দেশের তরুণ প্রজন্মের কাছে বাসযোগ্য শহর আর দূষণমুক্ত পরিবেশ তৈরিতে অংশীদার হওয়ার এখনই উপযুক্ত সময়। বৃক্ষরোপণ এবং তার সঠিক পরিচর্যায় শহরের প্রতিটি ছাদে তৈরি হোক এক
একটি ঝুলন্ত উদ্যান
ইট, কাঠ আর পাথরে ঘেরা শহুরে সভ্যতায় একখণ্ড ‘সবুজ’ ধরে রাখার ক্ষুদ্র প্রয়াসই হলো ছাদবাগান। বর্তমান প্রেক্ষাপটে ছাদবাগানের জনপ্রিয়তা ও গুরুত্ব বাড়লেও এর ধারণা কিন্তু নতুন নয়। ধারণা করা হয়, ইতিহাসের ‘ব্যাবিলনের ঝুলন্ত উদ্যান’ও ছিল ছাদ আর বারান্দার সমন্বয়ে তৈরি। কালের বিবর্তনে সেই ছাদবাগান এখন অনেক সবুজপ্রেমী মানুষের শখের খোরাক, অবসরের সঙ্গী কিংবা মনকে প্রফুল্ল করার উত্স, যা একই সঙ্গে পরিবেশের ভারসাম্য নিয়ন্ত্রণেও রাখতে পারে সহায়ক ভূমিকা। বৈশ্বিক মহামারির এই সময়টাতে পুরো বিশ্ব যখন বন্দি, নিতান্ত শখের বশে তৈরি এক টুকরো ছাদবাগান অনেকের কাছেই এক টুকরো মানসিক প্রশান্তি।
জীবিকার তাগিদে শহরমুখী হচ্ছে মানুষ। গড়ে তুলছে বসতি। ফলে বাড়ছে কলকারখানা, বাড়ছে দূষণ। এক জরিপে দেখা গেছে, শহরের মোট জায়গার ৬০ শতাংশ স্থান দখল করে রেখেছে ফাঁকা ছাদ। ভূমিতেও নেই পর্যাপ্ত বনায়ন সৃষ্টির সুযোগ, যা শহরের তাপমাত্রা বৃদ্ধির প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। একই সঙ্গে বাড়িয়ে দিচ্ছে ভূমিকম্প, ঘূর্ণিঝড়, অনাবৃষ্টির মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের আশঙ্কা। এক্ষেত্রে পরিবেশের ভারসাম্য ফিরিয়ে আনতে ছাদবাগানের বিকল্প নেই। গবেষকেরা বলছেন, ছাদে বাগান করলে সেই গাছ পরিবেশের অতিরিক্ত তাপ শোষণ করে নিতে পারে এবং প্রস্বেদন প্রক্রিয়ায় পানিকে জলীয়বাষ্প আকারে বের করে দিয়ে তাপমাত্রা কমিয়ে আনতে সহায়ক। শুধু তাই নয়, পরিবেশ থেকে কার্বন ডাই-অক্সাইডের মাত্রা কমানো এবং অক্সিজেন উত্পাদনের ‘কারখানা’ হিসেবে ব্যবহূত হতে পারে শখের এই ছাদবাগান।
বিগত কয়েক দশকে নিজ গৃহে সবুজের ছোঁয়ায় শৌখিনতা বজায় রাখতে কিংবা প্রাকৃতিক ভারসাম্যের কথা চিন্তা করে শহরে ছাদবাগান তৈরির প্রবণতা বেড়েছে চোখে পড়ার মতো। হাজারো গাছপ্রেমী নিজ গৃহে গড়ে তুলেছেন ছাদকৃষির মতো প্রশংসনীয় প্রকল্প। এমনকি ছাদবাগান তৈরিতে উত্সাহিত করতে, ১০ শতাংশ হোল্ডিং ট্যাক্স মওকুফেরও উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে যে কেউ এই অবসরে তৈরি করে ফেলতে পারেন ছোট্ট এক ছাদবাগান, যা সময় কাটানোর পাশাপাশি পরিবারের সদস্যদের পুষ্টির চাহিদা মেটাতেও ভূমিকা রাখতে পারে। আবার প্রতি বছর দেশের বিভিন্ন স্থানে উদ্যাপিত হয় বৃক্ষমেলা। মেলায় বিক্রি হওয়া গাছের অধিকাংশই বাড়ির সিঁড়ি, জানালা কিংবা ছাদের শোভাবর্ধক হিসেবে ব্যবহূত হয়, যা বলে দেয় মানুষ এখন নিজ গৃহে সবুজের ছোঁয়া ধরে রাখত অনেকটাই উত্সাহী হয়েছে।
ছাদবাগান শুধু পরিবেশসহায়ক ভূমিকা পালন করে তা নয়; যান্ত্রিকতার এই যুগে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে একসাথে বাগান পরিচর্যা কিংবা তাদের সঙ্গে সময় কাটানোর এক উপযোগী মাধ্যম হিসেবে কাজ করতে পারে এই ছাদবাগান। করোনা মহামারির এই সময়টাতে যখন পরিবারের অনেক ব্যস্ত সদস্য পেয়েছে এক টুকরো অবসর, ছাদবাগান তৈরির মাধ্যমে হোক সেই সময়ের সঠিক মূল্যায়ন। এতে করে দীর্ঘদিন কর্মবিরতি তাদের মধ্যে যে মানসিক চাপের জন্ম দিয়েছে, তা অনেকটাই লাঘব হবে বলে আশা করা যায়। পাশাপাশি তাদের সময় কাটবে সঠিক সঙ্গে। দেশের তরুণ প্রজন্মের কাছে বাসযোগ্য শহর আর দূষণমুক্ত পরিবেশ তৈরিতে অংশীদার হওয়ার এখনই উপযুক্ত সময়। বৃক্ষরোপণ এবং তার সঠিক পরিচর্যায় শহরের প্রতিটি ছাদে তৈরি হোক এক একটি ঝুলন্ত উদ্যান।
ইট-পাথরের মাঝে বেড়ে ওঠা দেশের ভবিষ্যত্ প্রজন্ম যাতে গাছ, মাটি কিংবা প্রকৃতির সংস্পর্শে নিজ শেকড়কে অনুসন্ধান করতে পারে, সেই লক্ষ্যে ছাদবাগান তৈরির কোনো বিকল্প নেই। শুধু নিজ গৃহে নয়, কর্মক্ষেত্র কিংবা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ফাঁকা ছাদ কাজে লাগিয়ে সম্মিলিতভাবে তৈরি করা যেতে পারে ‘ছাদবাগান’, যা ভবিষ্যতে অনেকের কাছে অনুকরণীয় এক প্রকল্প হতে পারে। আর তা বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে প্রকৃতি হয়তো আবার ফিরে পাবে তার সেই চিরচেনা রূপ। বৈশ্বিক মহামারিতে ঘরবন্দি এই সময়টাকে কাজে লাগিয়ে তৈরি হোক হাজারো ছাদবাগান, যাতে বন্দিদশার তিক্ততা জীবনকে গ্রাস করার আগেই ছাদবাগানের এক টুকরো সবুজের হাতছানি পুলকিত করে হূদয়ের অন্তস্থল। শহুরে ছাদগুলো ভরে উঠুক ফুলে, ফসলে। সবুজ ছড়িয়ে পড়ুক প্রাণে-প্রাণে।
n লেখক :শিক্ষার্থী, নর্থ-সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা