কয়লানির্ভর বিদ্যুত্ প্রকল্প কমানোর পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে সরকার। অনুমোদন দেওয়া হলেও কাজ শুরু হয়নি এমন অন্তত ৯টি প্রকল্প বাতিল করা হবে। কয়লাভিত্তিক যে প্রকল্পগুলো বাতিল করা হবে তার মধ্যে কয়েকটি এলএনজি-চালিত বিদ্যুেকন্দ্র হিসেবে নির্মাণ করা হতে পারে।
বিদ্যুত্, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, বিদ্যুত্চাহিদা বৃদ্ধির ধীরগতি এবং কয়লা ব্যবহারে পরিবেশের ক্ষতি ও আমদানি-সংরক্ষণ পরিবহন জটিলতার কারণে এমন পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। উত্স জ্বালানি বা বিদ্যুত্ উত্পাদনে প্রয়োজনীয় জ্বালানি নিয়ে উভয় সংকট তৈরি হয়েছে। দেশে গ্যাসের প্রমাণিত মজুত তলানিতে। স্থলভাগে নতুন গ্যাসক্ষেত্র খুব বেশি পাওয়ার সম্ভাবনা কম। সমুদ্রভাগে বিপুল সম্ভাবনা থাকলেও তা এখনো ফাইলবন্দি অবস্থায় রয়েছে। এর বাইরে বিকল্প তিনটি। কয়লা, তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানি এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি। কয়লাভিত্তিক বিদ্যুতের খরচ অপেক্ষাকৃত কম হলে এই জ্বালানি আমদানি করা ও সংরক্ষণ করা বেশ কঠিন। দেশে বিপুল পরিমাণ কয়লা খালাস ও সংরক্ষণের জন্য পর্যাপ্ত অবকাঠামো গড়ে তোলাও চ্যালেঞ্জিং। আবার কয়লা পরিবেশের জন্যও ক্ষতিকর। আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারে ক্ষতি হয়তো কমানো যায়, কিন্তু তা বন্ধ করা যায় না। চীন ছাড়া উন্নত দেশগুলো কয়লা প্রকল্পে অর্থায়ন-বিনিয়োগও বন্ধ করে দিচ্ছে। তাই অপেক্ষাকৃত কম খরচের এ বিদ্যুত্ উত্পাদন প্রকল্প কমাতে হচ্ছে সরকারকে।
বিদ্যুত্ বিভাগের এক শীর্ষ কর্মকর্তা বলেন, ২০৩০ এবং ২০৪১ সাল পর্যন্ত বিদ্যুতের চাহিদা এবং এর জন্য প্রয়োজনীয় উত্স জ্বালানির চাহিদা বিবেচনায় নিয়ে কয়লা বিদ্যুত্ প্রকল্পের সংখ্যা কমানো এবং এলএনজি প্রকল্পের সংখ্যা বাড়ানোর নীতিগত সিদ্ধান্ত রয়েছে। এক্ষেত্রে যেসব কয়লা বিদ্যুত্ প্রকল্প অনুমোদন পেয়েও কাজ শুরু করেনি সেগুলো বাতিল করাই যৌক্তিক। এমন ১৩টি প্রকল্পের বিস্তারিত জানিয়ে একটি সারপত্র গত সপ্তাহে প্রধানমন্ত্রীর কাছে উপস্থাপনের জন্য পাঠানো হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা-সিদ্ধান্ত পাওয়ার পর তা বাস্তবায়ন করবে মন্ত্রণালয়। তিনি জানান, বাস্তবায়িত না হওয়া ১৩টি প্রকল্প প্রাথমিকভাবে বাতিলের সুপারিশ করা হলেও নানা বিবেচনায় কয়েকটি প্রকল্প বাতিল হবে না। সবমিলিয়ে ৯টি প্রকল্প বাতিল হতে পারে।
সরকারের নতুন পরিকল্পনায় ২০৩০ সালে বিদ্যুত্ উত্পাদন ৪৮ হাজার ৮৭৮ মেগাওয়াটে দাঁড়াবে। এর মধ্যে কয়লা থেকে বিদ্যুত্ উত্পাদিত হবে ১৩ হাজার ৯৫৯ মেগাওয়াট। বাংলাদেশ বিদ্যুত্ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) সূত্র জানায়, বর্তমানে দেশের বিদ্যুেকন্দ্রগুলোর সম্মিলিত উত্পাদন ক্ষমতা দৈনিক ২০ হাজার ৩৮৩ মেগাওয়াট। এর বিপরীতে দৈনিক বিদ্যুত্ ব্যবহূত হয় গড়ে ১০ হাজার মেগাওয়াট। চাহিদা থাকা সত্ত্বেও সঞ্চালন ও বিতরণ লাইনে অক্ষমতা-ত্রুটির কারণে সক্ষমতার অনেকখানি ব্যবহার করা যাচ্ছে না।
বিদ্যুত্ বিভাগ সূত্র জানায়, সরকার মোট ২৩টি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুেকন্দ্র নির্মাণের অনুমোদন দিয়েছে। এখন পর্যন্ত নির্মিত হয়েছে তিনটি। নির্মাণাধীন রয়েছে সাতটি। কাজ শুরু হয়নি ১৩টির। কয়লা বিদ্যুতের বাস্তবায়িত তিনটি প্রকল্প হলো—পটুয়াখালীর পায়রায় ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট বিদ্যুত্ কেন্দ্র এবং বড়পুকুরিয়ার দুইটি কেন্দ্র। এ দুই কেন্দ্রের উত্পাদনক্ষমতা ৫২৫ মেগাওয়াট। সরকারি, বেসরকারি ও যৌথ বিনিয়োগের নির্মাণাধীন প্রকল্পগুলো হলো— সিপিজিসিবিএলের কক্সবাজারে মাতারবাড়ী ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট আলট্রা সুপার ক্রিটিক্যাল তাপবিদ্যুত্ কেন্দ্র, এসএস পাওয়ারের চট্টগ্রামে ১ হাজার ২২৪ মেগাওয়াট, বরিশাল ইলেক্ট্রিক পাওয়ার কোম্পানির ৩০৭ মেগাওয়াট কেন্দ্র, বিআইএফপিসিএলের রামপালে ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট কেন্দ্র, বিসিপিসিএলের পায়রায় দ্বিতীয় ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট কেন্দ্র এবং আরপিসিএল ও নরিনকো ইন্টারন্যাশনালের পুটয়াখালীতে ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট বিদ্যুেকন্দ্র। এ প্রকল্পগুলোর কয়েকটির কাজ প্রায় ৫০ শতাংশ এগিয়েছে।
এদিকে কয়েক দফায় সময় নিয়েও নির্ধারিত সময়ে কাজ শুরু করতে না পারা কেন্দের্র সংখ্যা ১৩টি। এগুলোর মধ্যে রয়েছে :মাতারবাড়ীতে দ্বিতীয় পর্যায়ে ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুেকন্দ্র, এপিএসসিএলের পটুয়াখালী ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট কেন্দ্র ও উত্তরবঙ্গ ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট কেন্দ্র, ওরিয়নের মাওয়া ৫২২ মেগাওয়াট কেন্দ্র, গজারিয়া ৬৩৫ মেগাওয়াট কেন্দ্র, ঢাকা ২৮২ মেগাওয়াট কেন্দ্র, চট্টগ্রাম ২৮২ মেগাওয়াট কেন্দ্র ও খুলনা ৫৬৫ মেগাওয়াট বিদ্যুেকন্দ্র। কাজ শুরু হয়নি চট্টগ্রামে হংকংভিত্তিক কনসোর্টিয়ামের মিরসরাই ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট বিদ্যুেকন্দ্রের, মহেশখালীতে বে অব বেঙ্গল পাওয়ার কোম্পানির ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াটের, সিপিজিসিবিএল-সুমিতমো করপোরেশনের ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াটের, মহেশখালীতে পিডিবির ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াটের এবং সিপিজিসিবিএলের বাংলাদেশ-সিঙ্গাপুর ৭০০ মেগাওয়াট বিদ্যুেকন্দ্রের।