খুলনা ও রাজশাহী বিভাগে করোনা সংক্রমণ বাড়ছেই

সীমান্তবর্তী জেলাগুলোসহ খুলনা ও রাজশাহী বিভাগে করোনার সংক্রমণ আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে। খুলনা বিভাগে গতকাল সোমবার পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় করোনা ভাইরাসে মৃত্যু কমলেও বেড়েছে শনাক্তের সংখ্যা। সংক্রমণ রোধে আজ মঙ্গলবার থেকে সাত দিন খুলনা জেলা ও মহানগরীতে লকডাউন ঘোষণা করা হয়েছে। বাগেরহাটে করোনা শনাক্তের হার ৪৩ শতাংশ, করোনার হটস্পট মোংলায় সংক্রমণ বাড়ছে লাফিয়ে লাফিয়ে। মোংলায় সংক্রমণের হার ৬৭ শতাংশ।  যশোরে ৬৪৫ জনের নমুনা পরীক্ষা করে ৩০৫ জনের শরীরে করোনা শনাক্ত হয়েছে, শনাক্তের হার ৪৭ শতাংশ। রাজশাহীতে টানা ১১ দিনের সর্বাত্মক লকডাউনেও কমেনি করোনার সংক্রমণ ও মৃত্যু। রাজশাহীর গ্রামাঞ্চলে সংক্রমণের হার বেশি। গতকাল সোমবারও ১৩ জনের মৃত্যু হয়েছে রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে। ইত্তেফাকের অফিস, প্রতিনিধি, স্টাফ রিপোর্টার ও সংবাদদাতাদের পাঠানো খবর :

খুলনা অফিস :২৪ ঘণ্টায় বিভাগে করোনায় আক্রান্ত হয়ে ১২ জনের মৃত্যু হয়েছে, যা আগের দুই দিনের তুলনায় কম। একই সময়ে বিভাগে ৯৪৫ জনের শরীরে করোনার উপস্থিতি পাওয়া গেছে। গতকাল  দুপুরে বিভাগীয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক ডা. রাশেদা সুলতানা এ তথ্য নিশ্চিত করেন। বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালকের দপ্তর সূত্র জানায়, গত ২৪ ঘণ্টায় খুলনায় তিন জন, কুষ্টিয়ায় তিন জন, ঝিনাইদহে দুই জন, চুয়াডাঙ্গায় এক জন, যশোরে এক জন, বাগেরহাটে এক জন এবং নড়াইলে এক জন মারা গেছেন।

এর আগে রবিবার সর্বোচ্চ ২৮ জনের মৃত্যু এবং ৭৬৩ জনের করোনা শনাক্তের কথা জানানো হয়েছিল। তার আগে শনিবার ২২ জনের মৃত্যু এবং ৬২৫ জনের করোনা শনাক্ত হয়েছিল। সেই তুলনায় গতকাল সোমবার কমেছে করোনায় মৃতের সংখ্যা। তবে বেড়েছে শনাক্তের সংখ্যা। খুলনা বিভাগের মধ্যে প্রথম করোনা রোগী শনাক্ত হয় চুয়াডাঙ্গায়, গত বছরের ১৯ মার্চ। করোনা সংক্রমণের শুরু থেকে সোমবার সকাল পর্যন্ত বিভাগের ১০ জেলায় মোট শনাক্ত হয়েছেন ৪৫ হাজার ৯৭৭ জন। আক্রান্ত হয়ে মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৮৩৭। এ সময় সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন ৩৪ হাজার ৬২৭ জন।

বিভাগীয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের জেলাভিত্তিক করোনাসংক্রান্ত তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, খুলনায় ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে শনাক্ত হয়েছে ১৭৫ জনের। এ নিয়ে জেলায় মোট করোনা শনাক্ত হয়েছে ১২ হাজার ৯৯৬ জনের। মারা গেছেন ২১১ জন এবং সুস্থ হয়েছেন ১০ হাজার ৫৪ জন।

 খুলনা জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ হেলাল হোসেন স্বাক্ষরিত গণবিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়েছে, ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব বৃদ্ধির কারণে ২২ থেকে ২৮ জুন পর্যন্ত সব ধরনের দোকানপাট, মার্কেট, শপিংমল ও কোচিং সেন্টারসমূহ বন্ধ থাকবে। তবে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য ও কাঁচাবাজারের দোকান প্রতিদিন সকাল ৭টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত খোলা থাকবে। উক্ত সময়ের মধ্যে হোটেল-রেস্তোরাঁগুলো পার্সেল আকারে খাবার সরবরাহ করতে পারবে। স্বাস্থ্যবিধি মেনে ব্যাংকে লেনদেন চলবে সকাল ১০টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত। ওষুধের দোকান সার্বক্ষণিক খোলা রাখা যাবে। জেলার অভ্যন্তরে অথবা আন্তঃজেলা গণপরিবহন চলাচল বন্ধ থাকবে। খুলনা রেলওয়ে স্টেশনে ট্রেনের আগমন ও বহির্গমন বন্ধ থাকবে।

বাগেরহাট :জেলায় করোনার সংক্রমণ বেড়ে চলেছে। করোনার হটস্পট মোংলা উপজেলায় তিন দফায় কঠোর বিধিনিষেধ দিয়েও তা নিয়ন্ত্রণে রাখা যাচ্ছে না। স্বাস্থ্যবিধি না মানায় করোনা সংক্রমণের হার বাড়ছে বলে মনে করছে স্বাস্থ্য বিভাগ। বাগেরহাটে গত ২৪ ঘণ্টায় করোনায় আক্রান্ত হয়ে এক জনের মৃত্যু হয়েছে। নতুন করে আরো ৮৬ জনের শরীরে করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ ধরা পড়েছে। জেলায় গত ২৪ ঘণ্টায় সংক্রমণের হার প্রায় ৪৩ শতাংশ। জেলার সবচেয়ে ঝুঁকিতে থাকা মোংলা উপজেলায় ১৬ জনের শরীরে সংক্রমণ ধরা পড়ে। সেখানে সংক্রমণের হার ৬৭ শতাংশ, যা গত ২৪ ঘণ্টার তুলনায় ২২ শতাংশ বেশি। উপজেলায় তৃতীয় দফায় বাড়ানো সাত দিনের কঠোর বিধি ঢিলেঢালাভাবে চলছে।

সাতক্ষীরা :প্রায় এক সপ্তাহ পর সংক্রমণের হার ৫০-এর নিচে নেমেছে। গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে আরো ৫০ জনের শরীরে করোনা শনাক্ত হয়েছে। এদিকে গত ২৪ ঘণ্টায় সাতক্ষীরা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে করোনার উপসর্গ নিয়ে দুই নারীসহ আরো তিন জন মারা গেছেন। লকডাউন ও বৃষ্টি উপেক্ষা করে মানুষ হাটবাজারে ভিড় করছে।

যশোর অফিস :যশোরের সিভিল সার্জন ডা. শেখ আবু শাহীন জানিয়েছেন, যশোরে গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ৩০৫ জনের করোনা শনাক্ত হয়েছে। ৬৪৬ জনের নমুনা পরীক্ষা করে এই রোগী শনাক্ত হয়েছে, যা সর্বোচ্চ রেকর্ড। শনাক্তের হার ৪৭ শতাংশ। এই সময়ে মারা গেছেন চার জন। যশোর জেনারেল হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, গত ২৪ ঘণ্টায় করোনায় আক্রান্ত হয়ে ৫১ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। বর্তমানে হাসপাতালে কোনো শয্যা খালি নেই। তিন শয্যার আইসিইউ ইউনিটও রোগীতে পূর্ণ।

যশোর হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. আখতারুজ্জামান বলেন, প্রতিদিনই হাসপাতালে করোনা রোগীর চাপ বাড়ছে। শয্যার চেয়ে বেশি রোগী ভর্তি করতে হচ্ছে। রোগীর চাপ সামাল দিতে আরো ৫০ শয্যার দুটি করোনা ওয়ার্ড প্রস্তুত করা হচ্ছে। এর মধ্যে ২৫ শয্যার একটি ওয়ার্ডের প্রস্তুতি শেষ হয়েছে।

যশোরে বাড়ছে করোনা আক্রান্ত ও মৃত্যুর মিছিল। দিনে দিনে ভয়ংকর হয়ে উঠছে করোনা পরিস্থিতি। শনাক্তের এই ঊর্ধ্বগতি রুখতে কঠোর বিধিনিষেধ কার্যকরে কাজ করছে জেলা প্রশাসন। তবে পরিস্থিতি ভয়াবহ হলেও সাধারণ মানুষের মধ্যে এখনো বিধিনিষেধ প্রতিপালনে গাফিলতি রয়েছে। ২৩ জুন মধ্যরাত পর্যন্ত বিধিনিষেধের সময়সীমা ও পরিধি বৃদ্ধি করা হয়েছে।

স্টাফ রিপোর্টার, রাজশাহী :রাজশাহীতে করোনায় আক্রান্ত ও মৃত্যুর লাগাম টানা যাচ্ছে না। ভারতীয় সীমান্তবর্তী জেলা রাজশাহী শহরে টানা ১১ দিনের সর্বাত্মক লকডাউনেও কমেনি করোনার সংক্রমণ ও মৃত্যু; বরং সংক্রমণ ও মৃত্যুর ঘটনা বাড়ছেই। এদিকে রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ (রামেক) হাসপাতালের করোনা ইউনিটে রেকর্ডসংখ্যক রোগী ভর্তি হওয়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল শামীম ইয়াজদানী। তিনি জানান, রবিবার সকাল থেকে সোমবার সকাল পর্যন্ত নতুন ভর্তি রোগীর প্রায় ৬০ শতাংশই গ্রাম থেকে এসেছেন। এটি গ্রামের করোনা পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়ে ওঠার ইঙ্গিত দিচ্ছে। সোমবার রামেক হাসপাতালে করোনার চিকিত্সা ও সংক্রমণের সর্বশেষ পরিস্থিতি নিয়ে ব্রিফিংয়ে রামেক হাসপাতালের পরিচালক এসব কথা বলেন।

তিনি আরো বলেন, সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে (সর্বাত্মক লকডাউন ঘোষণা ও কঠোরভাবে কার্যকর) না পারায় থামানো যাচ্ছে না করোনার সংক্রমণ ও মৃত্যু। ফলে প্রতিদিনই করোনা সংক্রমণ, রোগী ভর্তি ও মৃত্যুর রেকর্ড ভাঙছে। তবে তিনি আশা প্রকাশ করে বলেন, এখনো সময় ফুরিয়ে যায়নি, সবার সম্মিলিত প্রয়াসে এই মহামারি অবশ্যই মোকাবিলা করা সম্ভব।

রামেক হাসপাতালের তথ্য বলছে, করোনা ইউনিটে গত ২৪ ঘণ্টায় আরো ১৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে চার জন পুরুষ ও ৯ জন নারী। মৃতদের ছয় জনের করোনা পজিটিভ ছিল। অন্যরা উপসর্গ নিয়ে চিকিত্সাধীন অবস্থায় মারা যান। মৃতদের তিন জন রাজশাহীর, ছয় জন চাঁপাইনবাবগঞ্জের, তিন জন নাটোরের এবং এক জন নওগাঁর। এ নিয়ে চলতি মাসের গত ২১ দিনে এই হাসপাতালের করোনা ইউনিটে মারা গেলেন ২১৬ জন। এদের মধ্যে নমুনা পরীক্ষায় ১০৫ জনের করোনায় আক্রান্তের বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া গেছে। পরিচালক জানান, রামেক হাসপাতালে করোনা ও উপসর্গে ভর্তি হয়েছেন ৬২ জন। এদের মধ্যে গ্রাম থেকে এসেছেন ৩৬ জন এবং শহরের ২৬ জন। এদিকে করোনার সংক্রমণ অব্যাহত থাকায় করোনা রোগীদের চাপে আরো বেসামাল হয়ে পড়েছে রামেক হাসপাতাল। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে করোনা রোগীদের জন্য রামেক হাসপাতালের ১৭ নম্বর সাধারণ ওয়ার্ডকে করোনা ইউনিটের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ :২৬০ শয্যাবিশিষ্ট চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা হাসপাতালে আরটিপিসিআর ল্যাব না থাকায় করোনা রোগী শনাক্তে দিনের পর দিন অপেক্ষা করতে হচ্ছে। পাশাপাশি আইসিইউ ও সিসিইউ না থাকায় করোনা রোগীর মৃত্যুর হার বৃদ্ধি পাচ্ছে।

স্টাফ রিপোর্টার, রংপুর :রংপুর বিভাগের আট জেলায় গতকাল সকাল পর্যন্ত নতুন করে ২৫৭ জন করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন। এই সময়ে রংপুর জেলায় এক জন, দিনাজপুরে তিন জন, ঠাকুরগাঁওয়ে তিন জন এবং কুড়িগ্রামে এক জনের মৃত্যু হয়েছে। রংপুর বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, গতকাল পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় দিনাজপুরে ১২৩, ঠাকুরগাঁওয়ে ৭৭, কুড়িগ্রামে ২২, রংপুরে ১২, গাইবান্ধায় ১২, পঞ্চগড়ে পাঁচ, নীলফামারীতে পাঁচ এবং লালমনিরহাট  জেলায় এক জন করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন।

জয়পুরহাট :জয়পুরহাট জেলা ক্লিনিক মালিক সমিতির সভাপতি ডা. কে এম সাইফুল ইসলাম ডেভিড (৬৫) সোমবার সকালে মারা যান। এ ছাড়া জেলা শহরের আরামনগর এলাকার খবির উদ্দিন মণ্ডল (৭০) নামে এক জনের করোনায় মৃত্যু হয়েছে।  অন্যদিকে ৯১ জনের শরীরে করোনা শনাক্ত হয়েছে।

নাটোর :করোনা ও উপসর্গ নিয়ে মারা গেছেন সাত জন। এর মধ্যে করোনায় আক্রান্ত মারা গেছেন তিন জন। বাকি চার জন করোনার উপসর্গ নিয়ে মৃত্যুবরণ করেছেন।

দুর্গাপুর (নেত্রকোনা) :নেত্রকোনার দুর্গাপুর উপজেলায় একই পরিবারের আট জনসহ মোট ৩০ জন করোনায় আক্রান্ত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।