এই সময়ের ছড়া

কোনো এক বাবার জন্য

জানালার শিকে মরিচা পড়েছে সেই শিকে হাত রেখে

দূরের আকাশে মেঘেরা ভাসছে, ষাটোর্ধ চোখে দেখে।

দু’চোখের আলো ক্ষীণ হয়ে গেছে আবছা আবছা লাগে

তবু মেঘ দেখা পুরোনো স্বভাব, দেখার ইচ্ছে জাগে।

মনে পড়ে যায় আহা শৈশব, ঘুড়ি ওড়ানোর ক্ষণ

দুটি চোখ ভেজে এই বয়সেও কেমন করে যে মন।

বাড়ল বয়স, পড়াশোনা শেষ, চাকরিতে ঢুকে পড়ে

মা’র পছন্দ শেফালি নামের মেয়েটি আসলো ঘরে।

নতুন জীবন আবেদ আলীর, ঘরে সংসারি বউ

নিয়মে বাঁধল ঘরখানি তার সুখ করে মউমউ।

উড়নচন্ডি স্বভাবে আবেদ, পরিবর্তন আসে

বছর যেতেই ছেলে হলো এক অগ্রহায়ন মাসে।

সে কী আনন্দ, ঘর জুড়ে আহা, যায় ভোলা সেই দিন!

স্মৃতির পাখিরা উড়ে উড়ে আসে বুক করে চিনচিন।

নাম রাখা হয় পলাশ ছেলের, আদরে বাড়তে থাকে

বাড়ি ফিরলেই কোলেপিঠে করে বাবা চোখে চোখে রাখে।

ক্যালেন্ডারের পাতা উল্টায় এক দুই তিন করে

পলাশ তখন প্রথম শ্রেণিতে একের নামতা পড়ে।

শেফালি হঠাত্ দু’দিনের জ্বরে জীবনের ইতি টানে

আকাশ ভাঙল আবেদ আলীর বুকের মধ্যিখানে।

সেই শুরু হয় নতুন জীবন,পলাশের বেড়ে ওঠা

রান্নাবান্না স্কুলে পাঠিয়ে নিজ চাকরিতে ছোটা।

বুকের ভেতরে পলাশকে নিয়ে বেড়ে ওঠে স্বপ্নেরা

করল না বিয়ে, হলো না হলো না সংসারে আর ফেরা।

একুশ বছর এমনি কেটেছে, পলাশ করেছে বিয়ে

বাবাকে ভুলেছে, ব্যস্ত এখন ঘর সংসার নিয়ে।

ছেলের জন্য একটা জীবন একাই করল পার

আবেদ আলীর মনে পড়ে শুধু শেফালির সংসার।

মিঠে খুনসুটি হাসিতামাশায় কেটেছে বিকেল কত

পলাশ বাবার কোলে উঠে শুধু বায়না ধরেছে শত।

ছেলের বায়না করেছে পূরণ হায়রে আবেদ আলী

বৃদ্ধাশ্রমে চলছে জীবন, দিয়ে শুধু জোড়াতালি।

মনে পড়ে ফের পলাশের কথা বাবার কাঁধেতে চড়ে

গলির মোড়ের চায়ের দোকানে যেত প্রতিদিন ভোরে।

বাবা চা খেতেন, পলাশ দেখত আহারে কি সেই দিন

ছুটির দিনটা পার্কে বেড়ানো ছিল কত না রঙিন।

নিজ পছন্দে বিয়েটা করেছে অমত করেনি বাবা

সংসারে থাকে কত না হিসেব মারল সেটাই থাবা

বউয়ের কথায় পলাশের দিনরাত্রি এখন কাটে

বৃদ্ধাশ্রমে, সামনের ছোট মাঠে বাবা একা হাঁটে।

জানালার এই শিক ধরে ধরে কত না কিছুই ভাবে

কবে যে পৃথিবী ছেড়েছুড়ে শেষে শেফালির কাছে যাবে।

ছেলের জন্য শেফালিকে ভেবে একটা জীবন পার

করল আবেদ, প্রাপ্তি এখন বৃদ্ধাশ্রম তার।