ফাঁসানোর হাতিয়ার মিথ্যা ধর্ষণ মামলা

ধর্ষণ বর্তমান সময়ে সবচেয়ে গুরুতর ও জঘন্য অপরাধ এবং সামাজিক ব্যাধি হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমাদের দেশের সবচেয়ে দ্রুত বিচারের মামলাগুলোর একটি হলো ধর্ষণের মামলা। বর্তমানে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০-এর ৯ নম্বর ধারায় ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ডের বিধান করা হয়েছে, যা বর্তমান সময়োপযোগী সবচেয়ে সঠিক সিদ্ধান্ত। একই আইনের ১৭ নম্বর ধারায় মিথ্যা মামলা বা অভিযোগ দায়ের করার শাস্তির বিধান রয়েছে। তাতে মিথ্যা ধর্ষণ মামলার শাস্তি সর্বোচ্চ সাত বছর এবং অতিরিক্ত অর্থদণ্ড প্রদান করা হয়েছে। অথচ আমাদের দেশের স্বাক্ষ্য আইন, ১৮৭২-এ মিথ্যা মামলার জন্য শাস্তির বিধান হচ্ছে, যদি অপরাধটি সংঘটিত হতো তাহলে যে শাস্তি অপরাধী পাবেন, সেই একই পরিমাণ শাস্তি মিথ্যা মামলা দায়েরকারী পাবেন। কিন্তু এই ধারায় তেমন উল্লেখ করা হয়নি, যা অতীব প্রয়োজনীয়।

বর্তমান ভঙ্গুর সামাজিক সম্প্রীতি ও মূল্যবোধের অভাবে বিভিন্ন পারিবারিক বা সামাজিক দ্বন্দ্বের কারণে অনেকেই মিথ্যা মামলা করছে। ধর্ষণের শিকার একজন নারীকে যেমন সমাজে বিভিন্নভাবে হেয় প্রতিপন্নতার শিকার হতে হয়, তদ্রূপ মিথ্যা মামলায় ফাঁসানো একজন পুরুষকেও অনেকভাবে হেয় প্রতিপন্নতার সম্মুখীন হতে হয়। বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বদৌলতে মুহূর্তেই এসব বিষয় ছড়িয়ে পড়ে আলোর বেগে। আদালতের রায়ের আগেই মানুষ তাকে অপরাধী হিসেবে ধরে নেয়। এর ফলে অনেকের চাকরি চলে যায়, সামাজিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত হতে শুরু করে, সামাজিকভাবে একঘরেও হয়ে পড়ে। এমনকি যেখানে বাংলাদেশ সংবিধানের ৩৩ নম্বর অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘আটককৃত ব্যক্তি তাহার মনোনীত বা পছন্দমতো আইনজীবীর সাথে পরামর্শ করিতে পারবেন এবং তাকে আত্মপক্ষ সমর্থন করার অধিকার থেকে বঞ্চিত করা যাবে না।’ অথচ সেখানে আমরা আদালতের রায়ের তো অপেক্ষা করিই না, বরং এর আগেই তাকে অপরাধী ঘোষণা করে দিই, যাকে বলা হয় মিডিয়া ট্রায়াল। এবং কোনো আইনজীবী তার পক্ষে কাজ করতেও চান না। কারণ ঐ আইনজীবীকেও তখন সামাজিকভাবে হেয় করা হয়। এমনকি মিথ্যা মামলায় অভিযুক্তের পরিবারকে সামাজিকভাবে অনেক হেয় হতে হয় এবং আদালতের দ্বারে দ্বারে ঘুরতে হয়। অনেক সময় আদালত বেকসুর খালাস করলেও সমাজের চোখে অপরাধীই থেকে যান তারা।

কিছুদিন আগে একটি ঘটনা বেশ সাড়া ফেলে। নারায়ণগঞ্জে ১৫ বছরের এক তরুণীকে ধর্ষণের পর হত্যার অপরাধে তিন ব্যক্তিকে শাস্তি দেওয়া হয় এবং তারা ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় জবানবন্দিতে নিজেদের অপরাধ স্বীকার করে নেয়। কিন্তু যেই তরুণীকে ধর্ষণের জন্য তাদের শাস্তি হয়েছে, সেই তরুণী তার প্রেমিকের সঙ্গে সুখে সংসার করছেন। আবার এমন অনেক ধর্ষণ মামলা আছে, যেগুলোর রায় দিতে ৫-১০ বছর লেগে যায়। তখন অভিযুক্ত ব্যক্তি এই মিথ্যা মামলার বোঝা বয়ে বেড়ায়। এমতাবস্থায় মিথ্যা মামলার কঠোরতম শাস্তির পাশাপাশি যারা বিষয়টি নিয়ে তদন্ত করেন, তাদের এ বিষয়ে আরো সঠিক নজরদারি করতে হবে। তাই জোরপূর্বক স্বীকারোক্তি নিলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জন্যও কঠোরতম শাস্তির বিধান এবং শাস্তি নিশ্চিত করা অতীব জরুরি।

অসংখ্য মিথ্যা ধর্ষণ মামলা দায়ের হয় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে। জমি নিয়ে বিরোধের জের ধরে ফিরোজা বেগম নামে এক নারী বাদী হয়ে তিন জনের নামে ধর্ষণচেষ্টার মিথ্যা মামলা দায়ের করেন। কিন্তু মামলাটি মিথ্যা প্রমাণিত হওয়ার পর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের ১৭ নম্বর ধারায় বিচারক তানজীনা ইসলাম সেই নারীকে এক বছরের কারাদণ্ড ও ২০ হাজার টাকা জরিমানা করেন, যা খুবই নগণ্য।

সর্বশেষ, যদি মিথ্যা ধর্ষণ মামলা দায়ের করার শাস্তির পরিমাণ বাড়ানো হয় এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তদন্তকারী কর্মকর্তা, আদালত ও কারা কর্তৃপক্ষের যৌথ সমন্বয়ের মাধ্যমে দ্রুততম সময়ে কার্যকর ও সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করা যায়  এবং এর সঙ্গে জোরপূর্বক স্বীকারোক্তি নিলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জন্য ও কঠোরতম শাস্তির বিধান এবং শাস্তি নিশ্চিত করা যায়, তাহলে কিছুটা হলেও মিথ্যা মামলা দায়ের করার প্রবণতা কমানো যাবে বলে আশা করা যায়।

n লেখক :শিক্ষার্থী, আইন বিভাগ, ইস্টওয়েস্ট বিশ্ববিদ্যালয়