ধানমন্ডি ২৭ নম্বর রোডে আমান সাহেবের বাসায় পৌঁছতে পৌঁছতে তার বিকাল গড়িয়ে যায়। সজল আচার্য্যকে দেখে আমান চৌধুরী নিজেকে ধরে রাখতে পারেন না। বুকে জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভেঙে পড়েন। গণেশের সঙ্গে ছেলেবেলায় কাটানো সময়ের কথা বলতে গিয়ে স্মৃতিকাতর হয়ে পড়েন। নিজেকে সামলে নিয়ে সজল বাবু বলেন, ‘আপনাদের কাছে আমার বাবার ছবি আছে শুনলাম। ছবিটা দেবেন? দেখব বাবা কেমন ছিলেন।’ বলতে গিয়ে গলাটা ধরে আসে তার।
আমান সাহেব পুরোনো অ্যালবামটা নিয়ে আসেন। একটা পুরোনো সাদা-কালো ছবি অ্যালবাম থেকে খুলে সজল বাবুর হাতে দেন। মায়ের মুখে বাবার অনেক গল্প শুনেছেন সজল। মনে মনে বাবার একটা ছবি এঁকেছেন বহুবার। কিন্তু সে তো কল্পনা। গণেশ আচার্য্য যখন স্কুলে ক্লাস ফোর বা ফাইভের ছাত্র, শহর থেকে পরিবারের সবাইকে নিয়ে গ্রামে বেড়াতে এসেছিলেন শরীফ চৌধুরীর পরিবার। এ গ্রামেরই সন্তান তিনি, ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করে ঢাকা শহরে বড় চাকরি করতেন। শরীফ চৌধুরীর একটা ক্যামেরা ছিল। রাজেন্দ্র কবিরাজের ছেলে গণেশ আর শরীফ চৌধুরীর ছেলে আমান ছিল প্রায় সমবয়সী। গণেশকে নিয়ে আমান গ্রামের বিভিন্ন জায়গায় ঘুরত। ওদের বন্ধুত্ব গড়ে উঠেছিল এভাবেই। শরীফ চৌধুরী একবার গণেশের কয়েকটি ছবি তুলেছিলেন। আমান আর গণেশ পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে ধানখেতের পাশে, পুকুরপাড়ে, স্কুলের মাঠে। শরীফ চৌধুরী শহরে গিয়ে ছবিগুলো ওয়াশ করে পাঠাবেন বলেছিলেন। কিন্তু নানা ব্যস্ততার কারণে আর পাঠানো হয়নি।
দুজন কিশোর হাত ধরাধরি করে গ্রামের ধানখেতের পাশে দাঁড়িয়ে। দুই কিশোরের একজন তার বাবা গণেশ আচার্য্য। অনেকদিনের পুরোনো সাদা কালো ছবি। মলিন হয়ে গেছে। চেহারা খুব ভালো করে দেখাও যায় না। আবছা দেখা যায়। নষ্ট হয়ে যাওয়া ছবিটাতে তার বাবা রয়েছেন। হোক না তার কিশোরবেলার ছবি। তবু তো একটা স্মৃতি। ছেলেবেলায় তার বাবা দেখতে কেমন ছিলেন ছবিটা দেখে একটা ধারণা পাওয়া যায়। বাবাকে দেখার সুযোগ পেয়ে মনটা অন্যরকম আনন্দে ভরে ওঠে সজল বাবুর।
একাত্তরের সেই উত্তাল সময়ের কথা। দেশজুড়ে চলছে মুক্তিযুদ্ধ। গ্রামের স্কুলে মাস্টার গণেশের বউ মালতি তখন সন্তানসম্ভবা। প্রথম সন্তানকে নিয়ে তারা কত স্বপ্নের জাল বুনছেন। ছেলে হলে কী হবে আর মেয়ে হলে কী হবে, এইসব। কিন্তু সেই সন্তানের মুখ দেখে যেতে পারেননি বাবা গণেশ আচার্য্য। মাঠে সারি করা মানুষদের ব্রাশ ফায়ার করে মেরেছিল পাকিস্তানি সৈন্যরা। মুক্তিযুদ্ধে শহিদ হয়েছেন এমন অনেক বাবার সন্তান যারা যুদ্ধের পর স্বাধীন বাংলাদেশে জন্ম নিয়েছেন তাদের একজন সজল আচার্য্য। বাবাকে না দেখার এক ধরনের আক্ষেপ, হাহাকার এতদিন পুষে আসছেন হূদয়ের গভীরে।
বাবার কিশোরবেলার ছবিটা স্পর্শ করতে মনটা ভরে ওঠে অনেক বড় কিছুর প্রাপ্তির আনন্দে। তার চোখ বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ে অবিরাম। নিজেকে ধরে রাখতে পারেন না সজল বাবু। হাউমাউ করে কান্নায় ভেঙে পড়েন। জন্মের পর থেকে বাবাকে না দেখা এক সন্তান বাবার ছবি পেয়ে যেন পুরো পৃথিবী হাতের মধ্যে পেয়েছে। অনেক উচ্ছ্বাস, আবেগ, আনন্দ তার চোখেমুখে। তাকে দেখে আমান চৌধুরীও নিজেকে সামলাতে পারেন না। তার চোখ বেয়েও অশ্রুধারা গড়িয়ে পড়ছে তখন।