সামাজিক স্বজন ও পর্দার বিধান

মুসলমানদের পারস্পরিক সংহতিকে পবিত্র কোরআনে ‘সিসা ঢালা প্রাচীরতুল্য’ বলা হয়েছে। ইসলাম সামাজিক সম্প্রীতির শিক্ষা দেয়। ইসলামে মানুষে মানুষে সম্পর্কের সঙ্গে জড়িত—বৈবাহিক সম্পর্কের বৈধ-অবৈধতা, উত্তরাধিকারের বিধান, পর্দার বাধ্যবাধকতা, আত্মীয়স্বজনের পারস্পরিক দায়বদ্ধতা, অবস্থানগত প্রীতিময়তা ইত্যাদি। কিন্তু আমাদের মনগড়া সামাজিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে তথাকথিত সম্বোধন/সম্ভাষণের সঙ্গে ধর্মীয় বিধিবিধানের ন্যূনতম অনুমোদন নেই। ইসলামে আত্মীয়তা তৈরি হয়—ক. রক্তের সম্পর্কে, খ. বৈবাহিক সম্পর্কে, গ. মাতৃদুগ্ধ পানজনিত সম্পর্কের মাধ্যমে (দুধ ভাই, দুধ মা ইত্যাদি)।

আত্মীয়তার পথ ধরেই মানুষের পারস্পরিক সম্পর্কের ধারণা তৈরি হয়। যেমন ‘যাদের সঙ্গে বিয়ে নিষিদ্ধ ও সাক্ষাত্ অনুমোদিত’। নারী-পুরুষের বিপরীতে এমন মানুষকে ইসলামের পরিভাষায় বলা হয় ‘মাহরাম’ বা ‘মুহরিম’। ‘যাদের সঙ্গে বিয়ে বৈধ তাদের সঙ্গে দেখাসাক্ষাত্ নিষিদ্ধ’ অর্থাত্ হারাম। এমন মানুষকে বলা হয় ‘গাইরে মুহরিম’। ‘গাইরে মুহরিম’দের একত্রে ভ্রমণ, অহেতুক গল্প গুজব, আড্ডায় যেন জঘন্য পাপাচারের পথ খুলে না যায় সে জন্যই ইসলামের কঠোর অবস্থান।

চাচাতো, খালতো, মামাতো, ফুফাতো বোনকে বিয়ে করা অনুমোদিত। তালতো ভাইবোন বা বেয়াই-বেয়াইনসহ এ চার প্রকার বোনের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাত্, সামনাসামনি কথা বলাও হারাম। আর ‘দুলহাভাই ভাই’য়ের মতো ও ‘শালি বোনে’র মতো বললেও এ সম্পর্কগুলো দ্বারা দায়িত্ববোধ ও শ্রদ্ধার গুরুত্ব তৈরি হলেও এ সম্পর্কগুলোর ক্ষেত্রে পর্দার বিধান শিথিল নয়। আর দেবর হলো হাদিসের ভাষায় ‘সাক্ষাত্ যম’।

দেখা যায়, সামাজিক কাজ কর্মে আমরা কিছু মানুষকে আপন ভাবতে শিখি এবং তাদের সঙ্গে বন্ধনে জড়িয়ে যাই। অথচ ঐ সম্পর্কগুলো ইসলামের দৃষ্টিতে আদৌ আত্মীয়তার সম্পর্ক নয়। এমনই অনেক সামাজিক সম্পর্ককে আমরা আত্মীয়তার মতোই নিবিড়তায় আষ্টেপৃষ্ঠে আঁকড়ে ধরি। যেমন : ক. ধর্মের ভাই, ধর্মের মা, ধর্মের বোন :এগুলো নিছক কথার কথা। ইসলামে এমন সম্পর্কের অনুমোদিত ভিত্তি নেই। যদিও মূলগত কারণে সব মানুষ ও সব মুসলমান পরস্পর ভাই ভাই। খ. উকিল বাপ :পাত্রপাত্রীর মধ্যে বিয়ের বন্ধন তৈরির জন্য যেমন সাক্ষী লাগে, তেমনি থাকেন মধ্যস্থতাকারী বা উকিল। এমন উকিল হওয়ার অর্থ বাপ-মেয়ের সম্পর্ক নয়। বরং এমন সম্পর্কের ক্ষেত্রে পর্দা রক্ষা করা জরুরি। গ. পালিত সন্তান :ধর্মীয় দৃষ্টিতে পালিত সন্তান ‘প্রকৃত সন্তান’ নয় এবং সম্পত্তিতে উত্তরাধিকারী হয় না।  ঘ. পির ভাই, নেসবতি ভাই, তাবলিগি ভাই :এ ধরনের সম্পর্ক নিতান্তই আন্তরিকতা, বন্ধুত্ব ও শ্রদ্ধা, ভালোবাসার। কিন্তু এমন সম্পর্কের কারণে প্রকৃত আত্মীয়তা তৈরি হয় না। ঙ. শিক্ষক-ছাত্রী (পিতা-কন্যাতুল্য), পাড়াপড়শি ভাই, স্কুল-কলেজের বড় ভাই :ইসলামের দৃষ্টিতে অনুমোদিত সম্পর্ক নয়। বরং স্নেহ-ভালোবাসা ও ভক্তি-শ্রদ্ধার সম্পর্ক হলেও, এগুলো নিছক প্রীতিময় আবেগের বন্ধন মাত্র। এসব ক্ষেত্রেও শরি’আতের বিধান প্রযোজ্য।

‘পর্দা’ একটি ‘সার্বক্ষণিক ফরজ’। বিশেষত বাকারা, নিসা, আহযাব ইত্যাদি সুরার নির্দেশনাসহ সুরা নুরের ৩০, ৩১, ৩২, ৩৩ নম্বর আয়াতে বর্ণিত পর্দার বিধান মেনে চলা তথাকথিত সম্পর্কের ক্ষেত্রে শুধু প্রযোজ্যই নয় বরং জরুরি।

lলেখক :বিভাগীয প্রধান, ইসলামিক স্টাডিজ,

কাপাসিয়া ডিগ্রি কলেজ, কাপাসিয়া, গাজীপুর