কৃষি যান্ত্রিকীকরণে নয়া যাত্রা

বর্তমান সরকার ২০২১-২০২২ অর্থবছরের বাজেটে উন্নয়ন ও অনুন্নয়ন খাতে স্থানীয় সরকার ও পল্লি উন্নয়নের জন্য মোট ৪২ হাজার ১৮৯ কোটি টাকা বরাদ্দ করেছে, যার মধ্যে উন্নয়ন খাতে রয়েছে ২৫.৪ শতাংশ, যা পল্লি উন্নয়ন খাতের মোট বরাদ্দের ৬১.০১ শতাংশ। আবার সার্বিক বাজেটের আলোকে পল্লি উন্নয়ন খাতকে বরাদ্দের ভিত্তিতে যদি বিশ্লেষণ করা হয়, তাহলে সার্বিক অনুন্নয়ন বাজেটে স্থানীয় সরকার ও পল্লি উন্নয়ন খাতে বরাদ্দ ১.৫ শতাংশ এবং তার সঙ্গে যদি কৃষি খাতকে যোগ দেওয়া যায়, তাহলে ৩.৯ শতাংশ দাঁড়ায়। অন্যদিকে সার্বিক উন্নয়ন বাজেটে স্থানীয় সরকার ও পল্লি উন্নয়ন খাতে ১৮.৫ শতাংশ বরাদ্দ রাখা হয়েছে, তার সঙ্গে যদি কৃষি খাতকে যোগ দেওয়া যায়, তাহলে মোট বরাদ্দ দাঁড়ায় ২৫.৪ শতাংশ।

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে কৃষি গ্রামীণ জীবন ও জীবিকার প্রধান বাহক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত এবং পল্লি উন্নয়নের কথায় এলেই কৃষি সবার আগে চলে আসে। বর্তমানে কৃষি খাতে হার জিডিপিতে প্রায় ১২ শতাংশ এবং কৃষি জিডিপিতে শস্য খাতের অবদান সর্বাগ্রে রয়েছে। যেহেতু কৃষি পল্লি উন্নয়নের একটি বড় খাত, তাই সরকার বাজেটে কেবল কৃষি খাতে ১৬ হাজার ১৯৭ কোটি টাকা আগামী বছরের বাজেটে প্রস্তাব করেছে, আবার তার সঙ্গে মত্স্য, পশুসম্পদ, বন ইত্যাদিকে যোগ দিলে সার্বিক কৃষি খাতে বাজেট দাঁড়ায় ৩১ হাজার ৯৯৫ কোটি টাকা, যা মূল বাজেটের ৫.৩ শতাংশ। এখানে উল্লেখ্য, কৃষি যেহেতু একটি অগ্রাধিকারমূলক খাত এবং খাদ্যনিরাপত্তার বিষয়টির এর সঙ্গে সম্পৃক্ত, তাই গত বছরগুলোতে এই খাতে ভর্তুকি দেওয়া হয়েছিল ৩২ হাজার ৫ হাজার ২২ কোটি টাকা, যা গড়ে প্রতি বছর দাঁড়ায় ৬০১.৪ কোটি টাকা এবং আগামী বছরের বাজেরট ভর্তুকির প্রস্তাব করা হয়েছে ১০ হাজার ৯৯ কোটি টাকা। কোভিড-১৯ মোকাবিলায় সরকার ১ লাখ ৩ হাজার ১১৭ কোটি টাকা প্রণোদনা দিয়েছে, যার মধ্যে ৫ হাজার কোটি টাকা ৪ শতাংশ সুদে কৃষির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এসএমই খাতে দিয়েছে। বর্তমান সরকার মনে করছে, কৃষিতে উত্পাদনশীলতা বৃদ্ধিকরণ, কৃষি গবেষণায় দক্ষতা বৃদ্ধি, কৃষির বহুমুখীকরণ, রপ্তানিমুখী কৃষিপণ্যের বাণিজ্যিকীকরণ, পুষ্টিনিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ ও গ্রামাঞ্চলে বসবাসকারী বিপুল জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়ন ইত্যাদিতে জোর দিতে হবে। সেই ক্ষেত্রে বর্তমান বছরের বাজেটে অর্থনীতির প্রবৃদ্ধির (জিডিপি) যে টার্গেট ধরা হয়েছে, তা অর্জনে কৃষি খাতের গুরুত্ব অপরিসীম বিধায় সেই খাতে প্রবৃদ্ধি কমপক্ষে ৪.৫ শতাংশ হারে বাড়াতে হবে বলে কৃষি অথনীতিবিদগণ মনে করেন। কোভিড-১৯ দেখিয়ে দিয়েছে রপ্তানিমুখী চিন্তা পরিহার করে গ্রামীণ অর্থনীতি ও খাদ্য উত্পাদন খাতকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে জাতীয় পরিকল্পনা প্রণয়ন বিষয়ে। প্রবৃদ্ধি যা-ই হোক না কেন, তা অর্জিত হয়েছে মূলত কৃষি, প্রবাসী আয় এবং পোশাক রপ্তানি খাত থেকে সম্প্রতি কৃষিমন্ত্রী রাজধানীর খামারবাড়িতে কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন (কেআইবি) মিলনায়তনে সমন্বিত ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে কৃষি যান্ত্রিকীকরণ প্রকল্পের জাতীয় কর্মশালায় প্রধান অতিথির বক্তৃতায় বলেছেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সরকার কৃষিকাজে যন্ত্রের ব্যবহার বাড়িয়ে কৃষিকে আধুনিক ও লাভজনক করতে নিরলস কাজ করছে। কৃষি যান্ত্রিকীকরণে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে নেওয়া হয়েছে ৩ হাজার ২০ কোটি টাকার প্রকল্প। পাশাপাশি কৃষি যান্ত্রিকীকরণ ত্বরান্বিত করতে দক্ষ জনবল তৈরিতে ইতিমধ্যে মাঠ পর্যায়ে কৃষি প্রকৌশলীর ২৮৪টি পদ সৃজন করা হয়েছে। ফলে, কৃষি যান্ত্রিকীকরণের দিকে যাচ্ছে এবং যান্ত্রিকীকরণের সুফল পাওয়া যাচ্ছে। এ বছরে বোরোতে ধান কাটার যন্ত্র কম্বাইন্ড হারভেস্টার, রিপার বেশি ব্যবহূত হওয়ায় দ্রুততার সঙ্গে সফলভাবে ধান ঘরে তোলা সম্ভব হয়েছে। কৃষি যান্ত্রিকীকরণ প্রকল্পের মাধ্যমে অঞ্চলভেদে ৫০ শতাংশ থেকে ৭০ শতাংশ ভর্তুকিতে কৃষকদের কৃষিযন্ত্র দেওয়া হচ্ছে, তথা এ প্রকল্পের মাধ্যমে কৃষিতে নতুন অধ্যায় সূচিত হলো। এর মাধ্যমে ফসল উত্পাদনে সময় ও শ্রম খরচ কমবে, কৃষক লাভবান হবে এবং বাংলাদেশের কৃষিও শিল্পোন্নত দেশের কৃষির মতো উন্নত ও আধুনিক হবে। কৃষিযন্ত্রের প্রাপ্তি, ক্রয়, ব্যবহার ও মেরামত সহজতর করতে অত্যন্ত গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে জানিয়ে কৃষিমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা পর্যায়ক্রমে স্থানীয়ভাবে কৃষিযন্ত্র তৈরি করতে চাই। বর্তমানে বেশির ভাগ যন্ত্রপাতি বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। তা আমরা কমিয়ে আনতে চাই। ইতিমধ্যে আমরা মিয়ানমার, টাটাসহ অনেক কোম্পানির সঙ্গে কথা বলেছি, তাদের অনুরোধ করেছি, যাতে তারা বাংলাদেশে কৃষিযন্ত্র তৈরির কারখানা স্থাপন করে।

কৃষিতে যন্ত্রের ব্যবহারের মাধ্যমে কৃষক লাভবান হওয়ার পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ে কর্মসংস্থান তৈরি হবে। একই সঙ্গে, ফসলের নিবিড়তা বাড়বে ও চাষ ত্বরান্বিত হবে। দেশের বিদ্যমান কৃষিব্যবস্থার আধুনিক তথা যান্ত্রিকীকরণের জন্য বাজেটে ৩ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখার বিষয়টি নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। বলা যায়, ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মাণে এটি আরো এক ধাপ অগ্রগতি। সেক্ষেত্রে শুধু নগরায়ণ ও শিল্পায়ন করলেই চলবে না, বরং প্রচলিত ধারার আবহমান কৃষিব্যবস্থার উন্নয়নও একান্তভাবে কাম্য ও কাঙ্ক্ষিত। বর্তমানে শহর-নগর-বন্দরের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে গ্রামের উন্নয়ন সাধিত হচ্ছে। দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থায় অভূতপূর্ব অগ্রগতি সাধিত হয়েছে। রাজধানীসহ প্রায় সর্বত্র সুউচ্চ দালানকোঠা ও মার্কেট নির্মাণ করতে গিয়ে অত্যধিক চাপ পড়ছে কৃষিজমিতে। সরকার সমস্যাটি সম্পর্কে সম্যক সচেতন। প্রধানমন্ত্রী স্বয়ং বলেছেন, গ্রামকে শহরায়ন করা হবে, গ্রামের নিসর্গ-প্রকৃতি ও সৌন্দর্য অক্ষুণ্ন রেখেই। শহরের সব নাগরিক সুবিধা পৌঁছে দেওয়া হবে গ্রামেও। তাই বলে কেবল উন্নয়নের নামে কৃষিজমি অধিগ্রহণ করা যাবে না। মনে রাখতে হবে যে, কৃষি অদ্যাবধি বাংলাদেশের জীবন-জীবিকা ও অর্থনীতির প্রাণশক্তি। তবে বর্তমানে কৃষিকাজে উত্সাহী তথা কৃষিশ্রমিক পাওয়া রীতিমতো দুর্লভ হয়ে উঠেছে। গত দুই বছর ধরে হাওর অঞ্চলে বোরোর বাম্পার ফলন হওয়ায় ধান কাটার শ্রমিক পাওয়া যায় না। পাওয়া গেলেও একজন শ্রমিকের মজুরি ৮০০ থেকে ১ হাজার টাকা। অন্যদিকে বর্তমানে বাজারে এক মণ ধানের দাম বড়জোর ৪৫০-৫০০ টাকা। ইতিমধ্যে ধানের উত্পাদন খরচও বেড়েছে। প্রচলিত কৃষিব্যবস্থায় যান্ত্রিকীকরণ শুরু হলে ধানবীজ, চারা রোপণসহ সার ও কীটনাশক ছিটানো, নিড়ানি, সর্বোপরি ধান কাটা, মাড়াইসহ শুকানো এমনকি সরাসরি সাইলোতে পাঠানো—সবই করা সহজে সম্ভব আনুষঙ্গিক যন্ত্রপাতির মাধ্যমে। কৃষিতে প্রতি বছর কমবেশি ১০ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ থাকে। এর মধ্যে ৬-৭ হাজার কোটি টাকা খরচ হয়ে থাকে বিবিধ প্রণোদনা খাতে। এখন থেকে বাকি ৩ হাজার টাকা ব্যয় করা হবে কৃষি যান্ত্রিকীকরণের কাজে। তবে উল্লেখ করা আবশ্যক, এই কাজটি শুরু হয়েছে বেশ কয়েক বছর আগে থেকেই। তবে এর সার্বিক সুফল পেতে হলে টুকরো টুকরো জমির একত্রীকরণ অত্যাবশ্যক। সমবায় প্রথা এক্ষেত্রে সুফলদায়ক হতে পারে। এর পাশাপাশি উত্পাদিত ফসলের আধুনিক বিপণন ব্যবস্থাও জরুরি। গত কয়েক বছরে দেশে বিপ্লব ঘটে গেছে কৃষিতে, ডিজিটাল কৃষিসহ হাইব্রিড পদ্ধতি চালুর ফলে একেবারে বীজতলা থেকে শুরু করে সার, সেচ, কীটনাশক, আবহাওয়া, জলবায়ু, ফসল উত্পাদন, বাজার পরিস্থিতিসহ অন্যবিধ সমস্যা নিয়ে খোলামেলা মতবিনিময়, পরামর্শ ও প্রতিকারের সুযোগ পাওয়া যায় তাত্ক্ষণিকভাবে। এর অনিবার্য ইতিবাচক প্রভাব পড়ছে কৃষি ব্যবস্থাপনায়, সুফল পাচ্ছে কৃষক, সর্বোপরি বাড়ছে ফসল উত্পাদন। তার মানে ডিজিটাল কৃষিব্যবস্থা দেশের কৃষিতে প্রায় বিপ্লব নিয়ে এসেছে। আবহমানকাল ধরে প্রচলিত গবাদি পশুচালিত লাঙল-জোয়ালের দিন শেষ হয়েছে আগেই। হাইব্রিড বীজ, জিএম বীজসহ আধুনিক চাষাবাদ পদ্ধতি ফসল, শাকসবজি, মত্স্য, পোলট্রি, ফলফলাদির উত্পাদন বাড়িয়েছে বহু গুণ। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সর্বাধুনিক তথ্যপ্রযুক্তি। প্রতি বছর উদ্বৃত্ত খাদ্যশস্যসহ অন্যান্য কৃষিপণ্য সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনার জন্য আধুনিক খাদ্যগুদামের প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। এর পাশাপাশি কৃষির যান্ত্রিকীকরণসহ সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার হলো সব মানুষের জন্য নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা।

এখন প্রশ্ন হলো, কোভিডের কারণে বিদেশ থেকে যে শ্রমিকরা দেশে ফিরে এসেছেন এবং এখনো বিদেশে যেতে পারেননি, শহর থেকে কাজ হারিয়ে যারা গ্রামে ফিরে যেতে বাধ্য হয়েছেন, তাদের কর্মসংস্থান কিংবা তাদের শ্রম বিনিয়োগ কীভাবে ঘটবে? তার তেমন কোনো উল্লেখ বাজেটে নেই। তথ্য বলছে, বিগত বছরগুলোতে জাতীয় বাজেটে কৃষি খাতের বরাদ্দ অবহেলিত হয়ে এসেছে এবং কৃষি খাতে ভর্তুকি অন্যান্য বারের মতো এবারেও একি অবস্থা।

চাষিরা অসম প্রতিযোগিতায় টিকতে পারছেন না। বাজার ব্যবস্থাপনায় এসব কৃষকের কোনো প্রবেশাধিকার এখনো প্রতিষ্ঠিত হয়নি, যার প্রমাণ কৃষিপণ্য বিশেষত কৃষকের ধানের মূল্য না পাওয়া, যার প্রভাব পড়েছে ক্রমাগতভাবে কৃষি প্রবৃদ্ধির হ্রাস পাওয়ায়।

n লেখক :অধ্যাপক, গবেষক ও ডিন, সিটি ইউনিভার্সিটি, ঢাকা