ঘুম ভাঙে হাতুড়ি-বাটালির শব্দে

রূপগঞ্জ উপজেলার গোলাকান্দাইল ইউনিয়নের গাবতলী গ্রাম। এ গ্রামে অর্ধশতাধিক পরিবারের বসবাস। অধিকাংশ পরিবারের কর্তাই নৌকার মিস্ত্রি বা কারিগর। তারা বাপ-দাদার কাছ থেকে কাজের কৌশল রপ্ত করেছেন। গাবতলী এখন নৌকার গ্রাম হিসেবে পরিচিত।

ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের রূপগঞ্জের ভুলতা গাউছিয়া থেকে আড়াই কিলোমিটার দক্ষিণ পূর্বদিকে ছোট্ট এ গ্রাম। গ্রামের পাশ দিয়ে বয়ে গেছে ব্রক্ষ্মপুত্র নদ। এ গ্রাম রূপগঞ্জ, সোনারগাঁও ও আড়াইহাজার থানার ত্রিমোহনায় অবস্থিত। গ্রামের চারদিকেই বর্ষাকালে পানিতে থই থই করে। তাই এখানকার যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম নৌকা। সে কারণেই এখানে নৌকার চাহিদাও বেশি। কারিগররা নিজেদের প্রয়োজন মিটিয়ে অন্যের চাহিদা পূরণে ব্যস্ত থাকে বছরের এ সময়টায়। গাবতলী গ্রামের কারিগরদের তৈরি করা নৌকার চাহিদা আশপাশের জেলাগুলোতেও বেশি। বর্ষাকাল ছাড়াও পুকুরে মাছের খাবার দিতে, মাছ পরিবহনে, মাছ ধরতে ও বিভিন্ন খাল-বিলে চলাচলে নৌকার বিকল্প নেই।

বর্ষা শুরুর পর থেকেই প্রতিদিন ভোরে হাতুড়ি-বাটালির শব্দে ঘুম ভাঙে এ গ্রামের বাসিন্দাদের। চৈত্র, বৈশাখ, জ্যৈষ্ঠ ও আষাঢ় এই চার মাস নৌকার কারিগরদের দম ফেলাবার ফুসরত নেই। বাকি সময় জলচৌকি, কাহাইল, সাহাইড, চৌকি, টেবিল, চেয়ারসহ কাঠের নানা আসবাবপত্র তৈরি করে। প্রায় ১০০ বছর আগে এ গ্রামে পঁচু চন্দ্র ও হরচন্দ্র নামে দুই ব্যক্তি বসবাস করতেন। তারাই নৌকার আদি কারিগর।

গাবতলী গ্রামের নৌকার কারিগর হরিহর বিশ্বাস বলেন, ‘আমরা আদি পুরুষের কাছ থেকে নৌকা তৈরির কাজ শিখেছি। আয় যাই হোক আমরা আনন্দের সঙ্গে এ কাজ করি। বাপ-দাদার ঐতিহ্য ধরে রাখতে গ্রামে এখন নতুন কারিগর তৈরি হচ্ছে। এখন বর্ষা মৌসুম। আমাদের বিশ্রাম নেই। নৌকার চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় আমাদের দিনরাত কাজ করতে হয়।’

সরেজমিনে দেখা গেছে, কারিগর রতন চন্দ্র বিশ্বাস ঘরের বারান্দায় নৌকা তৈরি করছেন। পাশেই তার পিতা প্রফুল্ল চন্দ্র বিশ্বাস জলচৌকি তৈরি করছেন। রতন চন্দ্র বিশ্বাস জানান, তার পিতা ৫৪ বছর ধরে নৌকার কাজ করছেন। তার কাছ থেকেই তিনি কাজ শিখেছেন। জানা গেছে, রূপগঞ্জ ও সোনারগাঁও উপজেলার বিভিন্ন হাটে নৌকা বিক্রি করা হয়। তবে অনেক ক্রেতা এ গ্রামেই আসেন নৌকা কিনতে। এখানে ছোট-বড় সব ধরনের নৌকা তৈরি হয়। ছোট নৌকা তৈরি করতে খরচ হয় ৩ থেকে ৫ হাজার টাকা। বিক্রি হয় ৬ থেকে ৭ হাজার টাকা। বড় নৌকা ৪৫ হাজার থেকে ৬০ হাজার টাকায় বিক্রি হয়। তাতেই চলে নৌকার কারিগরদের সংসার।