এই অসহিষ্ণুতা বাড়িতেছে কেন

একের পর এক নৃশংস ও লোমহর্ষক পারিবারিক হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটিয়া চলিয়াছে দেশে। এই সকল ঘটনা লিখিতে গেলেও হাত কাঁপে! গত শনিবার রাজধানীর কদমতলী এলাকায় এক দম্পতির বড় মেয়ে মেহজাবিন মা-বাবা ও ছোট বোনকে ঘুমের ঔষধ খাওয়াইয়া হাত-পা বাঁধিয়া শ্বাস রোধ করিয়া হত্যা করিয়াছে। হত্যা করিয়া নিজেই আবার পুলিশের জরুরি সেবা ৯৯৯-এ ফোন করিয়া তাহা জানাইয়াছে। স্বামী ও মেয়েকে হত্যার জন্যও ছিল তাহার প্রস্তুতি। তবে পুলিশ ঘটনাস্থলে হাজির হইলে সৌভাগ্যক্রমে তাহারা বাঁচিয়া যান। এই নারী ইহার আগে তাহার প্রথম স্বামীকে হত্যার দায়ে দীর্ঘদিন জেল খাটে এবং জামিনে মুক্তি পাইয়া দ্বিতীয় বিবাহ করে। পুলিশ বলিতেছে, এই হত্যাকাণ্ডের পিছনে রহিয়াছে পরকীয়া বা জমিজমা-সংক্রান্ত বিরোধ। গত এক সপ্তাহে প্রকাশিত ইত্তেফাকের রিপোর্ট হইতে বেশ কয়েকটি পারিবারিক হত্যাকাণ্ডের নজির পাওয়া গিয়াছে। তন্মধ্যে কুষ্টিয়ায় প্রকাশ্যে মাথায় গুলি করিয়া এক এএসআইয়ের স্ত্রী-সন্তান ও এক যুবক হত্যা, সিলেটে মা ও তাহার দুই শিশুকে গলা কাটিয়া হত্যা ও সাভারে দু্ই ভাইকে ছুরিকাঘাতে হত্যা উল্লেখযোগ্য। দেখা যাইতেছে, এই সকল মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ডের পিছনে রহিয়াছে পরিবারেরই কেহ না কেহ। মানুষের পারিবারিক মূল্যবোধ ও মানবিকতাবোধ আজ কোথায় উপনীত হইয়াছে, এই সকল ঘটনা হইতে তাহা উপলব্ধি করা যায়।

পরকীয়া, জমিসংক্রান্ত বিরোধ, আর্থিক লেনদেন, পারিবারিক কলহ, দারিদ্র্যের কারণে অশান্তি প্রভৃতি কারণে সম্প্রতি পারিবারিক হত্যাকাণ্ড বাড়িতেছে। পরিবারের সদস্যরা এতটা নিচে নামিতে পারে! খুন করিয়া তাহারা লাশ টুকরা টুকরাও করিতেছে। আপনজনের হস্তে এমন পরিণতি মোটেও মানিয়া লওয়া যায় না। পরিবার যেইখানে শান্তির ঘর হিসাবে বিবেচিত, সেইখানে এমন মৃত্যু অপ্রত্যাশিত, অনাকাঙ্ক্ষিত। বিশেষজ্ঞরা বলিতেছেন, এমন নৃশংসতার জন্য সামাজিক ও পারিবারিক অস্থিরতাই দায়ী। স্বামীর দ্বিতীয় বিবাহ মানিয়া নিতে না পারাও এই সকল হত্যাকাণ্ডের উল্লেখযোগ্য একটি কারণ। অপরাধবিজ্ঞানীরা এইরূপ একেকটি ঘটনা দেখিয়া হতবাক। সমাজবিজ্ঞানীরা বলিতেছেন, এই সকল খুনি কী ধরনের আচরণের মধ্যে জীবন যাপন করিতেছে, তাহাও ভাবিয়া দেখিতে হইবে। পারিবারিক অস্থিরতা ও নির্যাতনের কারণে অনেকের মধ্যে বাড়িতেছে অপরাধপ্রবণতা। কেহ-বা আবার মানসিকভাবে অসুস্থ হইয়া পড়ায় এমন রূঢ় আচরণ করিতেছে। পিতা কর্তৃক পুত্র হত্যা, পুত্র কর্তৃক পিতা হত্যা—এমনকি মাতা কর্তৃক পুত্র-কন্যা হত্যারও খবর পাওয়া যাইতেছে। পরিবারে বসবাস করা এই সকল মানসিক রোগীকে সুস্থ জীবনে ফিরাইয়া আনিবার ব্যবস্থা করিতে হইবে আমাদের। পারিবারিক বন্ধন শক্তিশালী করিতে বাড়াইতে হইবে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ ও বিশ্বাসযোগ্যতা।

বিশেষ করিয়া মহামারি করোনায় ঘরবন্দি থাকিবার কারণে আর্থিকসহ জীবনের বিভিন্ন ধরনের হতাশা-সংকটে মানুষের মধ্যে বাড়িতেছে হিংস্রতা। নিজের উপর নিয়ন্ত্রণ হারাইয়া অনেকে জড়াইয়া পড়িতেছে অপরাধে। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় মনোবিজ্ঞানীদের কাউন্সেলিং, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জনসম্পৃক্ততা ও সামাজিক সচেতনতামূলক কার্যক্রম গ্রহণ করা আবশ্যক। হতাশা দূর করিতে মানসিক স্বাস্থ্যের ব্যায়ামগুলো করা দরকার। সামাজিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ততা ও জীবিকার নিরাপত্তা আগে নিশ্চিত করা জরুরি। ইহা ছাড়া ২০১০ সালে পারিবারিক সহিংসতা (প্রতিরোধ ও সুরক্ষা) আইনটি কার্যকর হইলেও আইনটি সেই অর্থে ভুক্তভোগী ব্যক্তিকে সুরক্ষা দিতে পারিতেছে না। ইহাতে প্রয়োজনীয় সংশোধনী আনয়ন করা আবশ্যক। আদি যুগের মানুষকে বর্বর ও অসভ্য ভাবা হইলেও তাহারা বর্তমানের একশ্রেণির মানুষের মতো এতটা অমানবিক ছিল না। সামাজিক জীবনযাপনের নীতি-নিয়ম লঙ্ঘন, পারিবারিক সম্প্রীতি ও মূল্যবোধের অভাব, তথ্যপ্রযুক্তির অপব্যবহার, ভোগবাদিতা সর্বোপরি নৈতিক স্খলন আমাদের অধঃপতনের দিকে ধাবিত করিতেছে। এই সামাজিক অবক্ষয় রোধে আমাদের সর্বতোভাবে সচেতন হইতে হইবে।