ভ্যাকসিন হিরোর দেশে হাহাকার কেন?

এই বত্সর ফেব্রুয়ারিতে মনে করা হইতেছিল, করোনা বুঝি দূরে সরিয়া যাইতেছে! কিন্তু বিধি বাম! মার্চে শুরু হয় নূতন আতঙ্ক। মার্চের শেষের দিকে প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতে দেখা দেয় করোনার নূতন ধরন ডেলটার আগ্রাসি আক্রমণ। বাংলাদেশেও এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহের পর করোনা নূতন করিয়া শীর্ষবিন্দু স্পর্শ করে। সারা দেশে লকডাউন দিতে বাধ্য হয় সরকার। গত কয়েক মাসে আমরা প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতে দেখিয়াছি করোনার ভয়াবহ অভিঘাত কাহাকে বলে। সেইখানে একপর্যায়ে প্রতিদিন ৪ লক্ষের অধিক মানুষ করোনায় আক্রান্ত হইতেছিল। প্রতিদিন মারা যাইতেছিল ৪ সহস্রাধিক মানুষ। সেইখানে অক্সিজেনের হাহাকার, শ্মশানে লাশ পোড়াইবার দীর্ঘ লাইনের দুঃসহ চিত্র সারা বিশ্ব বড় বড় চোখ করিয়া দেখিতেছিল। মাসাধিক কালের ব্যবধানে সেইখানে পরিস্থিতি এখন অনেকটাই ভালো। কিন্তু এত কথার অবতারণা যাহার জন্য, তাহার নাম কোভিডের ভ্যাকসিন।

সারা বিশ্বের সকল বিশেষজ্ঞই বলিতেছেন, মহামারি প্রতিরোধব্যবস্থা বা হার্ড ইমিউনিটি অর্জন করিতে হইলে জনগোষ্ঠীর প্রায় ৭০ শতাংশকে টিকার আওতায় আনিতে হইবে। ইহার জন্য অব্যর্থ দাওয়াই হইল করোনার ভ্যাকসিন। বিশ্বের উন্নত এবং বৃহত্ দেশসমূহে ১৮ বত্সরের ঊর্ধ্বে সকলের জন্য ভ্যাকসিনের প্রয়োগ চালু করা হইলেও আমরা মাত্র ৪০ বত্সরের ঊর্ধ্বের জনগণের জন্য টিকার ব্যবস্থা করিয়াও এখন বিধ্বস্ত অবস্থার মধ্যে রহিয়াছি। আওয়ার-ওয়ার্ল্ড-ইন-ডাটা জানাইতেছে, সারা বিশ্বের ২১ দশমিক ৮ শতাংশ মানুষ কমপক্ষে একটি করিয়া কোভিডের ভ্যাকসিন পাইয়াছে। কানাডা, ইসরাইল, যুক্তরাজ্যে গড়ে ৬৫ শতাংশের বেশি এবং যুক্তরাষ্ট্র, ইতালি, জার্মানি ও ফ্রান্সে গড়ে ৫০ শতাংশের বেশি জনগণ ইতিমধ্যে করোনার টিকা পাইয়া গিয়াছে। ভারতে গতকাল মঙ্গলবার এক দিনেই রেকর্ড-সংখ্যক করোনার টিকা পাইয়াছে ৮১ লক্ষাধিক মানুষ। ইতিমধ্যে ভারত প্রায় ২৯ কোটি মানুষের মধ্যে কমপক্ষে একটি ডোজ করোনা ভ্যাকসিন প্রয়োগ করিয়া ফেলিয়াছে। আর আমাদের আকাশে জমিয়াছে কৃষ্ণমেঘের ঘন আস্তরণ। বাংলাদেশ এখন অবধি অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকা, সিনোফার্ম ও ফাইজারের টিকার দুইটি করিয়া ডোজ পাইয়াছে মোট ৪৯ লক্ষ মানুষ। তাহারা দেশের জনসংখ্যার মাত্র ৩ শতাংশ।

কোভিডের টিকা সংগ্রহের কাজটি বাংলাদেশের জন্য ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি ইমার্জেন্সি সার্ভিস। এই সার্ভিসের জন্য যাবতীয় দিকনির্দেশনা ও ব্যবস্থা গ্রহণ করিয়াছিলেন প্রধানমন্ত্রী স্বয়ং। বিশ্বের যেই সকল দেশ টিকাদান কার্যক্রম প্রথম দিকে শুরু করিতে সক্ষম হইয়াছিল প্রধানমন্ত্রীর উদ্যোগেই বাংলাদেশ ছিল তাহার মধ্যে অন্যতম। অর্থাত্ আমরা যথাসময়ে শুরু করিয়াছিলাম বটে, কিন্তু এখন অথই সাগরে। কারণ, ইহার সহিত যুক্ত স্বাস্থ্যের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট অন্যান্য মন্ত্রণালয় বারংবার দায়িত্বহীনতার পরিচয় দিয়াছে। অথচ বাংলাদেশে শিশুদের টিকাদান কর্মসূচির অনন্য সাফল্যের জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০১৯ সালে জাতিসংঘ হইতে ‘ভ্যাকসিন হিরো’ সম্মাননায় ভূষিত হইয়াছিলেন। প্রশ্ন হইল, ভ্যাকসিনের হিরোর দেশে ভ্যাকসিনের হাহাকার কেন? আমাদের কোভিডের ভ্যাকসিন কার্যক্রমে কি কোনো দুষ্টচক্র প্রবেশ করিয়াছে? এই মুহূর্তে করোনা সংক্রমণের গ্রাফ আমাদের বলিয়া দিতেছে, এপ্রিল হইতে জুলাই অবধি বিভিন্ন দফায় কঠোর বিধিনিষেধ কিংবা কোথাও কোথাও কঠোর লকডাউন দেওয়া হইলেও, বাস্তবতা হইল করোনা সংক্রমণের দুরন্ত লাগাম আমরা টানিয়া ধরিতে পারি নাই। যেইভাবে ইহাকে এতদিন ধরিয়া বিবিধ বিধিনিষেধ দিয়া আটকানোর চেষ্টা করা হইয়াছে, তাহা যেন ‘বজ্র আঁটুনি ফসকাগেরো’!

চীন ও কোভ্যাক্স হইতে এখন সামান্য কয়েক লক্ষ টিকা দেশে আসিয়াছে বটে, তবে তাহা কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের লক্ষ লক্ষ শিক্ষার্থী কিংবা কয়েক কোটি শ্রমিকের মধ্যে প্রয়োগ করিয়া উচ্চ-শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কিংবা কলকারখানা চালু রাখিবার মতো অবস্থা নাই। প্রধানমন্ত্রী চেষ্টা করিতেছেন বিভিন্ন উত্স হইতে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ব্যাপক ভিত্তিতে করোনার টিকা সংগ্রহের। সুতরাং এই ইমার্জেন্সি সার্ভিসের ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রীকে সহায়তাকারী সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষকে দেশপ্রেম ও দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিতেই হইবে। এই ক্ষেত্রে কোনো হঠকারী বা দায়িত্বজ্ঞানহীনতার কোনো স্থান নাই।