বৃষ্টির দিনের অনুষঙ্গ

l শাহিনুর আলম কলি

‘গগনে গরজে মেঘ, ঘন বরষা। কূলে একা বসে আছি, নাহি ভরসা।’ রবি ঠাকুরের কবিতার মতোই এখন আকাশের মেঘ ইদানীং কাউকে খুব একটা ভরসা দিচ্ছে না। আকাশটা মেঘাচ্ছন্ন আর পথঘাট কর্দমাক্ত হলেও কি থেমে থাকবে আমাদের দৈনন্দিন কাজকর্ম, জীবনের প্রয়োজনেই যে যার কর্মস্থলে যেতেই হয়। বৃষ্টির দিনের আকাশের অবস্থা বুঝতে পারাটাই যেন বড় দায়, কখনও মিষ্টি রোদ হেসে উঠবে, কখনো-বা ঝুম বৃষ্টি। একটু অসচেতন হলেই আপনার কাছে থাকা সবকিছু ভিজিয়ে দিয়ে যাবে বৃষ্টি, সঙ্গে থাকা জিনিস নষ্টও হতে পারে। বৃষ্টি সবার পছন্দ হতে হবে এমন বাধ্যবাধকতা নেই, কিন্তু বৃষ্টিকে ফেরানো কিংবা থামানোর উপায়ও আমাদের নেই। বাদল দিনে সতর্কতা নিয়েই ঘর থেকে বের হতে হয়। কখনো রোদ আবার কখনো বৃষ্টি। এ সময় আপনার বুঝতে কষ্ট হয়, কীভাবে বাইরে বের হবেন। হয়তো পথে হঠাত্ বৃষ্টি বিগড়ে দিতে পারে সবকিছু। প্রকৃতি তার নিয়মেই চলে ও চলবে। এ জন্য ভয়ের কিছু নেই। আপনার যখন যেখানে যাওয়ার প্রয়োজন আপনি বেরিয়ে পড়ুন। তার জন্য নিজেকে প্রস্তুত করে নিন আগে থেকেই। জামা, জুতা, ব্যাগ, ছাতা সবকিছু হতে হয় ঋতু উপযোগী। এ সময় বাসা থেকে বের হতে হলে ছাতা সঙ্গে রাখতেই হবে। অনেকে বৃষ্টির বিড়ম্বনা থেকে রেহাই পেতে ছাতা বদলে ব্যবহার করেন রেইনকোট। যারা ছাতা ব্যবহার ঝামেলা মনে করেন, তাদের জন্যই হলো রেইনকোট। ফ্যাশন এবং স্টাইলের সঙ্গে ব্যক্তিত্ব অনেক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কেননা, পোশাকের সঙ্গে ম্যাচ করে ছাতা কিংবা ব্যাগ নিতে হয়। আবার ব্যাগের সঙ্গে ম্যাচ করে স্যান্ডেল। একটি পোশাক অনুষঙ্গের সঙ্গে আরেকটির সম্পর্ক এভাবেই তৈরি হয়। আর এ বিষয়গুলো মিলিয়ে চলতে পারাই একজন ফ্যাশনেবল মানুষের কাজ।

ছাতা

অনেক আগে রীতি ছিল ছাতা মানেই কালো হতে হবে কিন্তু এখন সে ধারণা বদলেছে। বিভিন্ন শ্রেণি ও বয়সের মানুষ এখন ছাতা ব্যবহার করে থাকেন। বর্তমানে বাজারে এসেছে বিভিন্ন রংয়ের ছাতা। ব্যক্তি বিশেষে এর ব্যবহারেরও পরিবর্তন হয়েছে। বছরের সবসময়ই ছাতার চাহিদা রয়েছে কিন্তু বর্ষাকালে আরও বেশি বিক্রি হয়। এখন বের হয়েছে বিভিন্ন রঙ বেরঙের ছাতা। আজকাল দেশি-বিদেশি বিভিন্ন রকমের ছাতা বাজারে পাওয়া যায়। বিদেশি ছাতাগুলোর মধ্যে চায়নার ছাতা উল্লেখযোগ্য। তবে অন্যান্য দেশের ছাতারও কদর রয়েছে এদেশে। এরমধ্যে বার্মা, থাইল্যান্ড, জাপান, অস্ট্রেলিয়া উল্লেখযোগ্য। বাজারে এখন বিভিন্ন ব্র্যান্ডের ছাতার পসরা সাজিয়েছে দোকানিরা। মার্কেটে দেশি ব্র্যান্ডের শরীফ ছাতা, মদিনা ছাতা, বঙ্গ ছাতা, ভাই-ভাই ছাতা ও বায়েজিদ ছাতা পাওয়া যাচ্ছে। এছাড়া, ইউনিক, অলিম্পিক, শংকর ফিলিপস, চেরি, ফুজি প্রভৃতি বিদেশি ব্র্যান্ডের ছাতারও বেশ চাহিদা। ছাতার কাপড়ে হরেক রঙের সুতার কাজও করা থাকে। নিচের ঝুলপিতে লাগানো থাকে ম্যাচিং করা লেস কাপড়। তরুণীরা এসব বিষয় বেশি বিবেচনা করেন। কাপড় ও রং দেখে বাছাই করেন পছন্দের জিনিসটি। বাজারভেদে ছাতার দাম ওঠানামা করে থাকে। ছাতার দামের ক্ষেত্রেও রয়েছে বিভিন্ন রকমফের। একরঙা আর প্রিন্টেড ছাতার দাম বেশি থাকলেও এখন প্রিন্টেড ছাতার দাম আগের চেয়ে বেড়ে গেছে। ফ্যাশন অনুষঙ্গের সঙ্গে মানিয়ে ঝালর বসানো ছাতা কিনতে চাইলে তার জন্য বরাদ্দ রাখতে হবে কিছু বাড়তি টাকা। তবে ছাতা শুধু এ বর্ষার জন্য নয়। যত্ন করলে কয়েক বর্ষা কাটিয়ে দেওয়া যায় এক ছাতা দিয়ে অনায়াসে কয়েকবছর কাটিয়ে দেওয়া যায়।

ছাতার দাম :চায়না ছাতাগুলোর চেয়ে দেশি ছাতার দাম তুলনামূলকভাবে বেশি হবে। ১৫০-৩০০ টাকার মধ্যে ভাঁজ করা ছাতাগুলো পাওয়া যাবে। দুই ভাঁজের ছাতা ২০০-৬০০টাকা, তিন ভাঁজের ছাতাগুলো ৩০০-১২০০ টাকার মধ্যে পাওয়া যাবে। ২৫০-৫০০ টাকার মধ্যে শিশুদের কার্টুন ছাতাগুলো পাওয়া যায়। ৮০০-১,০০০ টাকার মধ্যে বক্স ছাতাগুলো পেয়ে যাবেন।

কোথায় পাবেন :নিউমার্কেট-গাউছিয়া-চাঁদনী চক এলাকায় মিলবে সব ধরনের ছাতা। তাছাড়া ফার্মগেট, মিরপুর মুক্তিযোদ্ধা মার্কেট, মৌচাক, মতিঝিলসহ শহরের সব ছোট-বড় মার্কেটে পছন্দসই নকশার ছাতা পাওয়া যাবে। ব্র্যান্ডেড ছাতার জন্য ঢুঁ মারতে পারেন বড় শপিংমল কিংবা ডিপার্টমেন্টাল স্টোরে। সে ক্ষেত্রে যমুনা ফিউচার পার্ক, বসুন্ধরা শপিংমল, ইস্টার্ন প্লাজা, ইস্টার্ন মল্লিকা, পাটুয়াটুলী, রাপা প্লাজা, কর্ণফুলী গার্ডেন, গুলশান  উল্লেখযোগ্য। এছাড়া বর্ষা মৌসুমে রাস্তার মোড়ে মোড়ে ছাতার দোকান দেখা যায়।

জুতা

জুতা নির্বাচনে প্রথমেই খেয়াল রাখতে হবে আরামের কথা। আরামদায়ক না হলে কোনো অবস্থাতেই স্বস্তি দেবে না।বর্ষাকালে যখন তখন বৃষ্টি পড়ে জুতা ভিজে যেতে পারে, তাই রাবার বা প্লাস্টিকের জুতা হতে পারে এই সময়ের আদর্শ পছন্দ। কাদা আর বৃষ্টির পানি জমে থাকা রাস্তায় জুতা নিয়ে সমস্যায় পড়তে হয় প্রতিদিন। এই সময়টাতে প্লাস্টিক বা পানি প্রতিরোধ স্যান্ডেলই হবে জুতসই। এ সময় স্লিপার না পরে একটু উঁচু স্যান্ডেল পরাই বুদ্ধিমানের কাজ হবে। এতে করে হাঁটতে গেলে কাদা ছিটবে না। আবার কাদা-ময়লা পানি লেগে আপনার পা-ও নোংরা হবে না। এ সময় ভিজলে নষ্ট হয়ে যাবে এমন জুতা, সু বা স্যান্ডেল না পরাই ভালো। বেল্টওয়ালা আঙুলের কাছটায় আটকানো খোলামেলা প্লাস্টিকের রবারের স্যান্ডেল পরতে পারেন। এতে বাতাস ভেজা পা শুকিয়ে দেবে। এ সময়ের উপযোগী নানা নকশার ফ্যাশনেবল জুতা বাজারে রয়েছে। বৃষ্টির দিনের এসব পাদুকা রাবার, রেক্সিন, স্পঞ্জ ও সিনথেটিক উপাদান দিয়ে তৈরি বলে পানিতে ভিজলেও নষ্ট হয় না। এগুলোয় উন্নত মানের রাবার ও পিভিসি মেটেরিয়াল ব্যবহার করা হয়েছে। ফলে পানির সঙ্গে মিশে পায়ের সংস্পর্শে এলেও এটা থেকে চুলকানি বা অন্য সমস্যা হওয়ারও ভয় থাকে না। কাদা-পানি এড়িয়ে স্বাচ্ছন্দ্যে ঘুরে বেড়াতে পারবেন এসব জুতা পরে। বাজার ঘুরে দেখা গেল প্রায় সব ব্র্যান্ডের জুতার দোকানেই বর্ষা উপযোগী জুতা এসেছে। এ সময় লেদার, আর্টিফিশিয়াল লেদার কিংবা কাপড়ের জুতার বদলে প্লাস্টিক, রাবার ও স্পঞ্জের জুতা টেকসই আর আরামদায়ক। এসব জুতা কাদা-পানিতে নষ্ট হয় না

দরদাম :রাজধানীর প্রায় সব বাজারেই পাওয়া যাবে বৃষ্টিতে পরার উপযোগী ফ্যাশনেবল স্যান্ডেল। বাটা, এপেক্স, জেনিস, বে এম্পোরিয়াম, লোটো, ওরিয়নসহ ছোট-বড় প্রায় সবগুলো ব্র্যান্ডেই মিলবে বৃষ্টিতে পরার উপযোগী এসব জুতা, স্যান্ডেল। অ্যাপেক্সে ১,৮০০ থেকে ২,৪০০ এবং বাটায় পাবেন ২৫০ থেকে ২,০০০ টাকায়। এছাড়া বিভিন্ন বাজারে ৫০০ টাকার মধ্যেই পেয়ে যাবেন পছন্দের স্যান্ডেল বা জুতা। তবে নকশা ও মান ভেদে দাম পড়বে ১৯৯ থেকে ৫৯৯ টাকার মধ্যে।

কোথায় পাবেন :রাজধানীর বিভিন্ন মার্কেটে আপনি দেশি-বিদেশি পছন্দসই জুতা পেয়ে যাবেন। এসব মার্কেটের মধ্যে কর্ণফুলি, বসুন্ধরা সিটি, মৌচাক মার্কেট, বেইলি স্টার, ইস্টার্ন প্লাজা উল্লেখযোগ্য। বিভিন্ন শো-রুমের যে কোনো আউটলেটে পেয়ে যাবেন। এছাড়া একটু কম দামে কিনতে চাইলে যেতে পারেন নিউ মার্কেট, এলিফ্যান্ট রোড, গুলিস্তান, মিরপুর ১০ নম্বরের নন-ব্র্যান্ড দোকানে।

রেইনকোট

বৃষ্টির হাত থেকে রেহাই পেতে অনেকেই ব্যবহার করেন ছাতা। কিন্তু কেউ কেউ এক্ষেত্রে ছাতার বদলে ভরসা করেন রেইনকোটে। বর্ষায় বৃষ্টি থেকে রক্ষা পেতে সারা বিশ্বেই রেইনকোট বেশ জনপ্রিয়। শুধু ছাতাই যে আমাদেরকে ঝুম বৃষ্টি থেকে রক্ষা করতে পারে এমনটা নয়। বিশেষ সময়ে ছাতা শুধু আপনার শরীরের উপরের অংশ ছাড়া আর কোনো অংশই বৃষ্টি থেকে বাঁচাতে পারবে না। সেক্ষেত্রে রেইনকোট সঙ্গে থাকলে সেই অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি থেকে রক্ষা পাওয়া যাবে। রেইনকোট একটি অপরিহার্য পরিধান। একটু খেয়াল করে কিনলে এই রেইনকোট আপনাকে আরো ফ্যাশনেবল করে তুলতে পারে। রেইনকোট পরতে আমরা অনেকেই অভ্যস্ত নই, তারপরও প্রয়োজনে পরতে হয়। তাই যারা অভ্যস্ত নন তারা যেই রঙ এবং ধরণ পরতে স্বাচ্ছন্দবোধ করেন সেটাই পরুন। যারা অভ্যস্ত তারা একটু উজ্জ্বল রঙ পরতে পারেন। বাচ্চাদের জন্যও রেইনকোট কিনুন। শুধু বাহারি রঙ নয়, বিভিন্ন কার্টুন আঁকা রেইনকোট হাতের নাগালেই পাওয়া যাবে। বাজারে দেশি ছাড়াও ইন্ডিয়ান ও চায়না রেইনকোটের চাহিদা সবচেয়ে বেশি। সিঙ্গেল পার্ট ও ডাবল পার্টের রেইনকোট পাওয়া যায়। ডাবল পার্ট রেইনকোটের দুই পাশই ব্যবহার করা যায়। লং রেইনকোটে দুই ধরনের হুডির দেখা মিলবে— লং ও শর্ট। হুডি আলাদা করে রাখার জন্য আছে চেইন। বাজারে পাওয়া যায় যেসব রেইনকোট, তা সাধারণত পলিয়েস্টার অথবা প্যারাস্যুট কাপড়ের। এর বাইরে কম দামে পাবেন প্লাস্টিকের রেইনকোট। একরঙা রেইনকোটগুলো পাবেন বিভিন্ন ব্র্যান্ডের লগোর ছাপসংবলিত। বেশি দামের মধ্যে ডার্বিসুপার, কমফোর্ট, ব্রিদবেল, রেড চ্যাম্পিয়ন ইত্যাদি ব্যান্ডের রেইনকোট বেশি জনপ্রিয়। দীর্ঘদিন ব্যবহারও করা যায়। আর কম দামের মধ্যে আছে প্যারাস্যুট, বিগবস, ফিলিপস, পলিয়েস্টার, ওয়াটারপ্রুফ। তবে প্লাস্টিকের রেইনকোট না কিনে প্যারাস্যুট কাপড়ের রেইনকোট কেনাই ভালো। কারণ, এগুলো দীর্ঘস্থায়ী। রেইনকোট বৃষ্টি থেকে বাঁচার জন্য ব্যবহার করা হয়। বিভিন্ন সাইজের রেইনকোট পাওয়া যায় যেমন- হাফ, ফুল কিংবা শার্ট-প্যান্ট। এসব রেইনকোট ছাতার দোকানেই কিনতে পাওয়া যাবে।

দরদাম :শিশুদের জন্য রেইনকোট পাওয়া যাবে ৫০০ থেকে ৮০০ টাকার মধ্যে; এর বাইরে পালসার অথবা ডিসকভারির টু-পিস রেইনকোটগুলোর দাম পড়বে ৮০০ থেকে ৯০০ টাকা। অরবিটের ওভারকোট রেইনকোটের দাম পড়বে ৭০০ থেকে ১,০০০ টাকার মধ্যে। পিভিসি কাপড়ের রেইনকোট পাওয়া যাবে ৭০০ থেকে ১,০০০ টাকার মধ্যে। ফুজির দাম পড়বে ১,২০০ থেকে ১,৫০০ টাকা। ডার্বিসুপার, কমফোর্ট, ব্রিদবেল, রেড চ্যাম্পিয়ন ব্যান্ডের রেইনকোট পাবেন ১,৭০০ টাকার মধ্যে। আরও কম দামে বড়দের রেইনকোট পাবেন নোভানা, ইসক্লিপে। দাম প্রায় ৬০০ টাকা। ব্র্যান্ড ও কোয়ালিটিভেদে দামের তারতম্য হয়ে থাকে।

কোথায় পাবেন :রাজধানীর বিভিন্ন মার্কেটে আপনি দেশি-বিদেশি পছন্দসই রেইনকোট পেয়ে যাবেন। এসব মার্কেটের মধ্যে সদরঘাট, কর্ণফুলি, বায়তুল মোকাররম, নিউমার্কেট, মিরপুর-১, বসুন্ধরা সিটি, মৌচাক মার্কেট, বেইলি স্টার, ইস্টার্ন প্লাজা উল্লেখযোগ্য। এছাড়াও ব্র্যান্ডের রেইনকোট বিভিন্ন মেগা সপে পাওয়া যায়।

তাছাড়া আকর্ষণীয় ছাতা, জুতা, রেইনকোট, ব্যাগ কিনতে আপনার এখন ঘরে বসেই অর্ডার করতে পারেন অনলাইনে। এতে থাকে বিভিন্ন ডিসকাউন্ট এবং হোম ডেলিভেরির ব্যবস্থা। এ ছাড়াও রয়েছে দারাজ, ইভেলি, আজকের ডিল, পিকাবো, বাগডুমসহ বিভিন্ন ওয়েব সাইট। এসব অনলাই শপ থেকেও আপনি অনলাইনের মাধ্যমে পছন্দসই প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কিনতে পারবেন।