প্রশান্ত কুমার বসাক
আমাদের দেশের প্রায় ২০ ভাগ শিশু কেজি স্কুলগুলোতে লেখাপড়া করছে। প্রতিটি উপজেলায় গড়ে প্রায় ৩০ থেকে ৪০টি কেজি স্কুল রয়েছে। আমাদের সমাজের শিশু শিক্ষার্থীদের এই বিরাট একটি অংশের শিক্ষা কার্যক্রম কীভাবে চলছে, সেখানে কারা পড়াচ্ছেন, কী পড়াচ্ছেন, তাদের ভালো-মন্দ, সমস্যা-সংকট আছে কি না সেসব বিষয়ে কিন্তু সরকার এখন পর্যন্ত চোখ রাখতে পারেনি। বলার অপেক্ষা রাখে না, শিক্ষা একটি সর্বজনীন এবং গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সমাজেরই একটি অংশের শিশুদের শিক্ষা কার্যক্রমকে কোনো ব্যক্তি বা গ্রুপের হাতে স্বাধীনভাবে ছেড়ে দেওয়া যায় না। কারণ আমাদের দেশের শিশুরা কী শিখবে, কীভাবে শিখবে তার একটা কারিকুলাম বা পাঠপরিকল্পনা আছে। তাই কেজি স্কুলগুলোকে সরকারের মনিটরিং এবং নিয়ন্ত্রণের মধ্যে আনা দরকার।
আগে সরকারের সঙ্গে কোনো সম্পৃক্ততাই ছিল না এই স্কুলগুলোর। সরকারি বইগুলো তারা নিত শিক্ষা অফিসার অথবা সরকারি স্কুলের প্রধান শিক্ষকদের সঙ্গে বিভিন্নভাবে সম্পর্ক স্থাপন করে। কেজি স্কুলগুলো সমাপনী পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে পারত না। কোনো সরকারি স্কুলের মাধ্যমে সমাপনী পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে হতো। সরকার ২০০৯ সাল থেকে তাদের বই দিচ্ছে এবং কেজি স্কুল থেকেই সমাপনী পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করার সুযোগ পাচ্ছে। এর পাশাপাশি এ মুহূর্তে কেজি স্কুলগুলোতে সরকারের আরো কিছু সহায়তা দেওয়া প্রয়োজন। প্রথমত, সরকারি স্কুল শিক্ষকদের চাকরির শুরুতেই এক বছরের পিটিআই ট্রেনিং নিতে হচ্ছে এবং উপজেলা রিসোর্স সেন্টারে ক্রমাগত তাদের প্রশিক্ষণ চলছে। অথচ কোনো ধরনের প্রশিক্ষণ ছাড়াই চলছে কেজি স্কুলগুলোতে পাঠদান। মানসম্পন্ন পাঠদানের ক্ষেত্রে প্রশিক্ষণের কোনো বিকল্প নেই। পিটিআইয়ে না হলেও অন্তত উপজেলা রিসোর্স সেন্টারে একটি শর্ট কোর্স করে কেজি শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা দরকার। দ্বিতীয়ত, সরকারি বইয়ের পাশাপাশি আরো অতিরিক্ত বই পড়ানো হবে কি না অথবা পড়ানো হলেও কোন বই কতটুকু পড়ানো হবে সে বিষয়ে সরকারের হস্তক্ষেপ প্রয়োজন। মান এবং প্রয়োজনীয়তা বিবেচনা না করে অতিরিক্ত বই চাপিয়ে দেওয়ায় শিশুরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে কি না সেটিও দেখা দরকার। তৃতীয়ত, প্রাইমারি স্কুল ম্যানেজিং কমিটির মতোই কেজি স্কুলগুলোতে কমিটি থাকা দরকার। নিয়মিত কমিটি থাকলে তারা মনিটরিংয়ে সহায়তা করতে পারবে। চতুর্থত, প্রাথমিক শিক্ষায় উপকরণ একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। অনেকবার পড়ে একটি বিষয় শিশুর মধ্যে যতটা প্রভাব না ফেলে একটি উপকরণ দেখলে শিশুমনে তার চেয়ে অনেক বেশি রেখাপাত করে। সরকারি স্কুলে বিশেষ করে শিশু শ্রেণিতে উপকরণ ক্রয়ের জন্য সরকার বিশেষ বরাদ্দ দেয়। অন্যদিকে কেজি স্কুলগুলোতে প্রায় উপকরণবিহীন পাঠদান চলছে। কাজেই শিশুদের প্রয়োজনীয় শিক্ষা উপকরণ কেজি স্কুলগুলোতে আছে কি না এবং তা যথাযথ ব্যবহার হচ্ছে কি না এটা শিক্ষা বিভাগের মনিটরিং করা উচিত। উপর্যুক্ত বিষয়গুলো নিশ্চিত করা গেলে আমাদের শিশুরা মানসম্পন্ন শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে দক্ষ ও যোগ্য নাগরিক হয়ে গড়ে উঠবে।
রাণীশংকৈল, ঠাকুরগাঁও