ইকবাল খন্দকার
আমার এক বড়ভাই বললেন, ‘লক্ষণ খুব ভালো মনে হচ্ছে। নির্বাচন ইতোমধ্যে সপ্তাহখানেক পিছিয়েছে। যদি কোনোভাবে আর মাসখানেক পেছাতে পারে, তাহলে আমি আর্থিকভাবে অনেক লাভবান হবো। মানে আমার অনেকগুলো টাকা বেঁচে যাবে।’ আমি বললাম, ‘নির্বাচন পেছানোর সঙ্গে আপনার আর্থিকভাবে লাভবান হওয়ার সম্পর্কটা কী, যদি একটি বলতেন, তাহলে আমি তো উপকৃত হতামই, সমগ্র জাতি উপকৃত হতো বলে আমার বিশ্বাস। কারণ, আপনার কথাগুলো আমি ‘ঠাট্টা’য় ছাপানোর ব্যবস্থা করব।’ বড়ভাই খুশি হয়ে বললেন, ‘নিশ্চয়ই, নিশ্চয়ই। কেন নয়! আসলে প্রতি শীতকালেই আমাকে ম্যালা শীতবস্ত্র কিনতে হয়। হাঁপানির সমস্যা আছে তো! যথেষ্ট গরম কাপড় গায়ে না দিলে টান এসে যায়। মানে হাঁপানির টান এসে যায়। তো এইবার আমাকে শীতবস্ত্র কেনার পিছনে কোনো টাকা খরচা করতে হচ্ছে না। কারণ, নির্বাচনের উত্তাপেই কেমন যেন গরম গরম লাগছে। তো নির্বাচন যদি ডিসেম্বরেই শেষ হয়ে যায়, তাহলে তো উত্তাপও কমে যাবে। তার মানে জানুয়ারিতে ঠিকই আমাকে শীতবস্ত্র কিনতে হবে। কিন্তু নির্বাচনটা যদি আরেকটু পেছানো হয়, অর্থাত্ জানুয়ারির শেষ সপ্তাহের দিকে যদি নেওয়া যায়, তাহলে পুরোপুরি বেঁচে যাই। কারণ, আজকাল জানুয়ারির পর আর শীত থাকে না। থাকলেও নির্বাচনের পরপর যে উত্তাপটা থাকে, সেই উত্তাপ দিয়েই ম্যানেজ করে নিতে পারব বলে আমার দৃঢ় এবং দীর্ঘ বিশ্বাস।’
আমার এক ছোটভাই বলল, ‘সচেতনতার কোনো বিকল্প নেই। আগে থেকে সচেতন থাকলে অনেক খারাপ পরিস্থিতিও মোকাবিলা করা যায়।’ আমি বললাম, ‘এত ভূমিকা না দিয়ে মূল কথায় চলে যা। এতে বহুত ফায়দা হবে বলে আমার ধারণা।’ ছোটভাই বলল, ‘না, বলছিলাম এই যে ক’দিন আগে বর্ষাকাল গেল, তখন যদি আমরা বেশি বেশি করে গাছ লাগাতাম, তাহলে নির্বাচনী উত্তাপের কারণে তাপমাত্রা যতই বাড়ুক না কেন, আমরা সেটা সামাল দিতে পারতাম। গাছ পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করে নিশ্চয়ই আপনি জেনে থাকবেন।’
আমার এক প্রতিবেশী বললেন, ‘এই যে মানুষ নির্বাচনী উত্তাপ কথাটা বলে থাকে, কেন বলে? নির্বাচনের কি আদৌ কোনো উত্তাপ আছে? বা থাকা সম্ভব?’ এবার পাশ থেকে আরেক প্রতিবেশী বলে উঠলেন, ‘আমার মনে হয়, নির্বাচনের সময় পাবলিক যে মাগনা সিগারেট পায় আর সেগুলো যাচ্ছেতাইভাবে খায়, এতে যে বাড়তি ধোঁয়ার সৃষ্টি হয়, এই ধোঁয়াই বাড়তি উত্তাপের সৃষ্টি করে। আর এটাকেই মানুষ নির্বাচনী উত্তাপ বলে থাকে।’ প্রথম বিশেষজ্ঞ এবার দাঁত কেলিয়ে দ্বিতীয় বিশেষজ্ঞকে বলল, ‘আপনি তলে তলে কবে ‘উত্তাপ বিশেষজ্ঞ’ হয়ে গেলেন, টেরই পেলাম না!’
আমার এক চাচাকে ফোন দিলাম গ্রামের নির্বাচনী উত্তাপের খোঁজ-খবর নেওয়ার জন্য। আমার প্রশ্ন শুনে চাচা বললেন, ‘অবস্থা বেশ ভালো বাজান। তবে সমস্যা একটাই, মোড়ের দোকানের চাস্টলের মালিকগুলা বাটপারি শুরু করছে।’ আমি বললাম, ‘কী ধরনের বাটপারি বলেন তো! নির্বাচন উপলক্ষে চায়ের দাম বাড়িয়ে দিয়েছে? তা একটু বাড়াতেই পারে। সমস্যা নেই। কারণ, চায়ের দাম তো নিশ্চয়ই প্রার্থীরাই দিয়ে থাকে।’ চাচা বললেন, ‘আসল ঘটনা না শুইনা এত কথা কইয়ো না তো!’ আমি বললাম, ‘ভুল হয়ে গেছে চাচা। বলেন আসল ঘটনাটা কী?’ চাচা বললেন, ‘ঘটনা আর কী! আগে চাপ কম ছিল। চায়ের কাপগুলা কী সুন্দর কইরা ধুইত। এখন চাপ বাড়ার কারণে কাপ ধোয়ার প্রয়োজন মনে করে না। না ধুইয়াই একই কাপে চা দিতে থাকে সমানে। বিশ্বাস করবি না, আমার মুখের ঘা জানি আমার মুখে চইলা আইছে। ঘা ছোঁয়াচে রোগ জানস না?’
আমার এক দুলাভাই বললেন, ‘শীতকালে নির্বাচন হইলে আগেই বইলা দেওয়া উচিত মিছিল করা যাবে না। কারণ, শীতকালে মিছিল করলে সবার মুখ থেকে যে পরিমাণ ধোঁয়া বাইর হয়, তাতে ভয় পাওয়ার আশঙ্কা থাকে। আগুন লাগছে মনে কইরা কে যে ফায়ার ব্রিগেডে ফোন কইরা বসে!’