যুক্তরাজ্যের কর্নওয়ালে জি-৭ভুক্ত রাষ্ট্রগুলোর শীর্ষ বৈঠক হয়ে গেল। এতে বর্ধিত আকারে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, জার্মানি, জাপান, ইতালি ও কানাডার শীর্ষ নেতারা ছাড়াও বিশেষ আমন্ত্রিত হিসেবে যোগ দিয়েছেন ভারত, অস্ট্রেলিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া ও দক্ষিণ আফ্রিকার শীর্ষ নেতারা। ইউরোপীয় ইউনিয়নের অংশগ্রহণের মাধ্যমে সম্প্রসারিত এই জোট পৃথিবীর এক-তৃতীয়াংশ জনগোষ্ঠীকে প্রতিনিধিত্ব করছে। আমরা জানি, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-উত্তর জাতিসংঘের বর্তমান সদস্যসংখ্যা ১৯৩, এর মধ্যে বিভিন্ন সংস্থাও রয়েছে। নিরাপত্তা পরিষদ সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। নিরাপত্তা পরিষদের জি-৫ভুক্ত পাঁচটি সদস্যরাষ্ট্রের বিশেষ ভেটো ক্ষমতা রয়েছে, যা শান্তি স্থিতিশীলতা রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তকেও ভেটো ক্ষমতার মাধ্যমে স্থগিত রাখতে পারে। বিভিন্ন অঞ্চলে যেমন আঞ্চলিক জোট রয়েছে, পাশাপাশি জি-৭ভুক্ত ধনী, উন্নত এবং গণতান্ত্রিক দেশগুলো বিশ্বব্যাপী উন্নয়ন, শান্তি ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে আসছে। অনেক ক্ষেত্রে বিশ্বের জনগণের প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি, তবে এর ভূমিকা এবং কার্যক্রম বিশ্বব্যাপী দরিদ্র ও উন্নয়নশীল দেশগুলোকে সহযোগিতার পাশাপাশি প্রভাবিতও করছে।
যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্স গণতন্ত্রের শক্তিশালী কেন্দ্র, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে জার্মানি, জাপান ও ইতালি গণতান্ত্রিক ধারায় পরিচালিত হচ্ছে। কানাডা স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে সূচনাকাল থেকেই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা কার্যকর রেখেছে। এই সবগুলো দেশই জ্ঞান-বিজ্ঞান, শিল্প-কৃষিসহ সব ক্ষেত্রেই উন্নত অবস্থানে রয়েছে। যার ফলে তারা বিশ্বব্যাপী ডোমিনেট করারও সুযোগ পাচ্ছে। এছাড়া নতুন সম্মেলনের অতিথি ভারত বৃহত্ গণতান্ত্রিক দেশ এবং স্বাধীনতার সূচনাকাল থেকেই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার মাধ্যমেই এগিয়ে যাচ্ছে। জ্ঞান-বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে বিশ্বের অগ্রগামী দেশের সারিতে রয়েছে। অস্ট্রেলিয়া ধনী, সম্পদশালী দেশ এবং গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় এগিয়ে যাচ্ছে। আফ্রিকা মহাদেশের মধ্য দক্ষিণ আফ্রিকা জ্ঞানবিজ্ঞান ও উন্নয়নের বিভিন্ন ক্ষেত্রে অন্যদের তুলনায় অগ্রসরমাণ। বর্ণবাদী ব্যবস্থার অবসানের পর থেকেই বাধা-বিপত্তি সত্ত্বেও গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা কার্যকর রয়েছে। দক্ষিণ কোরিয়ার প্রাথমিক পর্যায়ে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার দুর্বলতা থাকলেও বর্তমানে বিভিন্ন ক্ষেত্রে উন্নতি লাভ করেছে এবং গণতন্ত্র কার্যকর রয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্ত দেশগুলোতে বিভিন্ন ক্ষেত্রে উন্নতির পাশাপাশি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাও শক্তিশালী রূপ নিয়েছে। কাজেই বর্ধিত কলেবরে জি-৭-এর এই জোট একদিকে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, শিল্প, কৃষি ও অবকাঠামো উন্নয়নে বিশ্বব্যাপী দরিদ্র ও উন্নয়নশীল দেশগুলোতে কার্যকর ভূমিকা রাখছে। অন্যদিকে শান্তি, গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায়ও ভূমিকা দৃশ্যমান। দরিদ্র ও উন্নয়নশীল দেশের অনেক দেশই আজ বিভিন্ন ক্ষেত্রে উন্নতির মাধ্যমে তাত্পর্যপূর্ণ অবদান রাখছে। এর মধ্যে বাংলাদেশ, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, নেপাল, শ্রীলঙ্কা, ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা এবং জি-২০ভুক্ত বিভিন্ন দেশ উন্নতির পাশাপাশি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে কার্যকর করার ব্যাপারে ভূমিকা রাখছে।
সোভিয়েত ইউনিয়ন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে বিপুলসংখ্যক দেশের উন্নয়ন ও অগ্রগতিতে ভূমিকা রেখেছে। বর্তমান রাশিয়া অভ্যন্তরীণ গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে সুসংহত করতে না পারলেও বিশ্বে উন্নয়নের কোনো কোনো ক্ষেত্রে যে ভূমিকা রাখছে তা অব্যাহত থাকবে—এ প্রত্যাশা রয়েছে। চীন বৈপ্লবিক পরিবর্তনের মাধ্যমে গণপ্রজাতন্ত্রী চীনে রূপান্তরিত হয়েছে। বিজ্ঞানপ্রযুক্তির উন্নয়ন, বিশেষ করে ১৯৭৭ সালের পরে পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় বেশ অগ্রগতি অর্জন করেছে। কিন্তু রাজনৈতিক এবং কূটনৈতিক ক্ষেত্রে কর্তৃত্ববাদী শাসন ও মনোভাবের কারণে আঞ্চলিক এবং বিশ্বব্যাপী সংঘাত সৃষ্টি করছে।
আগামী এক বছরে দরিদ্র দেশগুলোকে অতিরিক্ত ১০০ কোটি ডোজ করোনার টিকা প্রদানের প্রতিশ্রুতিতে শেষ হলো জি-৭ সম্মেলন। বৈশ্বিক মহামারির ইতি ঘটানো এবং বিশ্বের ধনাঢ্য দেশগুলোর এ জোটের সহযোগিতার ভিত মজবুত করারও অঙ্গীকার করা হয়। নতুন করে টিকার এ অঙ্গীকারের প্রভাব খুবই সীমিত থাকবে, কারণ এতে আগের প্রতিশ্রুত টিকাও রয়েছে। তবে টিকা নিয়ে দরিদ্র ও উন্নয়নশীল দেশগুলো বর্তমানে যেভাবে হিমশিম খাচ্ছে তাতে কিছুটা হাঁফ ছেড়ে বাঁচার ফুরসত মিলবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। আমরা জানি, বিশ্বে মোটামুটি টিকাকরণে ১ হাজার ২০০ কোটি টিকার প্রয়োজন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলেছে, এটা প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম।
এবারের জি-৭ সম্মেলনে করোনা মহামারি থেকে উত্তরণের ওপরই সবচেয়ে বেশি জোর দেয়া হয়েছে। মহামারির শুরুতে ২০০ কোটি করোনা টিকার অঙ্গীকার করেছিল জি-৭। এবারের সম্মেলনে এক বছরের মধ্যে ১০০ কোটি টিকা সরবরাহের অঙ্গীকার করেছে তারা। এছাড়া করোনার উত্স অনুসন্ধানে সময়োচিত, স্বচ্ছ, বিশেষজ্ঞ নেতৃত্বাধীন এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) নেতৃত্বে একটি বিজ্ঞানভিত্তিক গবেষণা পরিচালিত হবে। তবে সম্মেলনের একটি বড় গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল চীন, সেটা বলার অপেক্ষা রাখে না।
টিকা বিতরণ অবকাঠামো নির্মাণে উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য ১ হাজার ২০০ কোটি ডলারের লাইন অব ক্রেডিট (এলওসি) দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল বিশ্বব্যাংক। কিন্তু দেশগুলোর সরকার মাত্র ৩০০ কোটি ডলার সংগ্রহ করেছে। দরিদ্র ও উন্নয়নশীল দেশগুলোতে অবকাঠামো উন্নয়নে বিল্ড ব্যাক বেটার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। যার ফলে চীন বিআরআইয়ের মাধ্যমে দরিদ্র ও উন্নয়নশীল দেশগুলোকে যে ঋণের ফাঁদে ফেলছে, তার মোকাবিলা করা যাবে বলে মনে করা হচ্ছে।
যুক্তরাজ্যের দক্ষিণাঞ্চলীয় উপকূলবর্তী শহর কর্নওয়ালে আয়োজিত তিন দিনব্যাপী সম্মেলনে রাশিয়া ও চীনের বিরুদ্ধে সম্মিলিত অবস্থানের অঙ্গীকার ব্যক্ত করা হয়। সাম্প্রতিক সময়ে বেশ কয়েকটি ব্র্যানসমওয়্যার সাইবার হামলায় রাশিয়াভিত্তিক বিভিন্ন গোষ্ঠীর সংশ্লিষ্টতা এবং এতে মস্কোর ভূমিকারও নিন্দা জানানো হয়। বাইডেন ও পুতিনের আলোচনা ও অগ্রগতি হয়েছে বলে বিশ্লেষকরা মনে করেন। হংকং ও জিনজিয়াংয়ে চীনের মানবাধিকার লঙ্ঘনের নিন্দা জানানো হয়েছে। এছাড়া ২০৩০ সালের মধ্যে কার্বন নিঃসারণ অর্ধেকে সীমিত রাখা এবং কার্বন নিঃসারণমুক্ত পরিবহন অর্ধেকে নামিয়ে আনার লক্ষ্যমাত্রা সম্পর্কেও সিদ্ধান্ত হয়েছে।
জি-৭ সম্মেলনের পরে মানবাধিকার প্রশ্নে সিদ্ধান্তের প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছে চীন। আমরা আশা করি, টিকা-সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত আরো সম্প্রসারিত হবে, সে ক্ষমতা জি-৭ এবং এর সঙ্গে যুক্ত দেশগুলোর রয়েছে। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, ১৩১টি টিকা প্রকল্পের মধ্যে ৩২টি টিকা মাঠ পর্যায়ে পরীক্ষায় রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ভারত, রাশিয়া ও চীনের টিকা বিভিন্ন দেশে প্রয়োগ করা হচ্ছে। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও ভারত এবং এদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সক্ষমতা অনেক বেশি। সম্মিলিতভাবে তারা আগামী ২০২২ সালের মধ্যে বিশ্বকে স্থিতিশীল করার ব্যাপারে ভূমিকা রাখতে পারে। কোভিড-১৯-পরবর্তী অর্থনৈতিক উন্নয়নেও অন্যান্য দেশের সহযোগিতায় এগিয়ে যাবে বলে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। পরিবেশ ও জলবায়ু রক্ষার ক্ষেত্রেও এই দেশগুলো অগ্রণী ভূমিকা রাখবে বলে প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেছেন। এছাড়া ২০৩০ সালে কার্বন নিঃসারণ অর্ধেকে নামিয়ে আনার ইচ্ছা ব্যক্ত করা গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। মানবাধিকার ক্ষেত্রে সম্প্রসারিত এই জোট শান্তি, গণতন্ত্র ও উন্নয়নে আরো কার্যকর ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা যায়। দরিদ্র ও উন্নয়নশীল সব দেশের গণতান্ত্রিক শক্তি উল্লিখিত গণতান্ত্রিক জোটের সঙ্গে ঐক্যবদ্ধভাবে এগিয়ে এলে সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ মোকাবিলা করে শান্তি, গণতন্ত্র ও উন্নয়ন অবশ্যম্ভাবী। তবে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন দরিদ্র দেশগুলোর নিজেদের পায়ে দাঁড়াতে চেষ্টা করা। উন্নয়নশীল দেশগুলো নিজেদের মধ্যে শক্ত ঐক্য গড়ে তুলতে পারলে অনেক ক্ষেত্রেই আন্তর্জাতিক রাজনীতির গতিবিধি পালটে যাবে। উন্নয়নশীল বিশ্বের রাজনীতিবিদরা একটু সচেতন হলেই সেটা সম্ভব।
n লেখক : শিক্ষাবিদ, সাবেক রাষ্ট্রদূত ও মুক্তিযোদ্ধা