আমাদের জাতীয় রাজনীতিতে আপাতত তেমন কোনো উত্তেজনা নেই। বিরোধী দল ‘হাইবারনেশান’ বা শীতনিদ্রায় আছে। অবশ্য আমাদের দেশে গত কয়েক বছর ধরেই বিরোধী দলের কোনো তত্পরতা নেই। তারা নড়াচড়া করলেই ক্ষমতাসীনরা হামলা, মামলা, পুলিশ, লাঠি, টিয়ার গ্যাস নিয়ে আবির্ভূত হয়। এই জ্বালা থেকে রেহাই পেতে বিরোধী দল কেবল ‘শীতনিদ্রা’ নয়, অনির্দিষ্টকালের নিদ্রায় চলে গেছে। বিরোধী দলের তত্পরতা না থাকলে কী হবে, এখন দেশ জুড়ে চলছে করোনাতঙ্ক। করোনা এখন রাজধানী ছেড়ে বিভিন্ন জেলা শহরে ছড়িয়ে পড়েছে। সংক্রমণ ও মৃত্যুর হার ক্রমেই বাড়ছে। ‘গরিব মানুষের করোনা হয় না’—এই আপ্তবাক্যকে প্রতিদিন মিথ্যে প্রমাণ করে রাজশাহী, খুলনা, যশোর, সাতক্ষীরা অঞ্চলে শ্রমজীবীদের মধ্যে করোনার প্রকোপ বাড়ছে। এদিকে করোনার টিকা ক্রয়ের এখনো কোনো কূলকিনারা হয়নি।
আমজনতার প্রত্যাশার কথা লিখতে গিয়ে মনে হচ্ছে মধুমাসের মিষ্ট ফল আমের কথা। হ্যাঁ আমের এই ভরা মৌসুমে আম নিয়ে কিছু না বলাটা রীতিমতো বেরসিকের কাজ। উল্লেখ্য, ‘আমজনতা’ শব্দটি আমরা প্রায়ই ব্যবহার করি। এর মানে হচ্ছে সাধারণ জনতা বা মানুষ। উপসর্গ হিসেবে ‘আম’ শব্দটি আরবি থেকে এসেছে। এর অর্থ সাধারণ বা নির্বিশেষ। যেমন—আমজনতা আমদরবার আমমোক্তার। প্রশ্ন হলো—আরবিতে এই শব্দটি কোত্থেকে এসেছে? আমগাছের ‘আম’ থেকে? যদি তাই হয়, তাহলে আম কি একসময় এতটাই সস্তা আর সুলভ ছিল, যে জনসাধারণ সবাই আম খেতে পেত?
বাংলাদেশে যেসব ফল উত্পন্ন হয় তার মধ্যে আমের জনপ্রিয়তা সবচেয়ে বেশি। আমের নানাবিধ ব্যবহার, স্বাদ-গন্ধ ও পুষ্টিমানের জন্য এটি একটি আদর্শ ফল হিসেবে পরিচিত। তাই আমকে ফলের রাজা বলা হয়। বাংলাদেশের মাটি, জলবায়ু, আবহাওয়া—সবই আমচাষের উপযোগী। দেশের প্রায় সব জেলায়ই আম ফলে। এমনকি উপকূলীয় লবণাক্ত ভূমিতেও এখন মিষ্টি আমের চাষ হচ্ছে। পার্বত্য জেলার জুমচাষ এলাকায়ও উন্নত জাতের আম ফলছে। তবে চাঁপাইনবাবগঞ্জ, রাজশাহী, নওগাঁ, দিনাজপুর, মেহেরপুর, কুষ্টিয়া, চুয়াডাঙ্গা, সাতক্ষীরা, যশোর আমচাষের শীর্ষে অবস্থান করছে।
প্রাচীনকালে তো বটেই, পরবর্তীকালে বাংলার সুলতানরাও ‘ফলের রাজা আম’-এর অবিচ্ছিন্ন নেশায় অত্যন্ত আসক্ত হয়েছিলেন। আম কিন্তু বাংলার নিজস্ব ফল নয়। এর আদিনিবাস দক্ষিণ এশিয়াতে। আমাদের বাংলায় আম এসেছে পরবর্তী সময়ে অনেক আগন্তুক ফল-ফুল বৃক্ষের মতোই। অবশ্য পুরাণের উল্লেখ মতো, পবনপুত্র বীর হনুমানের দাক্ষিণ্যেই নাকি এই আম গাছ শ্রীলঙ্কা থেকে ভারতে এসে বিভিন্ন দিকে ছড়িয়ে পড়ে, সেভাবেই এই বাংলার পথে-প্রান্তরেও...।
ভারতবর্ষে আমের ইতিহাসটা এই রকম : খ্রিষ্টপূর্ব ৩২৭ সালে সিন্ধু উপত্যকা অঞ্চলে আলেকজান্ডারেরই প্রথম চোখে পড়ে আমের বাগান। পরে ৬৪০ খ্রিষ্টাব্দে চীনা পর্যটক হিউয়েন সাঙ আমের স্বাদ ও সুগন্ধের মজা পেয়ে বিদেশে পাঠানোর ব্যবস্থা করেন এবং আমকে বিশ্ববাসীর কাছে পরিচিত করে তোলেন। মোগল সম্রাট আকবর (১৫৫৬-১৬০৫) ভারতের শাহবাগের দাঁড়ভাঙায় ১ লাখ আমের চারা রোপণ করে এ উপমহাদেশে প্রথম একটি উন্নত জাতের আমবাগান সৃষ্টি করে আমকে আরো উচ্চতর আসনে বসান।
বাঙালি সংস্কৃতির সঙ্গে আমের সম্পর্ক অনেকটা আমে-দুধে মাখামাখির মতো। যদিও আম মৈথিলী শব্দ। আমের নাম কৃষ্ণের শতনামকেও ছাড়িয়ে যাবে। বাল্মীকি আমকে ‘চ্যুত’ বলেছেন, কালিদাস ‘আম্র’ আর বাত্স্যায়ন বলেছেন ‘সহকার’। সংস্কৃত ভাষায় আমকে আম্র, বাংলায় আম, তামিলে মানকে এবং ইংরেজিতে ম্যাংগো বলা হয়। বাংলার প্রাচীন গ্রন্থ শ্রীকৃষ্ণকীর্তনে এই আম আমবু, ভারতচন্দে আম, ঈশ্বর গুপ্তয় আঁব, মাইকেলে রসাল নামে অভিহিত হয়েছে।
মত্স্যপুরাণ ও বায়ুপুরাণে কালো আমের উল্লেখ আছে, যার রস পানে মানুষ অমরত্ব লাভ করে। ইংরেজি ‘ম্যাংগো’ নামের উত্পত্তি নাকি তামিলের ‘ম্যাংগাই’ থেকে। আম বা আম্র শব্দটির আভিধানিক অর্থ ‘সুখে ভোগ করা’। চ্যুতর তাত্পর্য রসের ক্ষরণ। বাত্স্যায়নে আমকে ‘সহকার’ বলা হয়েছে। আমকে আরবিতে ‘আম্বাজ’ ও ফারসিতে ‘আম্বা’ বলা হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশে আমের হাজার পাঁচেক প্রজাতি রয়েছে। আবার সেসব নামের পেছনে রয়েছে নানান কিংবদন্তি, নানান প্রাসঙ্গিক ঘটনা, নানান দৃষ্টান্ত। ফজলি আম নিয়ে জনশ্রুতি হচ্ছে, গৌড়রাজ শশাঙ্কের আমবাগানের মালী ছিলেন ফজল আলি। তিনি ছিলেন রাজার অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ। ‘তালাবি’ ও ‘বোম্ব্বাই’ আমের শংকরায়ণ ঘটিয়ে তিনি তৈরি করেছিলেন এক অতিকায় আম। ফজল আলি দ্বারা উদ্ভাবিত বলে আমের নামকরণ হয় ‘ফজলি’।
জনৈক গৌড় সুলতানের প্রিয় বেগমের স্মৃতি নাকি বহন করে চলেছে ‘বেগমফুলি’ আম। ‘ল্যাংড়া’ আমের পেছনে রয়েছে নাকি কাশীর এক ‘ল্যাংড়া’ ফকিরের লোককাহিনি। কারো কারো কাছে সব ধরনের আমের মধ্যে ল্যাংড়া আমই শ্রেষ্ঠ বলে বিবেচিত। অবশ্য ল্যাংড়া আমেরও নানা রকম জাত আছে। তবে বেনারসি ল্যাংড়া আমই নাকি সব চেয়ে উত্কৃষ্ট জাতের। ‘গোপাল’ নামে এক ধোপার তৈরি বিশেষ প্রজাতির আম থেকেই নাকি ‘গোপালের ধোপা’ আমের সৃষ্টি। সেখান থেকেই আজকের গোপাল ভোগ।
বোঝা গেল, শুধু রাজা-বাদশা বা সুলতানের নামের সঙ্গে মিলিয়ে কিংবা তাদের ইচ্ছে থেকেই নতুন আমের নামকরণ হয়নি। সাধারণ শ্রেণির মানুষের নামও জড়িয়ে আছে অনেক আমের সঙ্গে।
তোতাপুরি, হিমসাগর, বেনারসি, বোম্বাই, চৌসা, কিষানভোগ, বালসার, রত্নগিরি, কেশরি, লক্ষ্মণভোগ, পেয়ারাফুলি, আলিবাগ, রানিপসন্দ, সফেদা, দসেরা, সিন্ধুরিয়া, জাহাঙ্গীর, আলফানসো, সিরাজদৌল্লা, জাফরান, গোলাপখাস— এ রকম আরোও কত কত সব মজাদার নামের গর্ব ও গন্ধ নিয়ে বিখ্যাত হয়ে আছে বাংলার ও বাঙালির ভীষণ আদরের আম।
আম নিয়ে অনেক উপকথা চালু আছে। আধুনিক উর্দু সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ কবি মির্জা গালিবকে নিয়েও প্রচলিত রয়েছে আম-সম্পর্কিত গল্প। মির্জা গালিবের প্রিয় বন্ধু হাকিম রমিজউদ্দিন খাঁ। তিনি আম পছন্দ করতেন না। একদিন দুই বন্ধু দিল্লির পথে হাঁটছিলেন। এ সময় দুইটি গাধা রাস্তা পার হচ্ছিল। গলিতে পড়েছিল আমের খোসা। গাধা দুইটি তা না খেয়ে শুধু শুকে চলে যায়। হাকিম বন্ধুকে ঘায়েল করার সুযোগ পেয়ে বললেন, ‘দেখেছেন মির্জা সাহেব, আম কী রকম ফল যা গাধারাও খেতে চায় না।’ মির্জার তাত্ক্ষণিক তির্যক উত্তর—‘ঠিকই বলেছেন হাকিম সাহেব, শুধু গাধারাই আম পছন্দ করে না।’
একবার এক ইংরেজ সাহেব নাকি পাকা হড়হড়ে আম খেতে গিয়ে হাত-জামা-কাপড় নষ্ট করে ফেলেছিলেন। অবশেষে তিনি বলেছিলেন, আম খাওয়ার শ্রেষ্ঠ উপায় হলো, আমটা নিয়ে বাথটাবে চলে যাওয়া, সেখানে আমটা খেয়ে একেবারে গোসল শেষ করে পরিষ্কার হয়ে চলে আসা। যদিও এই ইংরেজ সাহেবরাই আবার আমকে বললেন ‘প্রিন্স অব ফ্রুট’ ফলের রাজপুত্র।
আম নিয়ে আরেকটি উপকথা। প্রাচীনকালে এক বাদশা অসময়ে আম খেতে চাইলেন। আমের প্রতি তার আকাঙ্ক্ষা এতটাই প্রবল হয়ে উঠল যে, তিনি অসুস্থ হয়ে পড়লেন। বদ্যিসাহেব সাফ জানিয়ে দিলেন, বাদশাকে আম খাওয়াতে না পারলে এই রোগ সারবে না। বাদশা অসুস্থ হয়ে পড়ে থাকলে রাজ্যের সর্বনাশ। নিরুপায় হয়ে উজির এক কাণ্ড করেন। তিনি নিজের দাড়িতে তেঁতুলের একটু টক ও গুড় মিশিয়ে বাদশাকে চুষতে দেন। ব্যস, প্রায় বেহুঁশ বাদশাও দাড়িকে মনে করলেন আমের আঁশ, আর টক-মিষ্টি থেকে পেয়ে গেলেন আমের স্বাদ। বাদশার রোগ সেরে গেল, রাজ্যও বাঁচল!
গণতন্ত্র নিয়ে আমাদের আকাঙ্ক্ষাও ঐ বাদশাহর মতো। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে তেঁতুল আর গুড় মাখানো দাড়িতে জিহ্বা লাগিয়েই আমরা আমের স্বাদ গ্রহণ করি। আমাদের ‘আমজনতা’ বুঝি এ কারণেই বলা হয়। বর্তমানে ভেজালমুক্ত খাঁটি আম অর্থাত্ কার্বাইড-ফরমালিন-রাসায়নিকমুক্ত আম পাওয়াটা অনেক কঠিন ব্যাপার। এ জন্য অনেক সাধ্যসাধনা করতে হয়। রাজনীতির মঞ্চেও প্রকৃত দেশপ্রেমিক জনদরদি ভেজালমুক্ত খাঁটি নেতা পাওয়াটা কঠিন হয়ে যাচ্ছে। অথচ আমজনতার কাছে দুটোই পরম কাঙ্ক্ষিত!
n লেখক :রম্য রচয়িতা