চাই শঙ্কাহীন ও মুক্ত লেখনী

প্রগতিশীল বিশ্বে সংবাদপত্র ও গণমাধ্যমসমূহ একটি বড় আশীর্বাদ। এর মাধ্যমেই দেশবিদেশে প্রতি মুহূর্তে ঘটে যাওয়া নানা খবরাখবর এক নিমিষেই সামনে চলে আসে। এটি একটি সমাজের আয়নাস্বরূপ যার মাধ্যমে জাতির ভাবমূর্তি পরিচালিত হয়। গণতান্ত্রিক দেশে সংবাদমাধ্যমের ভূমিকা সবচেয়ে বেশি, এর মাধ্যমেই জাতি সরকারের আলোচনা, সমালোচনা ও দেশের সার্বিক পরিস্থিতি জানতে পারে। তবে সংবাদ সংগ্রহ সহজ কোনো কাজ নয়, নানামুখী চাপ ও প্রতিকূল অবস্থায় জীবন বাজি রেখে সাংবাদিকরা এই মহান পেশায় নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেন। এমনকি করোনার সংক্রমণে পুরো বিশ্ব যখন স্থবির তখনো সাংবাদিকরা ছুটে চলেছে খবর সংগ্রহের জন্য। তবুও কখনো কখনো বিভিন্ন চাপে তারা সত্য প্রকাশে নির্ভীক হতে পারেন না। ১৯৯২ সালের ২১ জুন জাতীয় প্রেসক্লাবে সাংবাদিকদের ওপর নেমে এসেছিল আকস্মিক হামলা ও নির্যাতন, এতে আদর্শবান অর্ধশতাধিক সাংবাদিক আহত হয়েছিলেন। সেই থেকে বাংলাদেশে ২১ জুনকে ‘সাংবাদিক নির্যাতন প্রতিরোধ দিবস’ হিসেবে পালন করে আসছে।

উন্নয়নশীল দেশসমূহে সাংবাদিকরা পেশাগত কারণে বরাবরই শারীরিক ও মানসিকভাবে নির্যাতনের শিকার হন। দলের প্রভাব, প্রশাসনের ক্ষুদ্র স্বার্থ ও দুর্নীতির করাল থাবায় তাদের কর্মজীবন হুমকির মুখে থাকে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও এ চিত্র অনেকটাই অভিন্ন। দেশে বিশেষত মফস্সলের সাংবাদিকরা অনেক বেশিই নিপীড়নের শিকার হয়ে থাকেন। তারা তাদের এলাকায় পরিচিত মুখ হওয়ায় সেখানে কোনো দুর্নীতির খবর ছাপা হলে সহজে দুর্নীতিবাজদের নজর তাদের দিকেই পড়ে এবং হুমকির মুখে থাকে তাদের জীবন। এছাড়াও সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোতে সাংবাদিকতা বেশ ঝুঁকির মুখে। চোরাকারবারি ও মাদকব্যবসায়ীদের খপ্পরে পড়তে হয় তাদের। পাশাপাশি সংবাদ প্রচারেও বেশ সজাগ থাকতে হয় তাদের, জড়িয়ে থাকে সবসময় মামলা মোকদ্দমা ও সম্মানহানির ভয়।  এসব পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য অনেক সময়ই প্রস্তুত থাকেন না তারা। নারী সাংবাদিকতাও আজও পুরোপুরি নিরাপত্তা পায়নি। শারীরিক গঠনগত কারণে তারা এখনো সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গিতে পিছিয়ে আছেন।

এরূপ নানা কারণেই বাংলাদেশে সাংবাদিক নিরাপত্তা আজও নিশ্চিত হয়নি। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের গণমাধ্যম কতটা স্বাধীনভাবে কাজ করতে পাচ্ছে তা নিয়ে ২০০২ সাল থেকে সূচক প্রকাশ করে আসছে রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডার্স। ২০২১ সালে প্রকাশিত এই সূচক অনুযায়ী, গত বছরের থেকে আরো একধাপ পিছিয়ে এসেছে বাংলাদেশ। ১৮০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১৫১তম, যে মান প্রতিবেশী সব দেশগুলোর থেকেও বেশ পেছনে। বাংলাদেশ প্রসঙ্গে আরএসএফের ব্যাখ্যায় বলা হয়, ২০২০ সালে করোনা ভাইরাস এবং লকডাউনে সাংবাদিকদের ওপর সহিংসতা উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। হেনস্তার শিকার হয়েছেন তারা এবং বিভিন্নভাবে তাদের প্রতিবন্ধকতা তৈরি করা হয়েছে।

যাদের তথ্যে ভর করে পরিচালিত হচ্ছে দেশ, দেশের সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সংস্কৃতি এবং সাধারণ মানুষের মতাদর্শ; কর্মক্ষেত্রে তাদের সর্বোচ্চ নিশ্চয়তা প্রদান জরুরি। তাই সাংবাদিকদের নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরো জোরদার করতে হবে। এক্ষেত্রে তত্পর হতে হবে প্রশাসন ও সাংবাদিক সংগঠনগুলোকে। সাংবাদিক নির্যাতন প্রতিরোধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি স্থাপন করতে হবে। আর কঠোর পরিস্থিতি মোকাবিলায় সাংবাদিকদেরও প্রস্তুত থাকাও জরুরি। এবং সাংবাদিকতার মতো মহান পেশাটির প্রতি দেশবাসীর আস্থা ও সম্মান আরো বাড়াতে হবে।

n লেখক :শিক্ষার্থী, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়