করোনার তৃতীয় ঢেউ :আমরা কতটা প্রস্তুত?

চোখ রাঙাইতেছে করোনার তৃতীয় ঢেউ। কিন্তু উহা সামলাইতে আমরা কতখানি প্রস্তুত রহিয়াছি? ভারতে গত দুই মাসে কোভিডের ডেলটা ধরনের যেই দ্বিতীয় ঢেউ প্রবলভাবে আছড়াইয়া পড়িয়াছিল, তাহা বর্তমানে প্রশমিত হইতেছে। তবে এই ডেলটা ধরনের বাংলাদেশসহ বিশ্বের ৫০টির অধিক দেশে ছড়াইয়া পড়িয়াছে। সম্প্রতি ভারতের টাইমস অব ইন্ডিয়ায় প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে বলা হইতেছে, দেশটির মহারাষ্ট্রে কোভিডের তৃতীয় ঢেউ শুরু হইবার উপক্রম। ঐ রাজ্যের করোনা পরিস্থিতি পর্যালোচনা করিতে গিয়া সেইখানকার মুখ্যমন্ত্রী বলিয়াছেন—ডেলটা প্লাস ভ্যারিয়েন্ট মহারাষ্ট্রে তৃতীয় ঢেউ ঘটাইতে পারে। দ্বিগুণ হারে ছড়াইতে পারে সংক্রমণ। দ্বিতীয় ঢেউয়ের সবচাইতে অধিক উচ্চতা দেখা গিয়াছিল মহারাষ্ট্রেই। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, করোনার তৃতীয় ঢেউ আরো মারাত্মক হইতে পারে।

বাংলাদেশেও দ্বিতীয় ঢেউ দেখা গিয়াছিল গত মার্চ-এপ্রিল মাসে। কিন্তু বর্তমানে যেইভাবে সংক্রমণ আবার বাড়িতেছে তাহাতে তৃতীয় ঢেউ শুরু হইতেছে কি না তাহা স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা স্পষ্ট করিয়া বলিতে না পারিলেও বিষয়টি যে ক্রমশ খুব খারাপ হইতেছে—সেই ব্যাপারে কাহারো কোনো সন্দেহ নাই। এক মাস পূর্বে করোনা শনাক্তের হার ৭ শতাংশে নামিয়া আসিলেও এখন তাহা প্রায় দ্বিগুণ হইয়া গিয়াছে। সীমান্তবর্তী জেলাগুলির পাশাপাশি অন্যান্য জেলাতেও সংক্রমণের হার বৃদ্ধি পাইতেছে। এই দিকে উত্তর ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বিভিন্ন সীমান্তবর্তী জেলায় করোনা ভাইরাসে শনাক্ত রোগীর সংখ্যা এখনো ৪০ শতাংশের উপরে। ইতিমধ্যে ভারতে শনাক্ত হওয়া করোনার ‘ডেলটা ধরন’-এর সামাজিক সংক্রমণ ঘটিয়াছে দেশে। দেশে করোনা সংক্রমণের দ্বিতীয় ঢেউ নিয়ন্ত্রণে প্রথমে ৫ এপ্রিল হইতে সাত দফায় বিভিন্ন বিধিনিষেধ দিয়া ‘সর্বাত্মক লকডাউন’ শুরু হয়। এইবার একসঙ্গে এক মাস বৃদ্ধি করা হইয়াছে বিধিনিষেধ। এইবার বিধিনিষেধে কিছু পরিবর্তন আনা হইয়াছে। এখন হইতে স্বাস্থ্যবিধি মানিয়া সকল সরকারি, আধাসরকারি, স্বায়ত্তশাসিত ও বেসরকারি অফিস খোলা থাকিবে। অর্থাত্ বর্তমানে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ব্যতীত সকল কিছুই খোলা রহিতেছে। দেশে এখন যেইভাবে করোনাকে প্রতিহত করিবার চেষ্টা করা হইতেছে, তাহাতে তৃতীয় ঢেউ প্রতিহত করা সম্ভব হইবে না বলিয়াই মনে হইতেছে। মনে রাখিতে হইবে, ডেলটা ভ্যারিয়েন্টের কারণে ভারতে করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ে আক্রান্ত ও মৃত্যু বহুল পরিমাণে বাড়িয়া গিয়াছিল। দেখা যাইতেছে, স্থানীয়ভাবে লকডাউন ও বিশেষ বিধিনিষেধে কাজ হইতেছে না। সীমান্তবর্তী জেলাগুলিতে বাড়িতে থাকা করোনার সংক্রমণ অন্যান্য জেলায়ও ছড়াইয়া পড়িতেছে ক্রমশ। দেশের করোনা সংক্রমণ পরিস্থিতি খারাপ হইবার সকল পথ খোলা রহিয়াছে। জানা গিয়াছে, এই মুহূর্তে করোনা চিকিত্সায় ঢাকা মহানগর বাদে ৭ হাজার শয্যা রহিয়াছে। শনাক্ত রোগী ৮ হাজার ছাড়াইয়া গেলেই রোগী ব্যবস্থাপনা চ্যালেঞ্জিং হইয়া পড়িবে। তাহা যদি দ্বিগুণ, তিন গুণ হইয়া যায়, তাহা হইলে পুরো পরিস্থিতি সম্পূর্ণই নিয়ন্ত্রণের বাহিরে চলিয়া যাইবে, যেমনটি গিয়াছিল ভারতের দ্বিতীয় ঢেউয়ের ক্ষেত্রে।

আমাদের জেলা পর্যায়ে আইসিইউর সংখ্যা নগণ্য বলিতেই চলে। আর উপজেলার কথা তো চিন্তাই করা যায় না। গত বত্সর প্রধানমন্ত্রী জেলায় জেলায় আইসিইউর ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেওয়া সত্ত্বেও তাহা এখনো সুদূর পরাহত। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে দেশের ১৩টি জেলায় এলাকাভিত্তিক লকডাউন অথবা বিশেষ বিধিনিষেধ জারি করিয়াছে স্থানীয় প্রশাসন। তবে এই সকল এলাকায় সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে রোগ শনাক্তকরণ পরীক্ষা, শনাক্ত ব্যক্তিকে আইসোলেশনে নেওয়া, কন্ট্যাক্ট ট্রেসিং, খাদ্য ও সামাজিক সহায়তা, শতভাগ নাগরিকের মাস্ক ব্যবহার নিশ্চিত করিবার বিষয়গুলি পুরোপুরি নিশ্চিত করা হইতেছে না বা যাইতেছে না। সার্বিকভাবে পরিস্থিতি ক্রমশ যেইভাবে উদ্বেগজনক পর্যায়ে চলিয়া যাইতেছে, তাহাতে এখনই কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা না হইলে তৃতীয় ঢেউয়ে আমাদের অনেক অধিক মূল্য চুকাইতে হইতে পারে।