প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি

সৃষ্টিগতভাবেই আমরা কেউ এরিস্টটল, প্লেটো বা আইনস্টাইনের মতো জ্ঞানরাশির ভান্ডার নিয়ে জন্মাইনি বিধায় মানুষ আমার লেখা বা বক্তব্য থেকে জ্ঞানরস আহরণ করবে—এমনটা প্রত্যাশা করি না। তবে একজন শিক্ষক বা অভিভাবক, সর্বোপরি একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে জীবনে যা কিছু প্রত্যক্ষ করেছি বা উপলব্ধি করেছি, তা এই লেখার মাধ্যমে আমি পাঠকদের জন্য উপস্থাপন করার চেষ্টা করছি। আমি মনেপ্রাণে বিশ্বাস করি, আমরা যদি প্রত্যেকে নিজ নিজ কর্মস্থলে লোভলালসা ও চাতুর্য থেকে দূরে থেকে সততা ও নৈতিকতার সঙ্গে কাজ করি, তবে সমাজের অনৈতিকতা, ঘুষ ও দুর্নীতি সমূলে উত্পাটনের মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী জাতীয় বীরদের স্বপ্ন বাস্তবায়নে সফল হব।

আমি মনে করি, শুধু জন্মদাতা হলেই পিতৃত্বের দাবিদার হওয়া যায় না, কারণ মানুষ ও প্রাণিকুল সন্তান জন্মদানের ক্ষমতা প্রকৃতিগতভাবেই পেয়ে থাকে। সত্যিকার অর্থে পিতা হওয়ার যোগ্যতা তার কর্মের মাধ্যমে অর্জিত হয়। সন্তানদের সঠিক পরিচর্যা, দিকনির্দেশনা ও আচরণগত শিক্ষা পিতার দায়িত্ব ও কর্তব্যের অন্তর্ভুক্ত। একজন পিতাকে নিজের ব্যবহার, চলন, কথোপকথন ইত্যাদির প্রতি সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে। কারণ, পিতা হচ্ছেন সন্তানদের জন্য মডেল বা নৈতিক শিক্ষক। সত্যিকার অর্থে শিশুদের জন্য পরিবারই হচ্ছে পাঠশালাতুল্য। আর সেই শিক্ষালয়ে পিতামাতাই হলেন প্রধান এবং প্রথম শিক্ষক ও শিক্ষয়িত্রী। সমস্ত ধর্মগ্রন্থ থেকে শুরু করে সমাজবিজ্ঞানের প্রতিটি শাখায় এ কথগুলোই বলা আছে। সাধারণত কোনো শিশুই জন্মগতভাবে অপরাধী হয়ে জন্মায় না। পারিবারিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় অব্যবস্থাপনার গর্ভেই অপরাধীর জন্ম। একটি শিশু জন্ম নেয় পুষ্পের ন্যায় পবিত্ররূপে। আর পারিবারিক ও সামাজিক পরিবেশ থেকে পর্যায়ক্রমে সে হয়ে ওঠে একজন প্রকৃত মানুষ বা অপরাধী। কিন্তু শিক্ষাজীবন শেষে কর্মজীবনে প্রবেশ করে সেই ছেলেকেই যখন অবলীলায় দুর্নীতিতে জড়িয়ে যেতে দেখা যায়, তখন মানুষরূপী অমানুষটির থেকেও তার পিতাকে বেশি অপরাধী মনে হয়। কারণ পিতা তার সন্তানকে দুনিয়ায় বাঁচতে শিখিয়েছেন ঠিকই, কিন্তু সুশিক্ষায় শিক্ষিত করে গড়ে তুলতে পারেননি। এখনই সময় যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণের, যাতে করে আমাদের সন্তানেরা বড় হয়ে মানুষরূপী অমানুষে পরিণত না হতে পারে।

আমাদের সমাজব্যবস্থায় একজন ভালো মানুষ, একজন সমাজসেবক, একজন বুদ্ধিজীবী তথা একজন  শিক্ষক যথাযথভাবে মূল্যায়িত হন না। বিষয়টি যেমন আমাকে ব্যথিত করে, তেমনি একজন শিক্ষক হিসেবে যখন দেখি সমাজ সংস্কারে সত্যিকারের একজন নির্দেশকের ব্যাপক শূন্যতা, তখন অত্যন্ত ব্যথিত হই। বর্তমান প্রেক্ষাপটে আমাদের সমাজব্যবস্থার প্রতিটি স্তরে একজন করে নির্দেশক বা গাইড অত্যন্ত প্রয়োজন। অন্যথায় চলমান এই ব্যবস্থায় সমাজ পরিবর্তন করা সম্ভব নয়। একজন সত্যিকারের নির্দেশক বা সমাজ সংস্কারকই তার কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে নিজেকে মনুষ্যসমাজের জীবনদর্শনের শ্রেষ্ঠ শিক্ষক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে পারেন। অর্থাত্, শিক্ষক বা নির্দেশক হবেন এমন এক ব্যক্তি, যিনি শিক্ষার্থীদের নৈতিকতা, দেশপ্রেম ও মানবতাবোধ সংবলিত গুণাবলিতে সমৃদ্ধ করে তুলবেন; তাহলে তিনিই হবেন প্রকৃত সমাজসেবক ও জনবান্ধব মানুষ। আমাদের অদূরদর্শিতার কারণে মেধা বিক্রি হচ্ছে একশ্রেণির অর্থপিশাচের কাছে। আমরা কেন মেধা বিক্রি রোধ করতে পারছি না?

আমার ভাবতে অবাক লাগে, যখন দেখি দেশের জনগণের করের টাকায় গড়ে ওঠা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে একজন শিক্ষার্থী স্বল্প ব্যয়ে আবাসিক হলে খাবার খেয়ে, শিক্ষার যাবতীয় উপকরণ সহজে গ্রহণ করে, উচ্চতর ডিগ্রি অর্জন করে রাষ্ট্রের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন হয়ে দুর্নীতি করে সম্পদের পাহাড় গড়ে তোলে। দেশের প্রতি এবং জনগণের প্রতি তাদের কি ন্যূনতম কৃতজ্ঞতা বা দায়বদ্ধতা কাজ করে না? প্রকৃত অর্থে এরা স্বশিক্ষিত বা সুশিক্ষিত কোনোটিই নয়,  দুর্নীতিবিদ্যা ও জনদুর্ভোগ সৃষ্টি করার বিদ্যায় সিদ্ধহস্ত। রাষ্ট্রযন্ত্রের প্রধান অঙ্গসমূহ যেমন—নির্বহী বিভাগ, আইন ও বিচার বিভাগে কর্মরত প্রত্যেক ব্যক্তিই যদি নৈতিকতা ও দেশপ্রেমের শিক্ষায় অনুপ্রাণিত হয়ে পারিবারিক, সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক উন্নয়নে নিজেকে নিয়োজিত করেন, তাহলে আমাদের এ দেশের উন্নয়ন ও সমৃদ্ধিলাভ দ্রুততম সময়েই সম্ভব।

আমরা খুবই আশাবাদী হই, যখন দেখি তথাকথিত বুদ্ধিজীবীরা বিভিন্ন টকশোতে টিভির পর্দার সামনে উপস্থিত হয়ে প্রত্যেকে স্বদলীয় প্রশংসা, একে অন্যের দোষারোপ, রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনার অস্থির সমালোচনা কিংবা গুণকীর্তন নিয়ে ব্যস্ত থাকেন। আর এসব শুনে আমরাও ভাবতে থাকি, আমাদের সমাজ ও রাষ্ট্র শুধরে যাচ্ছে। তখন আমরা একবারও কি চিন্তা করি, তাদের এ ধরনের বক্তব্য বা সমালোচনা উন্নত সমাজ ও রাষ্ট্র গঠনে কতটুকু ধনাত্মক ভূমিকা রাখে? আমি মনে করি বুদ্ধিজীবীরা তাদের জ্ঞানকে পক্ষপাতিত্বের দোষে দুষ্ট না করে গঠনমূলক সমালোচনা, ভালো কাজের প্রশংসা, মন্দ কাজের নিন্দা ও সত্যিকারের যোগ্য ব্যক্তির গুণকীর্তনের মাধ্যমে এবং নিজেদের বুদ্ধির যথাযথ প্রয়োগের দ্বারা আমাদের রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক অবক্ষয়গুলো দূরীকরণে এবং দেশপ্রেমিক নাগরিক গড়ে তোলার ক্ষেত্রে মুখ্য ভূমিকা পালন করতে পারেন। আর আমরা যারা সাধারণ জনগণ, তারা যদি সমাজসেবকদের ভালো কাজে সহযোগিতা করি বা উত্সাহদানের মাধ্যমে তাদের কাজের প্রশংসা করি, তাহলে সমাজসেবকেরাও সমাজসেবামূলক কাজে আরো বেশি অনুপ্রাণিত হবেন।

এবার আসি রাজনীতির কথায়। অর্থাত্ এই নীতির যারা ধারক ও বাহক, সেই রাজনীতিবিদ বা নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি যিনি যথার্থ অর্থেই জনগণের প্রতিনিধি হওয়ার কথা, তিনি কি তা হচ্ছেন? আব্রাহাম লিংকনের ভাষায় :প্রকৃত অর্থে যারা হবেন ‘জনগণ দ্বারা নির্বাচিত, জনগণ দ্বারা পরিচালিত এবং জনগণের কল্যাণে নিবেদিত’। কিন্তু এরকম জনপ্রতিনিধি বা সমাজপতি অথবা সমাজসেবকের আজ বড্ডই অভাব, যার বা যাদের কর্মকাণ্ডে জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষার বাস্তবসম্মত প্রতিফলন ঘটবে। আজকের সমাজপতি বা জনপ্রতিনিধিরা যদি যথাযথ নৈতিকতা ও দেশপ্রেমের দীক্ষায় দীক্ষিত হয়ে সমাজপতির আসনে অধিষ্ঠিত হতেন, তাহলে আমরা যারা এ সমাজে বসবাস করছি তারা কতই না সুফল পেতাম। ভাবুন তো, এই কয়েক বছর আগেও ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ গড়ার প্রত্যয়কে পাড়া-মহল্লায়, অলিগলিতে, চায়ের দোকানে সিগারেটের ধোঁয়ার মতো ব্যঙ্গ করে উড়িয়ে দিত একশ্রেণির বোধ-বুদ্ধিহীন সমালোচকবৃন্দ। অথচ আজকে আমাকে-আপনাকে স্বীকার করতেই হবে যে ‘সাহসী সেই রাষ্ট্রনায়কের’ দৃঢ় পদক্ষেপেই আমরা কতটা সামনে এগিয়েছি।

আমার বক্তব্য নির্দিষ্ট কোনো শ্রেণি-পেশার ব্যক্তির উদ্দেশে নয়। আমার ভিন্নমত শুধু রাষ্ট্রযন্ত্রের দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিস্বার্থকেন্দ্রিক মনোভাবাপন্ন কিছু ব্যক্তি এবং সেই মনোভাব গড়ে ওঠার পেছনে দায়ী অসুস্থ সামাজিক স্তরগুলোর বিষয়ে। আমি একজন সচেতন নাগরিক এবং একজন শিক্ষক হিসেবে সামাজিক ও নৈতিক দায়বদ্ধতা থেকে কথাগুলো প্রজাতন্ত্রের নাগরিকদের উদ্দেশে উপস্থাপন করেছি মাত্র। কারণ আমি আমার শিক্ষার্থী ও সন্তানদের ভবিষ্যত্ নিয়ে শঙ্কিত। সামাজিক অবক্ষয়ের মাত্রা আমাকে বাধ্য করেছে এ ধরনের বক্তব্য উপস্থাপনের জন্য। আমি স্বপ্ন দেখি এদেশের প্রত্যেক পিতা তার সন্তানদের নৈতিকতা, সামাজিক মূল্যবোধ ও দেশপ্রেমের শিক্ষা দেবেন এবং প্রত্যেক শিক্ষক সত্যিকারের বন্ধু হয়ে শিক্ষার্থীদের নৈতিক ও মানসিক শক্তিকে আরো বলীয়ান করবেন এবং সীমাবদ্ধতাকে শক্তিতে রূপান্তরিত করবেন। রাষ্ট্রযন্ত্রের প্রত্যেক দায়িত্বশীল ব্যক্তি যদি তাদের দায়িত্ব ও কর্তব্য নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করেন, তাহলে তাদের দপ্তরে থাকবে না কোনো প্রকার ঘুষ, দুর্নীতি ও অনিয়ম। আপনারা যারা আমার বক্তব্য ও লেখার সঙ্গে সহমত পোষণ করবেন, তাদের মধ্যে কেউ হয়তো স্বস্তির ও তৃপ্তির এক চিলতে হাসি দিয়ে বলবেন, লেখকের স্বপ্ন আজ বাস্তবে রূপ নিচ্ছে। সেই স্বপ্ন ও প্রত্যাশা নিয়েই থাকলাম আমৃত্যু।

n লেখক : অধ্যক্ষ, ফরিদ আহমেদ ভূঁইয়া একাডেমি ও সাবেক অধ্যাপক, বাংলাদেশ ক্যাডেট কলেজেস