মমতার ক্ষমতার ডানা ছাঁটার যত পরিকল্পনা

পশ্চিমবঙ্গে গত ২ মে হাইভোল্টেজ নির্বাচনের ফলাফলে মমতা ব্যানার্জির তৃণমূল কংগ্রেস ২৯৪টি আসনের মধ্যে ২১৩টি আসনে জয়লাভ করেছিল। অন্যদিকে বিজেপি জিতেছিল মাত্র ৭৭টি আসনে। যদিও বিজেপির স্লোগান ছিল—‘অব কি বার দোশো পার! অর্থাত্ বিজেপি এবার কমপক্ষে ২০০ আসনে জয়লাভ করার জন্য কোমর বেঁধে নেমেছিল। কিন্তু বিজেপির স্লোগান বুমেরাং হয়ে যায়। পশ্চিমবঙ্গের জনগণ বরং আস্থা রাখলেন ‘নিজের মেয়ে’ মমতার ওপরেই। ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোদি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ, বিজেপির সর্বভারতীয় সভাপতি জেপি নাড্ডাসহ শীর্ষস্তরের প্রায় সব নেতানেত্রীর লাগাতার হাইভোল্টেজ প্রচার, মাটি কামড়ে পড়ে থাকার পরও মমতার তৃণমূলের জোড়া ফুল ফুটে উঠল সগৌরবে। কিন্তু মমতা নিজে পা কাটলেন পচা শামুকে। তারই দলত্যাগী শুভেন্দু অধিকারীর কাছে তিনি নন্দীগ্রামে হেরে গেলেন! তৃণমূলের এমন ভূমিধস বিজয়ের পরও নিজের পরাজয়টা যেন গলার কাঁটা হয়ে গেল মমতার জন্য।

সংবিধান অনুযায়ী মমতা ব্যানার্জি মুখ্যমন্ত্রী পদে শপথ নিতে পারলেন বটে, তবে ছয় মাসের মধ্যে তাকে উপনির্বাচনে জয়ী হয়ে আসতে হবে। আর এখানেই ঘুরপাক খাচ্ছে যত জটিলতা। প্রশ্ন উঠেছে উপনির্বাচন কবে হবে?  শিগিগরই হবে কি? পশ্চিমবঙ্গের দুটি বিধানসভা কেন্দ্রে সাধারণ নির্বাচনসহ মোট চারটি কেন্দ্রে উপনির্বাচন করা বাকি আছে। এর মধ্যে একটি উপনির্বাচনে ভবানীপুর বিধানসভা থেকে লড়বেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির। মমতা যে ভবানীপুর থেকে জিতবেন, তা নিয়ে তৃণমূলের কোনো সন্দেহ নেই। তবে সন্দেহ বিষয়টাই সন্দেহজনক। মমতা কি ঘুণাক্ষরে সন্দেহ করেছিলেন যে তিনি তার হাতে তৈরি শুভেন্দুর কাছে হেরে যাবেন? যদিও মমতার পরাজয় নিয়ে প্রশ্ন আছে। কিন্তু প্রশ্ন থাকলেও ফলাফলটাই শেষ কথা। তেমনি অনেকেই মনে করছেন, মমতাকে যে করেই হোক হারিয়ে দেওয়া হবে উপনির্বাচনে। মমতার ক্ষমতার ডানা ছাঁটাই করার জন্য মরিয়া দিল্লিতে ক্ষমতায় থাকা বিজেপি। এর জন্য সাংবিধানিক উপায়ে বিজেপি কী কী করতে পারে দেখা যাক।

প্রথম কথা হলো, উপনির্বাচন হলে সেখানে মমতাকে হারানোর জন্য যা যা করার দরকার, সেটা বিজেপি করবে—এ নিয়ে কারো মনে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু যদি উপনির্বাচনই অনির্দিষ্টকালের জন্য পিছিয়ে দেওয়া যায়! বিশেষ করে ন্যূনতম ছয় মাস যদি কোনো না কোনো ছুতোয় পিছিয়ে দেওয়া যায়, তাহলে মমতাকে মুখ্যমন্ত্রী থাকার পথ থেকে সরানো যাবে। উপনির্বাচনের দিন ঘোষণা করার দায়িত্ব ভারতের কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিশনের। তৃণমূল সম্প্রতি উদ্বেগ প্রকাশ করেছে যে, করোনা পরিস্থিতির অজুহাত দিয়ে অনির্দিষ্টকাল উপনির্বাচন ঝুলিয়ে রাখতে পারে নির্বাচন কমিশন। অথচ মমতাকে আগামী ৫ নভেম্বরের মধ্যে মুখ্যমন্ত্রীকে ভোটে জিতে বিধায়ক হওয়ার শর্তপূরণ করতেই হবে। ঐদিনই শেষ হচ্ছে মমতার ছয় মাসের মেয়াদ। প্রসঙ্গত উল্লেখ করা যেতে পারে যে, করোনা সংক্রমণের কারণে বিধানসভা উপনির্বাচন না হওয়ার নজির পশ্চিম বাংলায় রয়েছে। ২০১৯ সালের ৩১ অক্টোবর প্রয়াত হয়েছিলেন ফালাকাটার তৃণমূল বিধায়ক অনিল অধিকারী। কিন্তু করোনা সংক্রমণের কারণে সেখানে দেড় বছরেও ভোট হয়নি। সদ্য সমাপ্ত বিধানসভার ভোটে ঐ আসনে ভোট হলে বিধায়ক হয়েছেন বিজেপির একজন। এ কারণে অনেকেই মনে করছেন, ভারতে কোভিডের তৃতীয় ঢেউয়ের ‘অজুহাত’ দেখিয়ে বিধানসভার উপনির্বাচন ঝুলিয়ে রাখা হতে পারে। এমনিতেই পশ্চিমবঙ্গে বর্তমানে চলমান করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ের জন্য নির্বাচন কমিশনকে দায়ী করা হয়েছিল। বলা হয়েছিল, পশ্চিমবঙ্গে আট দফায় বিধানসভা ভোট করানোই গোটা রাজ্যে করোনা ছড়িয়ে পড়ার প্রধান কারণ। এখন নির্বাচন কমিশন যদি বলে, করোনা নির্মূল না-হওয়া পর্যন্ত পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা উপনির্বাচন হবে না—তখন কী হবে? পশ্চিমবঙ্গের পত্রপত্রিকাতেও বলা হচ্ছে যে, কমিশন চাইলে তো মনে করতেই পারে করোনার তৃতীয় ঢেউ প্রশমিত না হলে উপনির্বাচন করানো যাবে না। এদিকে ভারতে তৃতীয় ঢেউ আসার কথা আগামী অক্টোবরে। আর ভোট করাতে হবে নভেম্বরের প্রথমে। এখানেই পুরো পরিস্থিতির গন্ধটা বেশ সন্দেহজনক। এখন নির্বাচন কমিশন যদি করোনার কারণ দেখিয়ে উপনির্বাচন স্থগিত করে রাখে, তাহলে মুখ্যমন্ত্রীকে বিকল্প পথ খুঁজে নিয়ে প্রশাসন পরিচালনা করতে হবে। অনেকে অবশ্য মনে করছেন, উপনির্বাচন যদি নির্দিষ্ট সময়ে না-ও হয়, তাহলেও মমতা পদত্যাগ করে একদিন পরে আবার শপথ নিয়ে আরো ছয় মাস সময় পাবেন। তবে এখানেও জটিলতা আছে। ছয় মাসের মধ্যে উপনির্বাচন করা না সম্ভব হলে নতুন মুখ্যমন্ত্রী করতে হবে। কারণ, ভারতের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী জয়ললিতা ও পাঞ্জাবের একটি মামলার ক্ষেত্রে সুপ্রিম কোর্টের বক্তব্য ছিল, ছয় মাসের জন্য মুখ্যমন্ত্রী হলেন। তারপর বিধায়ক নির্বাচিত না হয়েই পদত্যাগ করে এক দিন পরেই আবার মুখ্যমন্ত্রী পদে শপথ নিলেন, এমন ঘটলে সংবিধানের ধারার যে আদর্শ, তা ব্যর্থ হয়। তাই সেটা করা যাবে না। শীর্ষ আদালত বলেছিল, মাত্র প্রথম ছয় মাসের জন্যই নির্বাচিত না হয়েও মন্ত্রী বা মুখ্যমন্ত্রী থাকা যাবে। মাত্র একবারই। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে বিধায়ক না হতে পারলে পদ এমনিতেই চলে যাবে। তখন অন্য কেউ ঐ পদে বসবেন।

মমতা ছাড়াও রাজ্য মন্ত্রিসভায় আরো দুজন সদস্য রয়েছেন, যাদের আবার জিতে এসে মন্ত্রী থাকতে হবে। তারা হলেন অর্থমন্ত্রী অমিত মিত্র ও কৃষিমন্ত্রী শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়। শোভনদেব ভবানীপুর বিধানসভা থেকে জিতেও মুখ্যমন্ত্রীর জন্য ঐ কেন্দ্র ছেড়ে দিয়েছেন। দলও তাকে খড়দহ বিধানসভা থেকে প্রার্থী করার কথা জানিয়ে দিয়েছে। অর্থমন্ত্রী অমিত উপনির্বাচনে সম্ভবত প্রার্থী হচ্ছেন না। জঙ্গিপুর ও সামশেরগঞ্জ আসনে প্রার্থীদের মৃত্যুর কারণে ভোট হয়নি। আর খড়দহ কেন্দ্রে বিজয়ী প্রার্থী কাজল সিনহা ফলাফল ঘোষণার আগেই করোনা আক্রান্ত হয়ে মারা যান। আবার লোকসভার সংসদ সদস্য থেকে যাওয়ার দলীয় সিদ্ধান্তে দিনহাটা ও শান্তিপুর আসন থেকে পদত্যাগ করেছেন বিজেপির নিশীথ প্রামাণিক ও জগন্নাথ সরকার। তাই উপনির্বাচন হবে ঐ দুই আসনেও। কিন্তু কবে হবে? কেউ জানে না। বল সম্পূর্ণই দিল্লির কোর্টে।

(মাটিভাঙ্গা, পিরোজপুর)