বাজেট বাস্তবায়নের চিত্র হতাশাজনক

চলতি ২০২০-২১ অর্থবছরে সরকার বিশাল বাজেটের লক্ষ্য নিলেও বাস্তবায়নে একেবারেই পিছিয়ে আছে। বছরের শেষে এসে মূল বাজেট তো নয়ই, বরং সংশোধিত বাজেট বাস্তবায়নের হতাশাজনক চিত্র উঠে এসেছে। অর্থবছরের ৯ মাসে বাজেট বাস্তবায়ন হয়েছে মাত্র ৪১ শতাংশ।

ব্যয়ের যখন এই চিত্র, তখন রাজস্ব আদায়েও সুখবর নেই। বছরের ১১ মাসে রাজস্ব আদায় কম হয়েছে—প্রায় ৪৪ হাজার কোটি টাকা। করোনাই মূলত রাজস্ব আদায়ে প্রত্যাশিত গতি না আসার পেছনে অন্যতম কারণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। এমন পরিস্থিতিতে আর ৯ দিন বাদে শুরু হওয়া নতুন বছরের বাজেটের বাস্তবায়নও শুরুতেই সংশয়াপন্ন। করোনার অভিঘাত এখনো যায়নি, বরং সামনে নতুন ভ্যারিয়েন্ট, নতুন ঢেউয়ের শঙ্কা। এ অবস্থায় ব্যবসা-বাণিজ্য পুরোদমে চালু করা না গেলে অর্থনীতির চাকা ঘুরবে কীভাবে? অর্থনীতি তথা ব্যবসা-বাণিজ্য সচল না হলে রাজস্ব আদায় তো বাড়বেই না, বরং ব্যবসায় উদ্যোগগুলো ব্যাংকের কাছে খেলাপি হয়ে বসে থাকবে। সম্ভাব্য এই পরিস্থিতির নিয়ন্ত্রণে সঠিক কর্মকৌশল প্রণয়নের এখনই সময় বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরাও। নইলে সরকারের চলমান ব্যয় নির্বাহের জন্য ব্যাংক ঋণের ওপর নির্ভরতা বাড়বে। তাতে বেসরকারি খাতে ঋণের জোগান কমে যাবে। করোনার প্রভাব মোকাবিলা করে উদ্যোক্তাদের ঘুরে দাঁড়ানো সম্ভব হবে না।

করোনাকালীন এই বাস্তবতায় অর্থনীতি ঘুড়ে দাঁড়াতে গত ৩ জুন ২০২১-২২ অর্থবছরের জন্য ৬ লাখ ৩ হাজার ৬৮১ কোটি টাকার বাজেট উপস্থাপন করেছেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। অর্থনৈতিক পুনরূদ্ধার কার্যক্রম বাস্তবায়নের মাধ্যমে কর্মসৃজন, অভ্যন্তরীণ চাহিদা সৃষ্টির মাধ্যমে এই সংকট কাটিয়ে উঠার আশাও প্রকাশ করেছেন তিনি।

সরকারের রাজস্ব আদায়ের প্রধান প্রতিষ্ঠান জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) প্রাথমিক হিসাবে দেখা গেছে, গত ১১ মাসে রাজস্ব আদায় কম হয়েছে ৪৪ হাজার কোটি টাকার মতো। রাজস্ব আদায় কমে যাওয়া বিষয়ে যদিও এনবিআরের কিছু যুক্তি রয়েছে। আমদানি কমে যাওয়াসহ করোনার প্রভাব উল্লেখযোগ্য। এনবিআরের নতুন চেয়ারম্যান দায়িত্ব নেওয়ার পর বলেছিলেন, রাজস্ব আদায়ে কৌশলগত পদক্ষেপ নেবেন। গত কয়েক বছর ধরে রাজস্ব খাতে লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের নিম্নমুখী গতি ফিরিয়ে আনাই হবে তার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। রাজস্ব প্রশাসনে নানা গ্রুপিং-লবিং থাকায়            বদলি-পদোন্নতি নিয়ে অতীতে বিতর্ক কম হয়নি। সূত্রমতে, বিভিন্ন সময়ে এনবিআরের সদস্য ও কমিশনারদের মধ্যে দ্বন্দ্বে রাজস্ব আদায় কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হয়েছিল। আবার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ইদানীং কারখানা পরিদর্শনে ঝুঁকছেন বেশি। ফলে শীর্ষ ব্যক্তি যদি কোনো কারখানা পরিদর্শনে যান, ঐ কারখানায় অধস্তন কর্মকর্তারাও আর সঠিক দায়িত্ব পালন করতে পারেন না। দ্বিতীয়ত, এনবিআর নিজেই করের হার নির্ধারণ করে দেয়। নিজেই কর আদায় করে। নীতি গ্রহণ ও নীতি বাস্তবায়ন একই সংস্থার দায়িত্বে থাকায় রাজস্ব আদায় বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। রাজস্ব কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে হয়রানির অভিযোগ তো রয়েছেই।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের সূত্রমতে, চলতি অর্থবছরের বাজেটের মূল আকার নির্ধারণ করা হয়েছিল ৫ লাখ ৬৮ হাজার কোটি টাকা। গত এপ্রিল মাসে সংশোধন করে নির্ধারণ করা হয় ৫ লাখ ৩৮ হাজার ৯৮৩ কোটি টাকা। এই পরিমাণ অর্থ ব্যয় করতে হলে ৯ মাসেই ব্যয় করার কথা ৪ লাখ ৪ হাজার ২৩৭ কোটি ২৪ লাখ টাকা। বাস্তবে ব্যয় হয়েছে ২ লাখ ২৫ হাজার ৫৮৮ কোটি টাকা। অর্থাত্, সংশোধিত বাজেট বাস্তবায়ন দেখাতে হলে বছরের শেষ তিন মাসে ব্যয় করতে হবে ১ লাখ ২৪ হাজার ৭৪৫ কোটি টাকা, যা সম্ভব নয়। যদিও বাংলাদেশের ইতিহাসে কখনো সংশোধিত বাজেট বাস্তবায়নের রেকর্ড নেই।

গত এক দশকে ব্যয়ের চিত্র :

সরকারি হিসাবেই গত ১০ বছরের সংশোধিত বাজেট বাস্তবায়নের হার গড়ে ৭০ শতাংশের কম হয়েছে। যদিও এর গুণগত ব্যয় নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। ২০১০-১১ অর্থবছরে ১ লাখ ৩২ হাজার ১৭০ কোটি টাকার বাজেট ঘোষণা করা হয়। অর্থবছর শেষে বাজেট বাস্তবায়ন হয়েছে ৯৭ দশমিক শূন্য ৬ শতাংশ। বাজেটে খরচের পরিমাণ দাঁড়ায় ১ লাখ ২৮ হাজার কোটি টাকা। ২০১১-১২ অর্থবছরে বাজেটের আকার ছিল ১ লাখ ৬৩ হাজার ৫৮৯ কোটি টাকা। অর্থবছর শেষে ব্যয় করা অর্থের পরিমাণ ১ লাখ ৫২ হাজার ৬৬৪ কোটি টাকা। বাস্তবায়নের হার ৯৩ দশমিক ১৮ শতাংশ। ২০১২-১৩ অর্থবছরে বাজেটের আকার ছিল ১ লাখ ৮৯ হাজার কোটি টাকা। অর্থবছর শেষে ব্যয় হয় ১ লাখ ৭৪ হাজার  কোটি টাকা। ২০১২-১৩ অর্থবছরে বাজেট বাস্তবায়নের হার ৯০ দশমিক ৭৬ শতাংশ। ২০১৩-১৪ অর্থবছরে প্রথমবারের মতো বাজেটের আকার ২ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে ২ লাখ ১৬ হাজার কোটি টাকা হয়। বছর শেষে মোট বাজেটের মধ্যে ব্যয় হয় ১ লাখ ৮৮ হাজার কোটি টাকা। বাজেট বাস্তবায়নের পরিমাণ ৮৪ দশমিক ৫৯ শতাংশ।

২০১৪-১৫ অর্থবছরে বাজেট ঘোষণা করা হয় ২ লাখ ৫০ হাজার কোটি টাকা। বাস্তবায়ন করা হয় ২ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা। অর্থবছর শেষে বাজেট বাস্তবায়নের হার ৮১ দশমিক ৫৯ শতাংশ। আর ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ২ লাখ ৯৫ হাজার ১০০ কোটি টাকার বাজেট ঘোষণা করা হয়। পরে তা কমিয়ে ২ লাখ ৬৪ হাজার ৫৬৫ কোটি টাকা নির্ধারণ করলেও শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়িত হয়েছে ২ লাখ ৩১ হাজার ৬৫৩ কোটি টাকা। বাজেট বাস্তবায়নের হার ৭৮ দশমিক ৫০ শতাংশ। অন্যদিকে ২০১৬-১৭ অর্থবছরে বাজেটের আকার ছিল ৩ লাখ ৪০ হাজার ৬০৫  কোটি টাকা।  বছর শেষে বাজেট বাস্তবায়িত হয়েছে ৭৬ শতাংশ। ২০১৭-১৮ অর্থবছরের বাজেটের আকার ৪ লাখ ২৬৬ কোটি টাকা। সংশোধিত বাজেটে ২৮ হাজার ৭৭১ কোটি টাকা কাটছাঁট করা হয়। বছর শেষে বাজেট বাস্তবায়নের হার দাঁড়ায় ৭০ শতাংশের কিছু বেশি। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে বাজেটের আকার ৪ লাখ ৬৪ হাজার ৫৭৩ কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়। সংশোধিত বাজেটে এর আকার দাঁড়ায় ৪ লাখ ৪২ হাজার ৫৪১ কোটি টাকা। প্রকৃত বাস্তবায়িত হয় ৩ লাখ ৯১ হাজার ৬৯০ কোটি টাকা। বাস্তবায়নের হার ৮৯ শতাংশের কম। ২০১৯-২০ অর্থবছরের জন্য ৫ লাখ ২৩ হাজার ১৯০ কোটি টাকার বাজেট পেশ করা হয়েছিল গত ১৩ জুন ২০১৯ তারিখে। ২১ হাজার ৬১৪ কোটি টাকা কমিয়ে সংশোধিত বাজেট ঠিক করা হয় ৫ লাখ ১ হাজার ৫৭৭ কোটি টাকা। করোনার প্রভাবে বাস্তবায়ন দেখানো হয়েছে ৭০ শতাংশের কম। বাস্তবায়নের এই চিত্র থেকেই স্পষ্ট যে, শিগগির সংশোধিত বাজেটের শতভাগ বাস্তবায়নের রেকর্ড গড়া সম্ভব হবে না।