সিলেটের বনগুলোর ঘনত্ব বেড়েছে দেখা মিলছে বিরল প্রজাতির প্রাণীর

করোনাকালে সিলেটের বিভিন্ন বনাঞ্চল ও জাতীয় উদ্যানগুলোতে যেন প্রাণ ফিরে এসেছে। শ্রীমঙ্গলের লাউয়াছড়া, হবিগঞ্জের সাতছড়ি, সিলেট ইকোপার্ক, খাদিম জাতীয় উদ্যানে গত এক বছরে ভ্রমণ পিপাসু মানুষের আনাগোনা না থাকায় প্রকৃতি তার আপন মহিমায় বিকশিত হয়ে উঠেছে। বনের গাছপালার ঘনত্ব বেড়েছে, বেড়েছে প্রাণীর সংখ্যাও। নানা বিরল প্রজাতির উদ্ভিদ ও প্রাণীর দেখা মিলছে। কোনো কোনো বনে মায়া হরিণেরও আনাগোনা দেখা যাচ্ছে। নানা ধরনের পাখির কলতানে মুখর হয়ে উঠেছে প্রকৃতি। শ্রীমঙ্গলে বিলুপ্ত প্রজাতির সাপ পাওয়া গেছে। মালনীছড়াসহ বিভিন্ন চা-বাগানে ধরা পড়ছে অজগর। এগুলো আবার বনবিভাগের লোকজন উদ্ধার করে বনে ছেড়ে দিচ্ছেন। এদিকে বিভিন্ন পর্যটন স্পটে স্থানীয় প্রশাসন লোকজনের আনাগোনা বন্ধ করে               দেওয়ায় বনে নির্জন পরিবেশ বিরাজ করছে, যা বন্য প্রাণীকূলের বংশবৃদ্ধির জন্য সহায়ক।

গত বৃহস্পতিবার পৌর শহরের নতুন বাজার এলাকা থেকে বিলুপ্ত প্রজাতির একটি সাপ উদ্ধার করেন শ্রীমঙ্গলস্থ বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশনের পরিচালক সজল দেব। তিনি  জানান, শ্রীমঙ্গলে কাঁঠাল বোঝাই একটি গাড়িতে সাপটি পাওয়া যায়।  সাপটি সচরাচর দেখা যায় না। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) শিক্ষক মনিরুল এইচ খান জানান, সাপটির ইংরেজি নাম আইডক্যাট স্নেক। এটিকে লাউয়াছড়া বনে অবমুক্ত করা হয়। করোনায় লকডাউনে দুই দফায় প্রায় এক বছর ধরে বন্ধ হবিগঞ্জের সাতছড়ি জাতীয় উদ্যান। নীরব নিস্তব্ধ বনে নানা প্রাণী ঘুরে বেড়াচ্ছে। বৃষ্টিতে নানা জাতের গাছপালা আর লতাপাতায় এখন ভরে উঠেছে সাতছড়ি জাতীয় উদ্যান। বিপন্ন বন যেন ফিরে পেয়েছে প্রাণ।

সাতছড়ি বনে আইইউসিএনের তালিকায় বিপন্ন চশমাপরা হনুমান, লজ্জাবতী বানর, মুখপোড়া হনুমান, উল্লুক, রামকুত্তা, মেছোবাঘ, উড়ন্ত কাঠবিড়ালী, বন মোরগ, বন্যশূকর, ২০০ প্রজাতির পাখি ও শতাধিক প্রজাতির সাপসহ নানা প্রজাতির প্রাণীর বসবাস। মানুষ ঘরে আবদ্ধ থাকায় বনের প্রাণীকূল যেন ফিরে পেয়েছে তাদের রাজত্ব। 

জাবির প্রাণিবিদ্যা বিভাগের প্রভাষক মুনতাসির আকাশ বলেন, সাতছড়িতে ফিরে আসছে বিপন্ন প্রাণীগুলো। বাড়ছে নানা প্রজাতির বন্যপ্রাণী ও পাখির সংখ্যা। প্রকৃতি তার স্বরূপ ফিরে পেয়েছে।

সাতছড়ি উদ্যানের কাছাকাছি ৯টি চা-বাগান রয়েছে, যা প্রকৃতিকে আরো সৌন্দর্যমণ্ডিত করেছে। সাতছড়ি জাতীয় উদ্যানে রয়েছে প্রায় ২০০ জাতের গাছপালা। জীববৈচিত্র্যে ভরপুর এ উদ্যানে ১৯৭ প্রজাতির জীবজন্তু রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ২৪ প্রজাতির  স্তন্যপায়ী, ১৮ প্রজাতির সরীসৃপ, ছয় প্রজাতির উভচর প্রাণী রয়েছে। এখানে পাখির মধ্যে আছে কাও ধনেশ, বনমোরগ, লালমাথা ট্রগন, কাঠঠোকরা, ময়না, ভিমরাজ, শ্যামা, ঝুটিপাঙ্গা ইত্যাদি। চলতি বছরে সাতছড়ি বনে দুজন ফটোগ্রাফারের তোলা দুটি পাখির ছবি আন্তর্জাতিক পুরস্কার লাভ করেছে।

জাতীয় উদ্যানের রেঞ্জ কর্মকর্তা মাহমুদ হোসেন বলেন, উদ্যানে এখন মানুষের পদচারণা না থাকায় পশুপাখির কলতান বেড়েছে। বনে নানা প্রজাতির প্রাণীর অবাধ চলাফেরা দেখা যায়।

বন্যপ্রাণী ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা রেজাউল ইসলাম চৌধুরী বলেন, মাত্র ২৪৩ হেক্টর জমিতে গড়ে ওঠা সাতছড়ি উদ্যানে দেশের বিপন্ন ও বিলুপ্ত প্রজাতির নানা ধরনের প্রাণীর দেখা মিলছে। প্রাণ ফিরে পাচ্ছে পরিবেশ ও প্রতিবেশ।