সুদূর প্রবাসে বসিয়া মহাকবি মাইকেল মধুসূদন দত্ত ব্যথিত চিত্তে লিখিয়াছিলেন—‘জন্মিলে মরিতে হবে, অমর কে কোথা কবে।’ এই যে যাহারা জন্মগ্রহণ করিয়াছেন, তাহাদের প্রত্যেকেরই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করিতেই হইবে, ইহা যেন কিছুতেই মানিয়া লইতে পারেন না। পৃথিবীর শাসক-সম্রাট-জ্ঞানীগুণী-প্রতাপশালী সকলেই। এই জন্য তাহারা যে কোনো উপায়ে নিজের নামখানি খোদিত করিয়া রাখিতে চাহেন। পৃথিবী জুড়িয়া চারিদিকে এত যে ভাস্কর্য, এত যে নামফলক—তাহার নেপথ্যে ঐ অমরত্বেরই সুপ্ত আকাঙ্ক্ষা কাজ করিয়া থাকে। এই জন্য কোথাও কিছু নির্মাণ করা হইলে সেইখানে নামফলক বসানো হয়। ব্রিজের নাম রাখা হয় বিশিষ্ট কাহারো নামে। গত বত্সর বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী দীর্ঘতম রেলসেতু হার্ডিঞ্জ ব্রিজ নির্মাণের শতবর্ষ পূর্ণ হইল। ব্রিটিশ আমলের তত্কালীন ভাইসরয় লর্ড হার্ডিঞ্জের নাম অনুসারে ব্রিজটির নামকরণ করা হইয়াছিল ‘হার্ডিঞ্জ ব্রিজ’। সেই ভাইসরয় লর্ড মরিয়া কোথায় সমাধিস্থ হইয়া রহিয়াছেন—কে তাহার খোঁজ রাখে! ইহা নির্মাণে যেই প্রকৌশলী নকশা প্রণয়ন করিয়াছিলেন এবং যেই সাড়ে ২৪ হাজার শ্রমিক উদয়াস্ত কাজ করিয়া ব্রিজটি নির্মাণ করিয়াছিলেন, তাহাদের কে মনে রাখিয়াছে?
সুতরাং নিজেকে বাঁচাইয়া রাখিবার মানসে প্রভাব ও প্রতাপশালী মানুষের চেষ্টার শেষ নাই। অমরত্ব লাভের মানসে প্রাচীনকালে রাজা-মহারাজারা বিভিন্ন কেমিস্ট নিয়োগ করিতেন অমৃত সুধা আবিষ্কারের জন্য। আমরা এই ক্ষেত্রে ইতিহাস হইতে স্মরণ করিতে পারি খ্রিষ্টপূর্ব দুই শত বত্সর পূর্বেকার চীনের মহাপরাক্রমশীল সম্রাট কিন শি হুয়াংয়ের অমরত্ব লাভের কাণ্ডকারখানা। মৃত্যুর কথা শুনিতেই পারিতেন না এই সম্রাট। তিনি চাহিতেন তাহার রাজ্যের বিজ্ঞানীরা শুধু অমরত্বের রহস্য অনুসন্ধানেই ব্যস্ত থাকুক, অন্য সকল কিছুই তাহার নিকট ছিল সময়ের অপচয়। অমরত্বের সুধা বানাইবার ব্যর্থতার দায়ে তিনি প্রায় সাড়ে চার শত বিজ্ঞানীকে জীবন্ত কবরও দিয়াছিলেন। তাহার পরও অমরত্ব সুধা হুয়াংকে অমরত্ব দান করিতেই পারে নাই। তাহার মৃত্যুর পর মৃতদেহটিকে পচা মাছ দিয়া ঢাকিয়া দেওয়া হইয়াছিল যাহাতে মৃতদেহের পচা গন্ধ চাপা পড়িয়া যায়। জীবিতাবস্থায় কিন বড় গলায় বলিতেন—তাহার বংশধরেরা সহস -অযুত বত্সর রাজ্য শাসন করিবে। অথচ বিধাতার নির্মম পরিহাস হইল—তাহার মৃত্যুর মাত্র তিন বত্সরের মধ্যেই তাহার বংশের আস্ফাালন চিরতরে শেষ হইয়া যায়।
প্রকৃত অর্থে মহাকালের নিষ্ঠুর করাল গ্রাসে সবাইকে ক্রমশ বিলীন হইয়া যাইতেই হয়। এখনো, এই আধুনিক সময়ে মানুষ নানানভাবে নিজেকে অমর করিয়া রাখিতে চাহে। নিজের আলোকচিত্র, পোর্ট্রেট, আবক্ষ ভাস্কর্য—তাহা দেখিতে যেমনই হউক না কেন—তাহা যখনই দেখিতে পাওয়া যায় তখনই একটি ভালোলাগার অনুভূতি তাহার হূদয় জুড়িয়া ছড়াইয়া পড়ে। ‘প্রাণ’ কবিতায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যেমন বলিয়াছেন—‘মরিতে চাহি না আমি সুন্দর ভুবনে,/ মানবের মাঝে আমি বাঁচিবারে চাই’। কবির মতো এই অপূর্ব সুন্দর পৃথিবী হইতে চিরতরে কেহই চলিয়া যাইতে চাহে না। এই জন্য পরিবার-সমাজ-রাষ্ট্রের বিভিন্ন স্তরে চিন্তাশীল ব্যক্তিমাত্রই তাহার নিজ নিজ সামর্থ্য অনুযায়ী ছাপ রাখিতে চাহেন। সেই ছাপের মধ্যে তিনি নিজেকে পরিব্যাপ্ত রাখিতে চাহেন তাহার অবর্তমান সময়ে। তাহার নামটি খোদাই থাকুক কোথাও না কোথাও। তবে নামখানি পাথরে খোদাই করা হইলেও তাহা ক্ষয় হইয়া যাইতে পারে; কিন্তু যাহারা কীর্তিমান, যাহারা মানুষের মঙ্গলের জন্য কাজ করিয়া থাকেন—তাহাদের নাম যুগ-যুগান্তর ধরিয়া সকলের হূদয়ে প্রোথিত থাকে। মাইকেল মধুসূদন এই জন্যই বলিয়াছেন—‘সেই ধন্য নরকুলে, লোকে যারে নাহি ভুলে।’