চতুর্মুখী তদবির ও দেনদরবার চালাচ্ছেন বলে জানা গেছে।
প্রতিটি প্রকল্পকাজে প্রশ্নবিদ্ধ এই স্থপতির বিরুদ্ধে গত মার্চ মাসে সরাসরি দুর্নীতি ও রাষ্ট্রীয় অর্থ লুটপাটের প্রমাণ পাওয়া যায় রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের (বেরোবি) দুটি ২০ (১০+১০) তলা ভবন ও অবকাঠামো নির্মাণকাজে। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের গঠিত শক্তিশালী তদন্ত কমিটি দীর্ঘ তদন্তের পর দুর্নীতিতে অভিযুক্ত বেরোবির সদ্য বিদায়ি ভাইস চ্যান্সেলর অধ্যাপক ড. নাজমুল আহসান কলিমুল্লাহ ও তার এই বহু বিতর্কিত স্থপতি ভাগনের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করেছে।
দুর্নীতির কারণে অধ্যাপক ড. নাজমুল আহসান কলিমুল্লাহকে ভিসি পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হলেও তার লুটপাটের শরিক বিতর্কিত সেই স্থপতির বিরুদ্ধে এখনো কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে তাকে ও তার ভাগনেকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করেন শিক্ষকরা।
প্রতীকী ছবি (সংগৃহীত)।
গত ৬ মার্চ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে দেখা যায়, একটি প্রকল্পের মোট তিনটি স্থাপনার নকশা নিজের ইচ্ছেমতো পরিবর্তন করে খরচ ১৩০ শতাংশ বাড়িয়েছেন। এখন প্রকল্পের কাজ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এই প্রকল্পের কাজ শুরু হয় চার বছর আগে। এই কাজের মধ্যে আছে ১০ তলা শেখ হাসিনা ছাত্রী হল, ড. ওয়াজেদ মিয়া গবেষণা প্রতিষ্ঠানের ১০ তলা ভবন, ‘স্বাধীনতা স্মারক’ নামে একটি শহিদ মিনার ও দুটি গবেষণাগার।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এই প্রকল্পের কাজ উদ্বোধন করেছিলেন। ২০১৮ সালে কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু তৎকালীন উপাচার্য ড. নাজমুল আহসান কলিমুল্লাহ একনেকের কোনো অনুমোদন ছাড়াই নকশা পরিবর্তন ও পরামর্শক বাদ দিয়ে তার এই বিতর্কিত ভাগনেকে অবৈধভাবে পরামর্শক নিয়োগ করে কাজ চালান।
ইউজিসির তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উপাচার্য নিজ ক্ষমতাবলে তার ভাগনেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিকল্পনা, উন্নয়ন ও ওয়ার্কস কমিটির সদস্য নিযুক্ত করেন। সদস্য হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার পরপরই তিনি ক্ষমতার অপব্যবহার শুরু করেন। এই স্থপতি ইচ্ছাকৃতভাবে যত্রতত্র ভবনের চৌহদ্দি বা এরিয়া বাড়াচ্ছেন এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য মারাত্মক বিপদ ডেকে আনছেন।
বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়। ছবি: সংগৃহীত
তদন্ত কমিটির এক সদস্য বলেন, এই স্থপতির পাগলামির কারণেই প্রায় ৫ হাজার ৬৬ বর্গমিটার অর্থাৎ ৫৪ হাজার বর্গফুট (ডিপিপি অনুমোদিত মোট এরিয়ার প্রায় ৩৩% শতাংশ) এরিয়া অযথা বৃদ্ধি পেয়েছে। যা কাম্য নয়।
ইউজিসির প্রতিবেদনে বলা হয়, ঐ স্থপতির কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের তিনটি অবকাঠামো নির্মাণে অবহেলা, দীর্ঘসূত্রতা ও অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে। এতে সরকারের আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি শিক্ষা গবেষণার সুযোগ সৃষ্টির পথে অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাবমূর্তিও চরমভাবে ভূলুণ্ঠিত হয়েছে। একই সঙ্গে তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে ভবনের নকশা পরিদর্শন করে যেভাবে ভবন নির্মাণ করা হচ্ছে, সেই প্রক্রিয়াকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
তদন্ত কমিটির অন্যতম সদস্য ফেরদৌস জামান জানান, মূল প্রকল্প ছিল ৯৭ কোটি ৫০ লাখ টাকার। তিনি বলেন, কলিমুল্লাহ এটার ব্যয় বাড়িয়ে করেছেন ২১৩ কোটি টাকা। তবে প্রধান পরিবর্তন হলো টয়লেটের সংখ্যা বাড়িয়ে দুই গুণ করা। এতে নির্মাণের পর ভবন ধসে পড়ার আশঙ্কা ছিল বলে মনে করে তদন্ত কমিটি।
ড. নাজমুল আহসান কলিমউল্লাহ। ছবি: সংগৃহীত
কলিমুল্লাহ ভিসির দায়িত্ব পেয়ে ঠিকাদার এবং আর্কিটেকচার ফার্ম পরিবর্তন করেন নিজের ভাগনেকে স্থপতি (আর্কিটেক্ট) নিয়োগ দিয়ে। পরোক্ষ ঠিকাদারও তার ভাগনে এই বিতর্কিত স্থপতি। প্রকল্পের ব্যয় বৃদ্ধির জন্য এমন কিছু বিষয় বাড়ানো হয়, যা বেমানান, এমনকি পুরো প্রকল্পকেই ক্ষতিগ্রস্ত করছে। প্রকল্পের ব্যয় বাড়িয়ে এমনটা করা হয়েছে, যা শুধু অপ্রয়োজনীয়-অস্বাভাবিকই নয়, নজিরবিহীনও বলা চলে। শেখ হাসিনা হলের নির্মাণব্যয় ৫১ দশমিক ৩৫ কোটি টাকা থেকে বাড়িয়ে এখন করা হচ্ছে ১০৭ কোটি টাকা।
অন্যদিকে ড. ওয়াজেদ রিসার্চ ইনস্টিটিউটের ব্যয় ২৬ দশমিক ৮৭ কোটি টাকা থেকে বাড়িয়ে ৬০ ধশমিক ৯৯ কোটি টাকা করা হয়েছে। এসব সংশোধনীতে ড. নাজমুল আহসান কলিমুল্লাহ এবং তার ভাগনে সেই প্রশ্নবিদ্ধ স্থপতি প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির মতামতকেও কোনো রকম তোয়াক্কা করেননি। সংশ্লিষ্ট মহল একে কলিমুল্লাহ ও তার ভাগনের লুটপাটতন্ত্র বলেই আখ্যায়িত করছেন। জানা গেছে, সদ্য বিদায়ি ভিসি ও তার বিতর্কিত স্থপতি ভাগনের বিরুদ্ধে নিয়মিত মামলার প্রস্তুতি চলছে।
প্রতীকী ছবি (সংগৃহীত)।
এদিকে কেবল বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশেষ উন্নয়ন প্রকল্পের সর্বনাশ করেই এই বিতর্কিত স্থপতি ক্ষান্ত নন। তার ঘনিষ্ঠরা বলছেন, মানুষকে মিথ্যা ও অতিরঞ্জিত তথ্য দিয়ে ভুলিয়ে ভালিয়ে কার্য হাসিলে পটু এই স্থপতির অতীত ইতিহাস ও প্রতিটি প্রকল্পকাজ নিয়ে ভোগান্তিতে পতিত হওয়ার অভিযোগ অন্তহীন। তিনি পানি উন্নয়ন বোর্ড, সরকারি-বেসরকারি ও ব্যক্তি মালিকানাধীন যেসব ইমারত প্রকল্পের কাজ হাতে নিয়েছেন প্রতিটিতেই তার গাফিলতি, অদক্ষতা, উদ্ভ্রান্তপনা, দীর্ঘসূত্রতা এবং দফায় দফায় ব্যয় বৃদ্ধির চাপে অতিষ্ঠ সংশ্লিষ্টরা।
এমনকি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ইমারত-অবকাঠামোর কাজেও তিনি প্রশ্নের মুখে। তার কারণে আটকে যাচ্ছে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি প্রকল্প। এসব কাজ আটকে থাকায় বাড়ছে প্রকল্প ব্যয়।
মূলত, প্রভাবশালী মহলের দোহাই দিয়ে চলেন তিনি। তবুও ঘুরে ফিরে কেন তাকে কাজ দেওয়া হচ্ছে তা নিয়ে সংশ্লিষ্টরা গভীর উদ্বেগ ও উত্কণ্ঠা প্রকাশ করেছেন। প্রায় ২৪ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের আধুনিক দৃষ্টিনন্দন স্থাপত্যকৌশল ও নির্মাণশৈলীতে রূপান্তর করার বিশাল কর্মযজ্ঞ তাকে দেওয়া হলে এর অনিশ্চিত ভবিষ্যতৎ নিয়ে আগেই শঙ্কিত ওয়াকিবহাল মহল।
ইত্তেফাক/এএএম