চিত্রকলা

শাকিলা খান চয়নের ১০১ বঙ্গবন্ধু

 

শিল্প সৃষ্টির অনুধ্যান উচ্চ মার্গের সুর ছন্দের মহিমা প্রকাশ করে। শিল্প অন্তরের রূপকে বহিরঙে পৌঁছে দেয়। শিল্পীর অন্তরে জন্মে যাওয়া সৃষ্টি সব সময়েই প্রসব বা প্রকাশের জন্য ব্যগ্র হয়ে থাকে।

এদেশের মানুষ ব্রিটিশ ঔপনিবেশিকতার শিকল ছিন্ন করলেও পাক শোষণ-নিপীড়নের শিকলে আটকে পড়ে। জাতির পিতার নির্দেশে সেই পাক হানাদার বাহিনীর অত্যাচার, জুলুম, অবিচারের শাসন শোষণের বিরুদ্ধে লড়ে যান এদেশের নিরস্ত্র মানুষ। সেই ঐতিহাসিক ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে আজ আমরা স্বাধীন সার্বভৌম দেশ অর্জন করেছি। যুদ্ধ বিগ্রহ, গণহত্যা, ধর্ষণ, লুটপাট চারিদিকে জীবন-মরণের লড়াইয়ের মাঝে বীরদর্পে ঐ সময়ে জন্মে নেওয়া শিল্পী শাকিলা খান চয়ন। তিনি মাতৃজঠরে যুদ্ধের দামামা, বোমা, গোলাগুলির আওয়াজ, মানুষের আর্তনাদ, হাহাকার শুনতে পান। সেই শাকিলা অন্তর্জাত রণাঙ্গনের সাক্ষী হয়ে পৃথিবীতে নেমে আসেন।  শিল্পালোকের দীপ্তিতে শিল্পী শাকিলা এমন একজনকে চিত্রান্তর্গত করেছেন যিনি স্বাধীন বাংলাদেশ গড়ার স্থপতির দায়িত্ব নিয়েছিলেন-  হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালী; জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। শিল্পী শাকিলার ছবি নিয়ে আজকের লেখার প্রণিধানযোগ্য, চিত্রকলায় বঙ্গবন্ধু। দেখলে মনে হয় অদম্য ইচ্ছা তাড়িত করছেন বঙ্গবন্ধুকে খুঁজে পেতে। চেয়েছেন চিত্রভূমিতে জাতির জনকের অনুপুঙ্খ বিশে­ষণ। তাঁর  জীবনের প্রথম একক অনলাইন প্রদর্শনীর শিরোনাম ‘আমি একাত্তর বলছি।’ এই প্রদর্শনীটি বঙ্গবন্ধুর শতবর্ষ উপলক্ষে করা, যদিও বঙ্গবন্ধুর শতবর্ষ পেরিয়ে একশত এক হয়ে যাওয়ায় একশত একটি ছবি হয়।

এই প্রদর্শনীর শিল্পালোচনা করতে গেলে প্রতিটি ছবির গল্পকথন তুলে আনতে হয়। যেমন- সংগ্রাম শিরোনামের পেন্সিলে আঁকা  ছবিতে আছে বজ্রকণ্ঠের ডাক। তর্জনির গর্জন আছে। ঘুমন্ত বাঙালীকে জাগিয়ে তুলছেন বঙ্গবন্ধু, সংগ্রামে নেমে পড়বার জন্য। কবি ছবিতে দেখা যাচ্ছে কাব্যময়তা ও ভাববাদীতার প্রকরণ। সত্যি আমাদের বঙ্গবন্ধু মানবতার কবি। তাই তো ৭ই মার্চের ভাষণ অমর কবিতা হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছেন। শিল্পী এখানে কবিকে  আদর্শ প্রতিকৃতির মতো হিসেব নিকেশ বুঝুয়ে দেয়নি। বাস্তবানুগ চিত্র থেকে একটু সরিয়ে নিয়ে এসেছেন কবিতার পঙক্তিতে। কবিতা যেমনটি হয় অপরস্ফুিট তেমনটি বিধৃত করেছেন।

একটি ছবিতে দেখা যাচ্ছে- একটি চশমা, সাথে দুটি চোখ দিয়ে শিল্পী বোঝালেন স্বপ্ন। হ্যাঁ সত্যি তাই, তিনি এদেশে সোনার বাংলা গড়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন। তার আগেই ১৫ আগস্টের ভয়াল রাতে পাকিস্তানি দোসর বা স্বাধীনতার বিপক্ষের শক্তি ঘাতকের গুলির আঘাতে ক্ষতবিক্ষত হয়ে যায় সেই স্বপ্ন। স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের ছবিতে বাস্তবানুগ চিত্রশৈলীর উদাত্ত আহবান রয়েছে। এমনকি পেন্সিল চালানোর সংবরণ লক্ষনীয়। উপরন্তু পেন্সিল চালাতে গিয়ে বঙ্গবন্ধুর ঘাড়ে ফুলের মালার সাদা ফুলগুলোর শুভ্রতা হারায়নি। আরেকটি ছবিতে জাতির পিতার কাছে বসে আছে তাঁর স্ত্রী ও সর্ব কনিষ্ঠ আদরের সন্তান শেখ রাসেল। শিল্পী আনুভূমিক চিত্রতলটিতে ঈষত্ টোনের আলিঙ্গনে মহানায়কের অসুস্থতার ব্যাখা দিয়েছেন। তাঁর ব্যাখ্যার মর্মবাণী হচ্ছে এই সদ্য গড়া বাংলাদেশ অসুস্থ হতে পারে না। পাকিস্তানের বন্দীদশা থেকে মুক্তি পেয়ে অবিসংবাদিত নেতা ও মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের মাটিতে প্রত্যাবর্তন করবার সময় পথিমধ্যে  লন্ডনে যান। সেখানে ব্রিটিশ সাংবাদিকদের নানা প্রশ্নের জবাবসমূহ শিল্পী শাকিলা তুলিস্ত করেছেন। এই প্রতিকৃতিতে দেশের মুক্তিকামী মানুষের কাছে যতদ্রুত সম্ভব আসবার জন্য যে তাড়না  সেটির পারঙ্গমতা দেখিয়েছেন।

শিল্পী শাকিলা খান চয়ন একশত একটি বঙ্গবন্ধুর বিভিন্ন সময়ের  ছবি এঁকেছেন পেন্সিল ও অ্যাক্রেলিক মাধ্যমে।  বাংলাদেশের মানচিত্র না এঁকে  এঁকেছেন বঙ্গবন্ধুকে, তাঁর প্রতিকৃতি বা অবয়বে আমরা লাল সবুজের পতাকা এবং মা মাটি দেশকে খুঁজে পাই।

শিল্পী নানাভাবে জাতির জনকের দর্শন, আদর্শকে খুঁজে পেতে চেয়েছেন। শাকিলার ছবিতে বঙ্গবন্ধু সদা জাগ্রত। সত্যি এই কীর্তিমানের মৃত্যু নেই।  তাই তো পৃথিবীর মানচিত্রে এই বাংলাদেশের মানচিত্র স্ব মহিমায় জেগে আছে এবং লাল সবুজের পতাকা পাখা মেলে উড়ে বেড়াচ্ছে।

প্রদর্শনীটি দেখা যাবে শাকিলা খান চয়নের ফেসবুক আইডি এবং ইউটিউবে।