পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচন একটি পর্যালোচনা

সম্প্রতি পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনে মমতা ব্যানার্জির নেতৃত্বাধীন তৃণমূল কংগ্রেস বিপুল ভোটাধিক্যে দুই-তৃতীয়াংশ আসনে বিজয়ী হয়ে তৃতীয়বারের মতো সরকার গঠন করেছে। ভারতীয় জনতা পার্টি তাদের প্রত্যাশিত আসন না পেলেও ৭৭টি আসন পেয়ে শক্তিশালী বিরোধী দল হিসেবে বিধানসভায় ভূমিকা রাখার সুযোগ পেয়েছে। বামফ্রন্ট ও কংগ্রেস সব ভবিষ্যদ্বাণীকে মিথ্যা প্রমাণ করে শূন্যতে অবস্থান করছে। নির্বাচনে তাদের শরিক ইন্ডিয়ান সেক্যুলার ফ্রন্ট (আইএসএফ) একটি আসন পেয়ে প্রদীপ জ্বালানোর সুযোগ পেয়েছে।

নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতামত ছিল—বামফ্রন্ট, কংগ্রেস ও আইএসএফের সমন্বয়ে গঠিত সংযুক্ত মোর্চা উল্লেখযোগ্য আসন পাবে এবং তাদের প্রাপ্ত ভোট ১৫ থেকে ২৫ শতাংশের মধ্যে হতে পারে। কোনো দল একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পেলে সংযুক্ত মোর্চা সরকার গঠনে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। কিন্তু কোনো ভবিষ্যদ্বাণীই কাজে আসেনি। পশ্চিমবঙ্গের মানুষ বিপুল ভোটে মমতাকেই সরকার গঠনের জন্য বেছে নিয়েছে।

নির্বাচনি ফলাফলটা এমন হলো কেন? নানাজনের নানা মত আছে। বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণেরও শেষ নেই। বামের ভোট রামে গেছে—এ অভিযোগ গত লোকসভা নির্বাচনের মতো এবারও বিভিন্ন মহল থেকে বলা হয়েছে। আসলে কি তা-ই? আমার বক্তব্য একেবারেই এর বিপরীত। এই প্রথমবারের মতো বামফ্রন্ট ও কংগ্রেসের ভোটাররা নিজ সিদ্ধান্তে তাদের অপছন্দের দল তৃণমূল কংগ্রেসকে বিজয়ী করার জন্য নীরবে ভোট দিয়েছে। স্বাভাবিকভাবে প্রশ্ন আসবে, কেন তারা নিজেদের সম্ভাবনাকে ধরে রাখার চেষ্টা করল না। যে দল তাদের রাজনৈতিক অধিকার হরণ করে নির্যাতন-নিপীড়ন করেছে, তাদের বিজয়ী করার ক্ষেত্রে কেন তারা ভূমিকা রাখল?

পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনের প্রেক্ষাপট এবং কেন্দ্রীয় সরকারের প্রত্যক্ষ হস্তক্ষেপ এবং নানামুখী তত্পরতা ও বক্তব্য যদি আমরা বিশ্লেষণ করি, তাহলে বোধহয় আমরা ভোটারদের মনস্তত্ত্ব বুঝতে পারব। কেন্দ্রে বিজেপি সরকার গঠনের পর থেকেই ভারতের ধর্মনিরপেক্ষতার আদর্শের বিপরীতে একটি হিন্দু রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য আরএসএসের পরিকল্পনা অনুযায়ী রাষ্ট্র পরিচালনার নীতি গ্রহণ করে। বিজেপির উগ্র আচরণ কখনো কখনো কেন্দ্রীয় সরকারের সমর্থন পাওয়ায় ভারতের অসাম্প্রদায়িক বিপুলসংখ্যক মানুষ সরকারের বৈষম্যমূলক আচরণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদমুখর হয়ে ওঠে। ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে সর্বভারতীয় এবং আঞ্চলিক ধর্মনিরপেক্ষ রাজনৈতিক দলসমূহ ঐক্যবদ্ধ হয়ে বিজেপি এবং তার সমমনা শক্তির বিরুদ্ধে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছে। অন্যদিকে নতুন নাগরিকত্ব আইনে নানা ফন্দিফিকির করে মুসলমানদের বিদেশি হিসেবে চিহ্নিত করে ভোটাধিকার ও নাগরিকত্ব ছিনিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা নিয়েছে বিজেপি সরকার। আসামে প্রথমবারের মতো বিজেপি সরকার গঠন করার পর এই নতুন নাগরিকত্ব আইনে কয়েক লক্ষ মানুষকে জেলে পাঠানো হয়েছে। এমনই প্রেক্ষাপটে পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনের দিকে তাকিয়ে থাকল পুরো ভারতবর্ষ।

এ কথা সত্য যে, মমতা ব্যানার্জির নেতৃত্বে তৃণমূল গত দুই মেয়াদের শাসনামলে জনকল্যাণে বেশকিছু ব্যতিক্রমী কর্মসূচি গ্রহণ করেছে, যা মানুষ ইতিবাচকভাবে নিয়েছে। বিভিন্ন ক্ষেত্রে অবকাঠামোগত উন্নয়নও হয়েছে পশ্চিমবঙ্গব্যাপী, সেটাও দৃশ্যমান। ব্যক্তি মমতা ব্যানার্জির সাধারণ জীবনযাপন এবং সততা নিয়েও সাধারণের প্রশ্ন নেই। কিন্তু ব্যাপক দুর্নীতি এবং বিরোধী দল, বিশেষ করে বামফ্রন্টের ওপর নির্যাতন, নিপীড়ন অস্বাভাবিক পরিস্থিতির সৃষ্টি করে। বামফ্রন্টের অফিস দখল এবং নেতাকর্মীদের এলাকাছাড়া করা হয়। মামলা-হামলা চলে সর্বস্তরে। স্থানীয় সরকার পরিষদের তিনটি স্তরের গ্রাম পর্যায়ে গ্রাম পঞ্চায়েত, ব্লক পর্যায়ে পঞ্চায়েত সমিতি এবং জেলা স্তরে জেলা পরিষদ নির্বাচনে বামফ্রন্ট, কংগ্রেসসহ অন্যান্য দলকে অধিকাংশ স্থানে নির্বাচনেই অংশগ্রহণ করতে দেওয়া হয়নি। ব্যাপক সন্ত্রাস, বোমাবাজি করে ত্রাসের রাজত্ব করা হয়। এক কথায় বামফ্রন্টকে মাথা তুলে দাঁড়াতেই দেয়নি তৃণমূল। এ সময় বামফ্রন্টের বেশ কিছু নেতাকর্মী নিহত হন, আহতের সংখ্যাও কম নয়। জীবন বাঁচানোর জন্য অনেকে নিষ্ক্রিয় হয়ে যায়। আবার কেউ কেউ তৃণমূলে যোগ দেন। ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে বামফ্রন্টের কর্মী-সমর্থকদের একটা বড় অংশ তৃণমূলের বিরুদ্ধে বিজেপিকে ভোট দেয়। বামফ্রন্টের ভোট রাতারাতি এক-চতুর্থাংশে নেমে এসে দাঁড়ায় ৭.৫ শতাংশ। পশ্চিমবঙ্গের ৪২টি লোকসভা আসনের মধ্যে বিজেপি লাভ করে ১৮টি আসন, তৃণমূল ২২টি এবং কংগ্রেস দুটি। বামফ্রন্ট কোনো আসন পায়নি।

সদ্য সমাপ্ত পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনকে বিজেপি চ্যালেঞ্জ হিসেবে গ্রহণ করে। যে কোনো মূল্যেই হোক, পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির সরকার গঠন করতে হবে। শুভেন্দু অধিকারী, রাজীব বন্দ্যোপাধ্যায়সহ তৃণমূলের বিধায়ক এবং বিভিন্ন স্তরের নেতাদের নানাভাবে প্রলোভিত করে বিজেপিতে যোগ দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ, উত্তর প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ, কেন্দ্রীয় মন্ত্রী স্মৃতি ইরানি, জে পি নাড্ডা, বিজয় বর্গী ঘনঘন পশ্চিমবঙ্গ সফর করে রোড শো এবং বক্তৃতা দেওয়া শুরু করে। ভারতের বিভিন্ন রাজ্যের বিজেপি নেতাদের পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জেলার দায়িত্ব দেওয়া হয়। মোদি, অমিত শাহ, দিলীপ ঘোষ, শুভেন্দুর আক্রমণাত্মক বক্তব্য মানুষের মাঝে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। অমিত শাহ প্রকাশ্যে ঘোষণা করেন, পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি সরকার গঠন করার পর নাগরিকত্ব আইন কার্যকর করে বাংলাদেশ থেকে আসা সব মুসলমানকে বের করে দেওয়া হবে। এছাড়াও বিজেপি নেতাদের দেহের ভাষা এবং বক্তব্য মানুষের মধ্যে একধরনের আতঙ্ক তৈরি করে।

এদিকে বামফ্রন্ট, কংগ্রেস ও ফুরফুরা শরিফের পিরজাদা আব্বাসের দল আইএসএফ সমন্বয়ে গঠিত হয় সংযুক্ত মোর্চা। ফলে নির্বাচনি প্রচারে ত্রিমুখী অবস্থান তৈরি হয়। বামফ্রন্ট প্রবীণ নেতা সুজন চক্রবর্তী, অশোক ভট্টাচার্য, কান্তি গাঙ্গুলি, মো. সেলিম, তন্ময় ভট্টাচার্য, সুশান্ত ঘোষের পাশাপাশি দিল্লির জওহরলাল নেহেরু বিশ্ববিদ্যালয়, কলকাতার যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জনপ্রিয় ছাত্র ও যুবসংগঠনের নেতাদের এবারের নির্বাচনে মনোনয়ন দেয়। এই জনপ্রিয় এবং ত্যাগী সাহসী তরুণ নেতারা নির্বাচনে অংশগ্রহণ করায় সাধারণ মানুষের কাছে বামফ্রন্টের একটি ইতিবাচক অবস্থান তৈরি হয়। নিষ্ক্রিয় বহু নেতাকর্মী আবার সংগঠনে ফিরে আসেন। বিভিন্ন জেলায় দখল হয়ে যাওয়া পার্টি অফিসগুলো আবার পার্টির নিয়ন্ত্রণে চলে আসে। নির্বাচনি সভা-সমাবেশে মানুষের ব্যাপক উপস্থিতি নতুন আশার সঞ্চার করে। এছাড়াও নতুন নেতৃত্বের যুক্তিপূর্ণ বক্তব্য এবং ব্যতিক্রমী নির্বাচনি প্রচারণায় বামফ্রন্টের হারানো জমি ফিরে পাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়। যার কারণে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা এবারের নির্বাচনকে ত্রিমুখী হওয়ার সম্ভাবনার কথা বলেছিলেন।

নির্বাচনের দিন যতই ঘনিয়ে আসছিল, আমি আমার সহকর্মীদের বলছিলাম, বামফ্রন্টের নির্বাচনি ফল খুব খারাপ হতে পারে। আমাকে তখন তারা বলল, আপনি বামফ্রন্ট নিয়ে এত উত্ফুল্ল ছিলেন, এখন বলছেন ফল খুব খারাপ হবে! নির্বাচনের পর হলোও তাই—আমার ধারণারও বাইরে।

আমার ধারণা, বামফ্রন্ট নির্বাচনে একটি আসন না পেলেও সাধারণ মানুষের কাছে তাদের গ্রহণযোগ্যতা এবং সমর্থন বেড়েছে। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন আসে—সমর্থন ও জনপ্রিয়তা বাড়লে ভোট পেল না কেন? যৌক্তিক প্রশ্ন। ভোট পাওয়া নির্ভর করে অনেকগুলো ফ্যাক্টরের ওপর। এবারের নির্বাচনে বিজেপির আক্রমণাত্মক প্রচার, তাদের উগ্র সাম্প্রদায়িক কর্মসূচি কেন্দ্রের ক্ষমতার অপব্যবহার এবং অযাচিত হস্তক্ষেপ পশ্চিমবঙ্গের সচেতন মানুষ পছন্দ করেনি। বিজেপি ক্ষমতায় এসে গেলে জনজীবনে কী ধরনের নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি তৈরি হবে—মানুষ তা নিয়েও শঙ্কিত হয়ে ওঠে। সংখ্যালঘু মুসলিম সম্প্রদায় ভাবল, বিজেপি ক্ষমতায় এলে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা এবং নাগরিকত্বের নামে কনসেনট্রেশন ক্যাম্পে ঢুকিয়ে দিতে পারে। তাদের মধ্যেও একটা নীরব ভীতি কাজ করেছে।

সাধারণ ভোটাররা ভাবল, কাকে ভোট দিলে বিজেপিকে ঠেকানো যাবে। বামফ্রন্ট ও কংগ্রেসের প্রতি দুর্বলতা ও নৈতিক সমর্থন থাকা সত্ত্বেও তাদের সমর্থক এবং সাধারণ মানুষ ভাবল—ঝুঁকি নিয়ে লাভ নেই। শত সমালোচনা থাকা সত্ত্বেও তৃণমূলকেই আবার ভোট দিই, তাহলে বিজেপিকে পরাজিত করা যাবে। একই কারণে মালদহ, বহরমপুর, দুই দিনাজপুর জেলার কংগ্রেস-বামফ্রন্টের সমর্থক মুসলিম ভোটাররা কোনো ঝুঁকি না নিয়ে বিজেপিকে ঠেকানোর জন্য তৃণমূলকেই ভোট দিয়েছে। পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনে সাম্প্রদায়িক শক্তির বিরুদ্ধে অসাম্প্রদায়িক শক্তির বিজয় হয়েছে—এটাই সত্য, এটাই বাস্তব। মনে রাখতে হবে, তৃণমূল জয়লাভ করলেও এর পেছনে বামফ্রন্ট, কংগ্রেসের সমর্থকদের ভূমিকাও কম ছিল না।

বিজেপির আক্রমণাত্মক প্রচারণা, নেতাদের উগ্র সাম্প্রদায়িক বক্তব্য সাধারণ ভোটার এবং সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে তৃণমূলের দিকে ঠেলে দিয়েছে—এই সত্যটি বুঝতে না পারা সংযুক্ত মোর্চার সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক ব্যর্থতা। ভোটাররা ভেবেছে সংযুক্ত মোর্চাকে ভোট দিলে বিজেপিকে ঠেকানো যাবে না—তার চেয়ে তৃণমূলকেই ভোটটা দিয়ে দিই—বিজেপিকে ঠেকাই। কোনো ক্যারিশমা নয়, সংযুক্ত মোর্চার সাংগঠনিক শক্তির প্রতি সন্দিহান হয়েই শত সমালোচনা সত্ত্বেও মানুষ তৃণমূলকে ভোট দিয়েছে। এ নির্বাচনের ফলাফলে বিজেপির জনসমর্থনে ভাটা পড়বে এবং পশ্চিমবঙ্গের অসাম্প্রদায়িক চেতনার মানুষেরা আবারও সাহস নিয়ে এগিয়ে যাবে।

তবে আমার বিশ্বাস, বামফ্রন্ট আসন না পেলেও সাধারণ মানুষের কাছে যে ইমেজ তারা তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে, একই রকমভাবে তাদের কর্মতত্পরতা যদি অব্যাহত রাখতে পারে, তাহলে পশ্চিমবঙ্গে আগামী দিনে বিজেপি নয়, বামফ্রন্টই হবে রাজনীতিতে মূল প্রতিদ্বন্দ্বী। কেরালায় বিপুল বিজয়, তামিলনাড়ুতে আসন বৃদ্ধি, ত্রিপুরায় হারানো ক্ষমতা ফিরে পাওয়ার সম্ভাবনা পশ্চিমবঙ্গে পরাজয়ের ওপর রাজনৈতিক মলম হিসেবে কাজ করবে নিঃসন্দেহে।

n লেখক : গবেষক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব