দীর্ঘ ১৪ বছর পর লাভের ধারায় ফিরেছে দেশের একমাত্র পাথরখনি মধ্যপাড়া গ্রানাইট মাইনিং কোম্পানি (এমজিএমসিএল)। গত দুই বছর ধরে লাভের ধারায় ফিরেছে এই খনি। এর মধ্যে ২০১৮-২০১৯ অর্থবছরে প্রথম বারের মতো লোকসান কাটিয়ে লাভ করে ১১ কোটি ২৬ লাখ টাকা। এরপর ২০১৯-২০২০ অর্থবছরে লাভের অঙ্ক বেড়ে গিয়ে ২২ কোটিতে উন্নীত হয়।
দেশব্যাপী পাথরের চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় খনির উত্পাদন লক্ষ্যমাত্রা আরো বাড়ানোর চিন্তাভাবনা চলছে। করোনা মহামারিতেও শতাধিক বিদেশি বিশেষজ্ঞ ও অর্ধশত দেশি প্রকৌশলীসহ ৭৫০ দক্ষ খনি শ্রমিক কাজ করছেন। বর্তমানে মধ্যপাড়া পাথরখনি থেকে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুত্ কেন্দ্র, পায়রা বিদ্যুত্ কেন্দ্রসহ দেশের সবগুলো মেগা প্রকল্পে পাথর সরবরাহ করা হচ্ছে।
পাথরখনির ব্যবস্থাপনা, উন্নয়ন, উত্পাদন, সংরক্ষণ এবং পরিষেবার কাজে নিয়োজিত বেলারুশের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান জার্মানিয়া ট্রেস্ট কনসোর্টিয়াম (জিটিসি) সূত্রে জানা গেছে, করোনা না থাকলে লাভের অঙ্ক ১০০ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেত। কিন্তু বিদ্যমান মহামারির কারণে আগামী অর্থবছরে লাভের অঙ্ক অর্ধশত কোটি অতিক্রম করবে। অভিযোগ আছে এমজিএমসিএলর অভ্যন্তরীণ একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেটের ব্যাপক অনিয়ম-দুর্নীতি আর কমিশন বাণিজ্যের কারণে খনিটি লাভ করতে পারেনি। দীর্ঘ সময়ে খনিটি প্রায় ৫৬৫ কোটি টাকা লোকসান গুনেছে।
উল্লেখ্য, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের শাসনামলে ১৯৭৩-১৯৭৫ সালে বাংলাদেশ জরিপ অধিদপ্তর (জিএসবি) দিনাজপুর জেলার মধ্যপাড়া এলাকায় ১২৮ মিটার গভীরতায় কঠিন শিলা আবিষ্কার করে। এরপর ১৯৯৪ সালের ২৭ মার্চ খনি উন্নয়নের লক্ষ্যে উত্তর কোরিয়ার মেসার্স কোরিয়া সাউথ কো-অপারেশন করপোরেশনের (নামনাম) সঙ্গে একটি চুক্তি করে সরকার। নামনাম কর্তৃপক্ষ খনির উন্নয়ন কাজ শেষ করলেও নানা অনিয়ম-দুর্নীতি আর কমিশন বাণিজ্যের কারণে দীর্ঘদিন পাথর উত্তোলন শুরু করতে পারেনি কোম্পানি। শেষ পর্যন্ত কয়েক দফা ব্যয় বৃদ্ধির পর ২০০৭ সালের ২৫ মে নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় পাথর উত্তোলন কাজ শুরু করে এমজিএমসিএল।
এরপর ২০১৩ সালের ২ সেপ্টেম্বর খনি ব্যবস্থাপনা, উন্নয়ন, উত্পাদন, সংরক্ষণ এবং পরিষেবার জন্য বেলারুশের কোম্পানি জার্মানিয়া ট্রেস্ট কনসোর্টিয়ামকে (জিটিসি) দায়িত্ব দেওয়া হয়। এ নিয়ে এমজিএমসিএলের সঙ্গে জিটিসির ছয় বছর মেয়াদি একটি আন্তর্জাতিক চুক্তি হয়। জিটিসি ২০১৪ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি থেকে পাথর উত্পাদন শুরু করে। কিন্তু কাজ শুরু করতে গিয়ে দেখা যায় খনিটির বেশির ভাগ যন্ত্রপাতি অচল। এই অবস্থায় বন্ধ হয়ে যায় খনির কাজ। বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, এমজিএমসিএলের নানা প্রতিবন্ধকতা, ড্রয়িং-ডিজাইন অনুমোদন না করা এবং মালামাল ও যন্ত্রপাতি আমদানির অনুমতি না দিয়ে ৪৭ মাস বসিয়ে রাখা হয়েছিল জিটিসিকে। এমনকি তাদের পাওনা বিল পর্যন্ত আটকে রাখা হয়েছিল তিন বছর।
জিটিসি সূত্র জানায়, এসব কারণে তারা পুরো চুক্তির মেয়াদ পর্যন্ত নিরবচ্ছিন্নভাবে খনির উন্নয়ন ও পাথর উত্তোলন করতে পারেনি। এখন জিটিসি তিন শিফটে প্রতিদিন খনি থেকে পাথর উত্তোলন করে যাচ্ছে।
এটি খনির উত্পাদন ইতিহাসে নতুন রেকর্ড বলেও জানান জিটিসির চেয়ারম্যান ড. মো. সিরাজুল ইসলাম কাজী। তিনি বলেন, প্রতিদিন তিন শিফটে ৫ হাজার ৫০০ মেট্রিক টন পাথর উত্তোলনের যে লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে খনিটি চালু করা হয়েছিল সেটি অতিক্রম করে এখন এক দিনে তিন শিফটে ৬ হাজার মেট্রিক টন পর্যন্ত পাথর উত্তোলন করছেন তারা। এটি আরো বাড়ানোর চিন্তাভাবনা রয়েছে । তার মতে চুক্তি অনুযায়ী তাদের মেয়াদের নির্ধারিত সময়ের তিন মাস আগেই লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী ১ দশমিক ১ মিলিয়ন টন পাথর উত্পাদন ও আরো দুইটি নতুন স্টোপ নির্মাণ কাজ শেষ করতে পারবেন।
মধ্যপাড়া পাথরখনির ব্যবস্থাপনা পরিচালক এ বি এম কামরুজ্জামান বলেন, করোনার কারণে কিছুদিন বন্ধ থাকার পর এখন পুরোদমে উত্পাদন চলছে। স্বাস্থ্যবিধি মেনে সব শ্রমিককে কাজে লাগানো হয়েছে।