তাসফিয়া তাসমিন মিশু, প্রভাষক, বাংলা বিভাগ
ড.মাহবুবুর রহমান মোল্লা কলেজ, ঢাকা
‘আমার পথ’
প্রবন্ধ আলোচনা
উত্স পরিচিতি:
‘আমার পথ’ প্রবন্ধটি কাজী নজরুল ইসলামের সুবিখ্যাত প্রবন্ধগ্রন্থ ‘রুদ্র মঙ্গল’ থেকে সংকলিত হয়েছে।
মূল উপজীব্য বিষয়:
=> সত্য সম্পর্কে ধারণা লাভ করে বিশ্বাস ও আস্থা অর্জন।
=> সত্যকে জেনে নিজেকে চেনার জ্ঞান লাভ
=> স্বাবলম্বনের সুফল এবং পরাবলম্বনের কুফল
=> আত্মনির্ভরতা অর্জনে আত্মাকে চেনার গুরুত্ব
=> পুরনোকে ধ্বংসের মাধ্যমে কীভাবে বিপ্লব সফল করতে হয়
=> মিথ্যা ও মেকি বর্জন করে নিজেকে চেনা, সত্যকে গ্রহণ করা
=> ভুলকে অকপটে স্বীকার করা
=> সংকীর্ণতা, হিংসা, বৈষম্য ও সামপ্রদায়িকতামুক্ত সমাজ গঠনে আত্মপ্রত্যয়ী হওয়া
মূলভাব:
‘আমার পথ’ প্রবন্ধে প্রাবন্ধিক নিজেই নিজের কর্ণধার। কোনো ভয়ের কাছে তিনি মাথা নত করেন না। নিজের চেনা পথ, চেনা বিশ্বাসেই তিনি চলেন। অকারণে কাউকে খুশি করতে তিনি বিনয় দেখাতেও রাজি নন। তিনি বিশ্বাস করেন নিজের আদর্শ ও সত্তাকে চিনলেই সব চেনা যায়। জাতির পরিবর্তন প্রসঙ্গে তিনি ভারতীয়দের পরনির্ভরশীল মানসিকতাকে দায়ী করেছেন। তিনি বিশ্বাস করেন আত্মনির্ভর না হলে ভারতবাসী কখনোই স্বাধীন হবে না। এ প্রসঙ্গে তিনি মহাত্মা গান্ধীর উদাহরণ দিয়েছেন। ভারতবাসী নিজেরা নিষ্ক্রিয় থেকে শুধু মহাত্মা গান্ধীকে প্রাণপণে ভক্তি করলে ভারত কখনোই স্বাধীন হবে না। প্রাবন্ধিক আশা করেন ভারতের স্বাধীনতার জন্য ভারতবাসীকে আত্ম-চেতনার পথে নামতে হবে। উদ্দেশ্য ঠিক করে আত্ম-শক্তিতে বলীয়ান হয়ে ভয়-ভীতির ঊর্ধ্বে উঠে এগিয়ে যেতে পারলেই ভারত ভারতবাসীর হবে। এ জন্য তিনি এই ঘুণে ধরা সমাজব্যবস্থার পরিবর্তনের জন্য নিজ হাতিয়ার নিজের সত্যকে, নিজের আদর্শকে আগুনের ঝাণ্ডার মতো ব্যবহার করতে চেয়েছেন। তিনি বিশ্বাস করেন নিজের ধর্মে বিশ্বাসী ভারতীয় জাতি নিজেদের দ্বন্দ্ব-বিভেদ ভুলে একসঙ্গে কাজ করতে পারলে আমরা আমাদের লক্ষে পৌঁছতে পারব। মূলত এ প্রবন্ধে প্রাবন্ধিক সত্য প্রকাশ এবং মিথ্যাকে ঘৃণার পাশাপাশি তার অসামপ্রদায়িক চেতনাকে প্রকাশ করেছেন।
গুরুত্বপূর্ণ অনুধাবন প্রশ্ন ও উত্তর
১। ‘আমার কর্ণধার আমি’ উক্তিটি দ্বারা প্রাবন্ধিক কী বুঝিয়েছেন?
উত্তর:‘আমার কর্ণধার আমি’ উক্তিটি দ্বারা প্রাবন্ধিক নিজের ওপর কর্তৃত্বের গুরুত্বকে বুঝিয়েছেন।
সমাজের প্রত্যেকেই একে অন্যের ওপর নির্ভরশীল। এই নির্ভরশীলতা স্বাধীন মত প্রকাশে বাধার সৃষ্টি করে। একে অন্যের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে পড়ে। কিন্তু নিজের ওপর কর্তৃত্ব থাকলে অনেক কাজ সহজেই করা যায়। ‘আমার কর্ণধার আমি’ উক্তিটি দ্বারা প্রাবন্ধিক নিজের ওপর নিজের কর্তৃত্বের এ গুরুত্বকেই বুঝিয়েছেন।
২। ‘যার ভিতরে ভয়, সেই বাইরে ভয় পায়’- কথাটি দিয়ে লেখক কী বুঝিয়েছেন?
উত্তর:‘যার ভেতরে ভয়, সেই বাইরে ভয় পায়’- কথাটি দিয়ে লেখক বুঝিয়েছেন, যার হূদয়ে ভয় আছে সে চারদিকে শুধু ভয়ই অনুভব করে।
মানবহূদয়ে সত্য না থাকলে মিথ্যা এসে বাসা বাধে। মানুষ যদি মনে সত্যকে ধারণ করতে না পারে তবে মিথ্যা তাকে ধ্বংসের পথে নিয়ে যায়। মিথ্যা মানুষের জন্য সমস্যা সংকট ও ভয় ডেকে আনে। মানবহূদয়ে এই দুর্বলতার কারণেই মানুষ বাইরের সবকিছুকে ভয় পায়। উক্ত বাক্য দ্বারা লেখক এটাই বুঝিয়েছেন।
৩। ‘আত্মাকে চিনলেই আত্মনির্ভরতা আসে।’ - ব্যাখ্যা করো।
উত্তর:সত্য জানা ও আত্মশক্তির বিকাশের মাধ্যমে আত্মনির্ভরতা আসে। অন্যের ওপর নির্ভর বেঁচে থাকাকে বলা হয় পরনির্ভরতা। যার নিজের শক্তির ওপর বিশ্বাস নেই, যে আত্মশক্তি ও সত্যকে জানে না সে-ই পরনির্ভর। লেখকের মতে, পরনির্ভরশীলতাকে বর্জন করতে হলে নিজের সত্যকে জানতে হবে, নিজের শক্তির ওপর আস্থা স্থাপন করতে হবে। আর তা হলেই মানুষ হয়ে উঠবে আত্মনির্ভরশীল। এভাবেই আত্মনির্ভরতা আসে।