আমি সবসময় ইতিহাস-ঐতিহ্য থেকে বিষয় খুঁজি —সেলিনা হোসেন

বাংলা কথাসাহিত্যের প্রথিতযশা লেখক সেলিনা হোসেন। তাঁর লেখার জগত্ বাংলাদেশের মানুষ, বাঙালি সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য। তাঁর সাহিত্যের অন্যতম বৈশিষ্ট্য—পুরাণের উজ্জ্বল চরিত্রসমূহকে তিনি নতুনভাবে তুলে আনেন। তাঁর উপন্যাসে প্রতিফলিত হয় সমকালের সামাজিক ও রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব-সংকটের সামগ্রিকতা। বাঙালির অহংকার ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের প্রসঙ্গ তাঁর লেখায় নতুন মাত্রা যোগ করে। জীবনের গভীর উপলব্ধিকে তিনি শুধু কথাসাহিত্যেই প্রকাশ করেন না, শাণিত ও শক্তিশালী গদ্যের নির্মাণে প্রবন্ধেও উপস্থাপন করেন। সেলিনা হোসেন ২০১৮ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক সন্মানসূচক ডি-লিট ডিগ্রিতে ভূষিত হন। এছাড়া বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার, একুশে পদক, স্বাধীনতা পুরস্কার-সহ বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সম্মাননা অর্জন করেন। গত ১৪ জুন ছিল গুণী এই সহূদয় মানুষটির পঁচাত্তরতম জন্মদিন। সাহিত্য ও অন্যান্য বিষয় নিয়ে তাঁর সঙ্গে কথা বলেছেন বোরহান মাসুদ

কেমন আছেন? করোনা সংক্রমণের কারণে সারা বিশ্ব এখন অচলপ্রায়। অন্যদিকে আমরা প্রতিদিন কোনো না কোনো আপনজনকে হারাচ্ছি। এ অবস্থায় আপনার দিনগুলো কেমন কাটছে?

সেলিনা হোসেন : আল্লাহর রহমতে ভালো আছি। আমার দিনগুলো চলে যাচ্ছে। কিন্তু আমি যখন আমার চারপাশে প্রিয়জনদের মৃত্যুর সংবাদ পাই তখন সেটা আমাকে গভীরভাবে মর্মাহত করে। বিশেষ করে সাহিত্যজগতের মানুষদের মৃত্যুতে খুবই শূন্যতা বোধ করছি।

 

আপনার প্রথম গল্পগ্রন্থ ‘উত্স থেকে নিরন্তর’ প্রকাশিত হয় ১৯৬৯ সালে। প্রথম বই প্রকাশের অনুভূতিটা কেমন ছিল? 

সেলিনা হোসেন :এই বই প্রকাশের জন্য আমার শিক্ষক অধ্যাপক আব্দুল হাফিজ আমাকে অনুপ্রাণিত করেছেন এই বলে, ‘তুমি যখন এমএ পাস করেছ, একটা চাকরি করতে হবে। আর চাকরির জন্য নানান জায়গায় ইন্টারভিউ দিতে হবে। তোমার সিভিতে যদি একটি বইয়ের উল্লেখ থাকে, তাহলে অন্যদের চাইতে তুমি একটু বাড়তি গুরুত্ব পাবে। তুমি একটি বই প্রকাশ করো।

রাজশাহী থেকে তখন আমার বই কে প্রকাশ করবে? এই বিষয় নিয়ে আমি যখন চিন্তায় ছিলাম তখন স্যার আমাকে ধমক দিয়ে বললেন, তোমার বই কেউই প্রকাশ করবে না। যাও তোমার বাবা-মায়ের কাছে। দেখো তাঁরা টাকা দেন কি না!

মায়ের কাছে গিয়ে বললাম। মা বললেন, ঠিক আছে আমার সংসারের খরচ থেকে তোমাকে দেবো। বাবাও বললেন, ঠিক আছে আমিও খরচ দেবো। তুমি যদি একটা চাকরি পাও তাহলে তো ভালোই হয়।

সাহিত্যের জায়গা থেকে নয়, একটি চাকরির পাওয়ার জায়গা থেকে আমার প্রথম বই বের হয়।

 

‘হাঙর নদী গ্রেনেড’, ‘পোকা মাকড়ের ঘরবসতি’ নিয়ে চলচ্চিত্র হয়েছে। এর মধ্যে আপনি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারও পেয়েছেন। আপনার উপন্যাস নিয়ে নতুন কোনো চলচ্চিত্র নির্মাণ হচ্ছে কি?

সেলিনা হোসেন :গত বছর আমার দুটি উপন্যাস নিয়ে চলচ্চিত্র নির্মাণের জন্য তথ্য মন্ত্রণালয় থেকে সরকারি অনুদান পেয়েছে। ‘ভালোবাসা প্রীতিলতা’ চলচ্চিত্রায়ণ হচ্ছে। অন্যটি হলো— ‘রাসেলের জন্য অপেক্ষা’ নামে আমি একটি শিশুগ্রন্থ লিখেছিলাম সেই বইটিও সরকারিভাবে শিশুতোষ চলচ্চিত্রের জন্য অনুদান পেয়েছে। চলচ্চিত্র নির্মাণের কাজ চলছে।

‘ভূমি ও কুসুম’ ছিটমহলের পটভূমিতে লেখা অনন্য উপন্যাস। যতদূর জানি, এধরনের বিষয় নিয়ে বাংলা সাহিত্যে এটিই প্রথম উপন্যাস। এরকম একটি ব্যতিক্রমী বিষয় নিয়ে উপন্যাস লেখার চিন্তা কীভাবে মাথায় এল?

সেলিনা হোসেন :যখন উপন্যাসটি লেখার ভাবনা আসে তখন পত্রপত্রিকায় খুব লেখা হতো যে, কীভাবে ছিটমহলের মানুষরা দুর্ভোগের মধ্যে জীবন যাপন করছে, সেজন্য এই পটভূমিটা আমার কাছে খুব গভীরভাবে আসে যে, এই দুর্ভোগের মধ্যে জীবন যাপন এবং ছিটমহল তৈরি—সবকিছু মিলে এটি একটি নতুন বিষয় হবে। তখন আমি দহগ্রাম-আঙ্গরপোতা ঘুরতে গিয়েছিলাম যেটা নীলফামারীর ভারতের মূল ভূখণ্ডের মধ্যে অবস্থিত। যখন উপন্যাসটি লেখার চিন্তা মাথায় এল তখন মনে হলো এলাকাটা একটু ঘুরে আসি। ওখানে যারা বসবাস করে তাদের একটা ইন্টারভিউ করে আসি। এটা আমার কাজের ধারা। লেখার আগে লেখার বিষয়ের শেকড়ে চলে যাই। সবকিছু দেখে জেনে শুনে লেখাটা শুরু করি।

 

একটা উপন্যাসের ভেতর কীভাবে একটা সময়কে নিখুঁতভাবে চিত্রায়িত করা যায়, ‘কাঁটাতারে প্রজাপতি’ বইটি তার এক বিরল সাক্ষী। ইলামিত্রের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে উপন্যাসটি শেষ করেছেন। এই উপন্যাসটি লেখার অভিজ্ঞতা নিয়ে পাঠকের উদ্দেশে কিছু বলবেন?

সেলিনা হোসেন :আমার অভিজ্ঞতার জন্য সবসময় আমি ইতিহাস-ঐতিহ্য থেকে বিষয় খুঁজি। এই উপন্যাসটির ক্ষেত্রেও আমি ইতিহাস থেকে প্লট নিয়েছি। ১৯৪৬ সালে একটা কৃষক বিদ্রোহ হয়েছিল। কৃষকরা তাদের অধিকারের দাবিতে আন্দোলন করেছিল। ইলামিত্র ছিলেন সেই সময়ের জমিদার রমেন্দ্র মিত্রের স্ত্রী। তিনি এই কৃষক বিদ্রোহকে সাপোর্ট করেছিলেন। এটা ছিল একটা সাধারণ দিক। যে কারণে আমি এই নারী চরিত্রটিকে গণমানুষের চেতনার জায়গা থেকে ধারণ করে এই উপন্যাসটি রচনা করেছি। তিনি যখন গ্রেপ্তার হন পুলিশের হাতে, তার আগে তিনি সবাইকে বলেছিলেন—পুলিশের সামনে কখনো আমার নাম উচ্চারণ করবে না। আমাকে ধরে নিয়ে যাচ্ছে যাক।

কৃষক বিদ্রোহের এই আন্দোলনে সাঁওতালরাও তাঁর সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল। তাঁকে যখন নিয়ে যাওয়া হয় তখন আশেপাশে সাঁওতাল কৃষকদেরও ধরেছিল। একজন সাঁওতাল ছেলেকে বারবার জিজ্ঞেস করছিল—তোমাদের নেতৃত্বে কে ছিল? সে কিছুতেই কোনো কথা বলছিল না। তখন তাকে থানায় বুকের উপর বুট দিয়ে চাপা দেয়। তখনো সে তাঁর কথা বলেনি। অথচ তখন তার মুখ দিয়ে গলগলিয়ে রক্ত বেরুচ্ছে। এটাই ছিল সাধারণ মানুষের জীবন-অভিজ্ঞতার বড়ো দিক। যে নারী তাদেরকে এই আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা নিয়ে, সহযোগিতা দিয়ে উদ্বুদ্ধ করছেন, তিনি আবার তাদের নিষেধও করছেন, তাঁর নাম ধরে কথা না বলতে। মৃত্যুকে বরণ করেছে, কিন্তু একথাটি কখনো উচ্চারণ করেনি।

সেই সময় কমিউনিস্ট পার্টির লোকেরা ইলামিত্রের কাছে বলেছিলেন—পুলিশ যে নির্যাতন করেছে, তাঁকে ছাড়ানোর জন্য, তাঁর মুক্তির জন্য একটা জবানবন্দি দিতে। তখন তিনি সেই জবানবন্দিতে পরিষ্কার করে বলেছিলেন, পুলিশ তাঁকে ট্রাকে ধর্ষণ করেছিল।

 

এক আশ্চর্য বীর কাকতাড়ুয়া। রুখে দিচ্ছে শত্রুর গতি। বুকের ভেতর ধরে রেখেছে মুক্তিযুদ্ধ। ‘কাকতাড়ুয়া’ গল্পটি নিয়ে চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে। শুধু তা-ই নয়, নবম ও দশম শ্রেণির  বাংলা সহপাঠেও গল্পটি অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। নিজে দেখে যাওয়া বিরল এ সম্মাননা কতটুকু উপভোগ্য?

সেলিনা হোসেন : এই সম্মাননা নিঃসন্দেহে গভীর আনন্দের যে, এটা পাঠ্যপুস্তকে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। যারা সম্পাদক মণ্ডলিতে ছিলেন তাঁরাই এটাকে অন্তর্ভুক্ত করেছেন। তাঁরা আমাকে জিজ্ঞাসাও করেননি। এটা আমার জন্য গভীর আনন্দের।

 

লেখালেখির অনেকটা পথ পাড়ি দিয়ে এ পর্যায় এসেছেন। আজ পঁচাত্তর বছর বয়সে দাঁড়িয়ে নিজের কাছে কি জানতে ইচ্ছে করে না—কী পেলেন আর কী পেলেন না? অথবা আপনি যা করতে চেয়েছেন তার কতটুকু পেরেছেন আর কতটুকু বাকি? এই প্রাপ্তি আর অপ্রাপ্তিকে আপনি কীভাবে দেখেন?

সেলিনা হোসেন : প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির বিষয়টা তো লেখকের থাকবেই। লেখক অনেক কিছু মাথায় রাখেন, অনেক চিন্তা করেন যে, কী ধরনের বিষয়কে সাহিত্যে আনবেন। এরকম অনেক বিষয় আমার সামনে আছে। আমি যদি আর কিছুদিন সুস্থ থাকি তাহলে আরো কিছু লেখা লিখব অবশ্যই। এবং যে অর্জনটা আমার জীবনে ঘটেছে লেখালেখির সূত্রে সেই আর্জনটাকে আমি বড়ো ধরনের প্রাপ্তি বলেই মনে করি।