কবে লাভজনক হবে দেশের চলচ্চিত্র শিল্প?

তানভীর তারেক

 

সিনেমা হলের আদৌ প্রয়োজন আছে কী? চলচ্চিত্রের লগ্নি ও বাণিজ্যিক কার্যক্রম, আগামী বছরগুলোতে কী শুধুমাত্র সিনেমা হল থেকে প্রাপ্ত আয়ের ওপরই আদৌ নির্ভর করবে? সিনেমা হলকে ঢেলে সাজানোর কী এখনই সময়? এমন নানা প্রশ্নই গত কয়েকবছর ধরে ঘোরপাক খাচ্ছে শিল্পী কলাকুশলীদের ভেতরে। করোনার এই বিগত ২ বছরে সেই চিন্তা আরো প্রকোপ আকার ধারণ করেছে। কারণ বিশ্ব চলচ্চিত্র বাজার তাদের নিজেদের অঙ্ক বদলে ফেলেছে এরইমধ্যে!

বন্ড সিরিজ থেকে শুরু করে মিলিয়ন ডলারের একাধিক প্রজেক্ট যখন নেটফ্লিক্স, অ্যামাজন, এইচবিও ম্যাক্স কিনে যে যার পকেটে পুড়ছে তখন সিনেমা হল আগামীতে অতিবিলাসে সময় কাটানোর বিশেষ একটি ক্ষেত্র হয়েই দাঁড়াবে। অনেকটা জাদুঘর ও দামি পার্কের মতো। অর্থাত্ বিলুপ্ত হবে না ঠিকই। কিন্তু সিলেক্টিভ হয়ে যাবে। এখন যেমন এত এত গেমিং খেলার পরও বিস্তৃত ডিজিটাল পার্কে যায় শিশু-কিশোররা। সিনেমা হলটিও তেমন একটা অবস্থানে চলে যাচ্ছে। উল্লেখ্য, বাংলাদেশে গত ১০ বছর ধরে শতকরা ৫ ভাগ ছবির লগ্নি ফিরে পেয়েছেন স্ব-স্ব প্রযোজক! সেটিও অনেক ক্ষেত্রে নানা অঙ্কের মারপ্যাচে!

তাই তরুণ অভিনেতা, নির্মাতা সকলেই এর মর্ম বুঝে সেদিকে ঝুঁকছেন। শীর্ষ অভিনয়শিল্পীরাও এখন ‘সিনেমা’ শব্দটিকে আলাদা করে দেখছেন না। বরং গুরুত্ব দিচ্ছেন বেশি সাবস্ক্রাইবার যুক্ত উন্নত পেশাদার কোনো ওটিটি প্লাটফর্মকে। কিছুদিন আগে একটি আড্ডায় দেশের শীর্ষ অভিনেতা চঞ্চল চৌধুরী বলেন, ‘এখন ওটিটি প্লাটফর্মের কাজগুলো অনেক গোছানো, পেশাদার মনোভাবের এবং একইসঙ্গে মানসম্পন্ন হয়। তাই প্রকৃত অভিনয়শিল্পীদের সময় এখন নিজেদের প্রকাশ করার। শুধু হল নির্ভরতায় এখনকার প্রযোজকদের থাকাটাও উচিত নয়।’

অন্যদিকে সিনেমা হলের পরিবেশ কবে সুস্থ-স্বাভাবিক হবে, সেই অপেক্ষার দিন গুনতে গুনতে একাধিক চলচ্চিত্র তাদের চলতি সময়ের লুক হারিয়ে ফেলছে। শাকিব খানের প্রায় ৪টি সিনেমা মুক্তির প্রস্তুতি নিয়েও তা প্রকাশ পাচ্ছে না এই সিনেমা হল নির্ভরতায়। তাই মাঝে মাঝে অমুক সিনেমার জন্য অমুক হল খুলছে, এত বছর পর এ ধরনের খবর যেন প্রশান্তির সুবাতাসের মতো। আদতে দীর্ঘমেয়াদি বাণিজ্যিক পরিকল্পনা করতে হলে এখন বিকল্প উপায়েই লগ্নি থেকে লাভের হিসেব গুনতে হবে। তাই দেশে বিদেশে সকল নির্মাতাই এখন ঝুঁকছেন ওয়েব সিরিজে, কিংবা সিনেমাতে কাজ করলেও আগে থেকে ডিজিটাল কপিরাইটের হিসেব কষে তবেই মাঠে নামছেন তারা। নির্মাতা অনন্য মামুন বছরে এক ডজনেরও ওপরে ছবি নির্মাণের ঘোষণা দিয়েছেন। সেভাবে কাজও শুরু করে দিয়েছেন। অনন্য মামুন বলেন, ‘কাজ করলে ইন্ডাস্ট্রি বাঁচবে। তাই কাজ করে যাচ্ছি। পুরোপুরি সফল হবো এটা তো বলিনি। কিন্তু চেষ্টা আছে শতভাগ। আর এখনকার ওটিটি নির্ভরতা তো প্রযুক্তির বিবর্তন। একে অস্বীকার করাটা বোকামি। তাই সেভাবেই কাজ করে যাচ্ছি।’

নির্মাণ ও প্রকাশের ব্যবস্থাপনায় নির্মাতা অনন্য মামুনকে নিয়ে অনেকরকম বিতর্ক রয়েছে। কিন্তু এই প্রচলিত রীতিতে তার ছবি নির্মাণের প্রক্রিয়াকে কেউ অস্বীকার করবে না। তাই মিশা সওদাগর, নিরব, ইমন, রোশান, মিথিলা থেকে শুরু করে সকলেই তার প্রডাকশনে কাজ করতে আগ্রহী হচ্ছেন ক্রমশ।

শুধু অনন্য মামুন নয়, অমিতাভ রেজা চৌধুরী থেকে শুরু করে প্রসিদ্ধ নির্মাতারাও এখন ডিজিটাল কপিরাইটের মুনাফা চূড়ান্ত করেই মাঠে নামছেন। এবারে সরকারি অনুদান প্রাপ্ত ছবির নির্মাতা অরুণ চৌধুরী বলেন, ‘আমি মনে করি সময়কে অস্বীকার করা বোকামি। এই যে রাষ্ট্র একটি ভালো কাজ করার জন্য আমাকে বাছাই করেছে। বিগত বছরগুলোতে অধিকাংশ অনুদানের ছবিতে লোকশান দেখিয়েছেন অধিকাংশ নির্মাতা। আমি চাই সময়কে ধরে রেখেই ছবিটি থেকে একটি মুনাফা তৈরি করে পরবর্তী ছবির জোগান দিতে। অন্যান্য কমার্শিয়াল নির্মাতার ক্ষেত্রেও এটিকে গুরুত্ব দেওয়া উচিত বলে আমি মনে করি।’ তাই সকলের মনেই একটি প্রত্যাশা ও প্রার্থনা, কবে এই চলচ্চিত্র লাভজনক শিল্পে পরিণত হবে?

 

বর্তমান সময়ে যে যে উপায়ে একটি চলচ্চিত্র থেকে আয় হতে পারে

n সিনেমা হলে প্রদর্শন (যত্সামান্য আয় হলেও তা ঝুঁকিপূর্ণ)

n গানের স্বত্ত্ব বিক্রি

n টিভি চ্যানেলে ওয়ার্ল্ড প্রিমিয়ারের (১ বার প্রদর্শনের জন্য) মাধ্যমে

n এয়ারলাইন্সসহ (অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক) বিভিন্ন পরিবহন মাধ্যমের সঙ্গে প্রদর্শনের স্বত্ত্ব বিক্রি করে

n সিনেমার বিভিন্ন সিকোয়েন্সে প্রডাক্ট ক্যাম্পেইন

n ডিজিটাল পোস্টার স্পন্সর

n ডিজিটাল কপিরাইট বিক্রি

n প্রফেশনাল একাধিক স্ট্রিমিং প্লাটফর্মে ছবির সঙ্গে চুক্তি গড়ে

n ছবির তারকাদের সঙ্গে চুক্তি করে একাধিক প্রডাক্টের ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডর নিয়োগের মাধ্যমে